হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে কওমি ধারার সাতটি ইসলামী দল ভবিষ্যতে একসঙ্গে চলার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর উদ্যোগে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত নতুন একটি রাজনৈতিক জোটে রূপ নিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামেয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতের আমিরের সভাপতিত্বে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত চলা সভায় কওমি ধারার সাতটি দল অংশ নেয়।

সভায় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের তিনজন করে প্রতিনিধি অংশ নেন। এ ছাড়া হেফাজতের অন্তত ২০ জন কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন।

সভা শেষে সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমান বলেন, সাতটি দল ঐক্যবদ্ধভাবে পথচলার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। অল্প দিনের মধ্যেই সেই ঐক্যের প্রক্রিয়া নির্ধারিত হবে।

.

কেন এই উদ্যোগ

সভায় অংশ নেওয়া একাধিক নেতা মুক্তকণ্ঠকে বলেছেন, সাতটি ইসলামি দল কওমি ধারার। হেফাজতে ইসলাম অরাজনৈতিক সংগঠন হলেও বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার রাজনৈতিক দল রয়েছে। সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হেফাজতের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজনৈতিক দলগুলো ভিন্ন ভিন্ন জোটে যাওয়ায় কওমি অঙ্গনে বিভক্তি তৈরি হয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাতটি দলের মধ্যে খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে সমঝোতার আলোচনা হলেও দলটি শেষ পর্যন্ত আটটি আসনে এককভাবে নির্বাচন করে।

.
আপাতত সাতটি দল ঐক্যবদ্ধ থাকার বিষয়ে একমত হয়েছে। কী প্রক্রিয়ায় একসঙ্গে পথচলা যায়, সে বিষয়ে প্রতিটি দলের কাছে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের আমির চান, এই দলগুলো অন্য কোনো দলের সঙ্গে না গিয়ে নিজেরাই ঐক্যবদ্ধ থাকুক
মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, মহাসচিব, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম
.

অন্যদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ চারটি আসনে সমঝোতার মাধ্যমে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে যায়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আসন ভাগাভাগির বিরোধে জামায়াত জোট ছেড়ে এককভাবে নির্বাচন করে। ইসলামী ঐক্যজোটও এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়।

নির্বাচনের পর জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতায় যাওয়া কয়েকটি দলের সঙ্গে হেফাজতের শীর্ষ আলেমদের একাংশের দূরত্ব তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। একপর্যায়ে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ১১-দলীয় ঐক্য থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক চট্টগ্রামে গিয়ে হেফাজতের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানান, জামায়াতের সঙ্গে তাদের ঐক্য আদর্শিক নয়, রাজনৈতিক ছিল।

.

সভাসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, হেফাজতের আমির চান কওমি ধারার দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ হোক এবং তারা নিজেদের মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলুক। এ জন্য প্রতিটি দলের কাছে লিখিত প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। দলগুলো নিজ নিজ ফোরামে আলোচনা শেষে প্রস্তাব জমা দেবে। সেগুলো নিয়ে আগামী আগস্টের শুরুতে আবার বৈঠক হবে। তখন সম্ভাব্য ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্ত করার চেষ্টা হবে।

হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন প্রভাবশালী নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কওমি অঙ্গনের আলেমরা জামায়াতবিরোধী। সে কারণে জামায়াতের সঙ্গে কয়েকটি দল জোট বাঁধায় কিছুটা দূরত্ব, বিভক্তি ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। আজকের সভায় সাত ইসলামি দলের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দলগুলো একসঙ্গে চলার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। ভবিষ্যতে এটি রাজনৈতিক জোটে রূপ নিতে পারে।

.
সংশ্লিষ্ট নেতারা জানিয়েছেন, প্রতিটি দলের লিখিত প্রস্তাব পাওয়ার পর আগামী আগস্টের শুরুতে আবার বৈঠকে বসার পরিকল্পনা রয়েছে। সেই বৈঠকেই সাত দলের সম্ভাব্য ঐক্যের কাঠামো ও পরবর্তী কর্মপন্থা নিয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। ফলে হেফাজতের এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কওমি ধারার ইসলামি দলগুলোর নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণে রূপ নেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
.

যা বলছেন নেতারা

আজকের এই মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন বা সভার বাইরে থাকলেও পুরো বিষয় সম্পর্কে জানেন, সাত দলের এমন শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। এই উদ্যোগের বিষয়ে তাঁদের কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে জানতে যাওয়া হয়।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, আপাতত সাতটি দল ঐক্যবদ্ধ থাকার বিষয়ে একমত হয়েছে। কী প্রক্রিয়ায় একসঙ্গে পথচলা যায়, সে বিষয়ে প্রতিটি দলের কাছে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের আমির চান এই দলগুলো অন্য কোনো দলের সঙ্গে না গিয়ে নিজেরাই ঐক্যবদ্ধ থাকুক।

হেফাজতের তত্ত্বাবধানে সাতটি দল কীভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে, সে বিষয়ে সভায় আলোচনা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সাতটি দলের আকিদা-বিশ্বাস কাছাকাছি হওয়ায় ঐক্যের ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব বলে সভায় মত এসেছে। তবে কী ধরনের কাঠামোয় এই ঐক্য হবে, সে বিষয়ে পরবর্তী বৈঠকগুলোতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

.

জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। দলটির আমির মাওলানা মামুনুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল কওমি ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব দূর করা। এখনো নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতা করছে অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। সেই সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় আলেমরা চাচ্ছেন, ইসলামি দলগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকুক। সেই ঐক্য কীভাবে অটুট রাখা যায়, সে বিষয়ে দলগুলোকে লিখিত প্রস্তাবনা দিতে বলা হয়েছে। তবে এই ঐক্য কার্যকর হতে কিছুটা সময় লাগবে।

সংশ্লিষ্ট নেতারা জানিয়েছেন, প্রতিটি দলের লিখিত প্রস্তাব পাওয়ার পর আগামী আগস্টের শুরুতে আবার বৈঠকে বসার পরিকল্পনা রয়েছে। সেই বৈঠকেই সাত দলের সম্ভাব্য ঐক্যের কাঠামো ও পরবর্তী কর্মপন্থা নিয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। ফলে হেফাজতের এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কওমি ধারার ইসলামি দলগুলোর নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণে রূপ নেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।