রাজশাহীতে প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষার ফল নিয়ে তদন্ত ও পুনর্মূল্যায়নের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে শিশুশিক্ষার্থীরা। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়ে তারা বিভাগীয় ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে মিছিল করে এবং পরে সেখানে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে।

মানববন্ধনে অভিভাবকেরা বলেন, রাজশাহী উপশহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত ১২টি বিদ্যালয়ের ২৩৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র একজন সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পেয়েছে। তাঁদের মতে, এই ফল প্রত্যাশিত নয় এবং কোনো ত্রুটি থাকলে তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

কর্মসূচিতে সাত দফা দাবি তোলা হয়। এগুলো হলো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, প্রয়োজন হলে পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে সংশোধিত ফল প্রকাশ, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, ভবিষ্যতে স্বচ্ছ ফল প্রকাশের ব্যবস্থা চালু করা, গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে শিক্ষক-অভিভাবকদের অবহিত করা, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে সংশোধিত ফল প্রকাশ। দাবি পূরণ না হলে অনশন কর্মসূচি পালনের কথাও জানান আয়োজকেরা।

এর আগে ২০১৫ সালে রাজশাহীতে প্রাথমিকে ৪০ জন শিক্ষার্থীর বৃত্তি নিয়ে জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছিল। তখন সুশিক্ষা আন্দোলন মঞ্চ নামের একটি সংগঠন শিক্ষার্থীদের নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল। পরে সরকার ফলাফল সংশোধন করে বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়।

চলতি বছর ১২ জুলাই সারা দেশে বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। এতে দেখা যায়, রাজশাহী উপশহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষা দেওয়া ১২টি বিদ্যালয়ের ২৩৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র একজন সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পেয়েছে। এই কেন্দ্রের অধীনে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাতটি ওয়ার্ড রয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে দুজন মেয়ে ও দুজন ছেলের সাধারণ বৃত্তির কোটা। মোট সাতটি ওয়ার্ডে অন্তত ২৮ জনের বৃত্তি পাওয়ার কথা রয়েছে।

অভিভাবকেরা আরও বলেন, বৃত্তি পরীক্ষায় পাস করার জন্য একটি বিষয়ে ন্যূনতম ৪০ নম্বর পেতে হয়। কিন্তু তাঁদের দাবি অনুযায়ী, মাত্র একজন শিক্ষার্থী এই ন্যূনতম নম্বর পেয়ে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পাবে—এটি তাঁদের কাছে অস্বাভাবিক। নিয়ম অনুযায়ী কোনো ওয়ার্ডে কেউ পাস নম্বর না পেয়ে অন্য ওয়ার্ডের শিক্ষার্থী দিয়ে কোটা পূরণ করা হয়—এ কথাও বলছেন তাঁরা। তবে সাতটি ওয়ার্ডে ৪০ জন শিক্ষার্থী প্রতি বিষয়ে ন্যূনতম ৪০ নম্বর করে পাবে না—এ বিষয়টি মানতে পারছেন না তারা।

তারা জানান, নিয়ম অনুযায়ী সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ৮০ শতাংশ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ২০ শতাংশ বৃত্তি পাওয়ার কথা। তবে রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় বেসরকারি বিদ্যালয়ের ৬৩ জন শিক্ষার্থী মেধাবৃত্তি পেয়েছে এবং সরকারি বিদ্যালয়ের পেয়েছে ৫৪ জন। অভিভাবকদের মতে, এ হিসাবের সঙ্গে প্রত্যাশিত চিত্রের মিল পাওয়া যাচ্ছে না বলেই সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

মানববন্ধনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন অভিভাবক আজিবর রহমান। তিনি বলেন, ফলাফলের বিভিন্ন অসংগতির কারণে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী প্রাপ্য স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাও ক্ষুণ্ন হয়েছে।

অভিভাবকদের আবেদন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হবে। ফল প্রস্তুতের সময় কোনো কারিগরি ত্রুটির কারণে এমনটি হয়ে থাকতে পারে। কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবে।
এ কে এম আনোয়ার হোসেন, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা

রাজশাহী উপশহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুর রহমান বলেন, এই কেন্দ্রে ১২টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিয়েছিল। কিন্তু ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, কেন্দ্রটির একজন শিক্ষার্থীরও নাম বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকায় নেই। বিষয়টি অত্যন্ত বিস্ময়কর এবং তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

মিছিল শেষে অভিভাবকেরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর একটি স্মারকলিপি দেন। এ সময় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ কে এম আনোয়ার হোসেন বলেন, এখন তাঁদের হাতে কিছু নেই। এক জেলার খাতা অন্য জেলায় পাঠানো হয়। সেখান থেকে অধিদপ্তরে ফলাফল চলে যায়। অভিভাবকদের আবেদন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হবে। ফল প্রস্তুতের সময় কোনো কারিগরি ত্রুটির কারণে এমনটি হয়ে থাকতে পারে। কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবে।