এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চিঠিটা পাচ্ছিলেন হাভিয়ের। ভুল করে আসা অন্য কোনো চিঠি নয়; একই চিঠি বারবারই তার কাছে ফিরে এসেছে। তিনি বারবার সেটি ডাকঘরে ফেরত দিয়েছেন—কয়েক দিন পর একই চিঠিই আবার তার ডাকবাক্সে ফিরে আসে। বিদ্যুৎ বা টেলিফোনের বিলের পাশে যত্ন করে রাখা থাকে সেটি।
হাভিয়ের চিঠিটা দেখেই চিনতে পারতেন। প্রথমবার ফেরত পাঠানোর সময় তিনি খামের গায়ে নীল কালি দিয়ে লিখেছিলেন, ‘প্রাপক অজ্ঞাত’। এতদিন কম্পিউটারে টাইপ করতে করতে নিজের হাতের লেখা তার কাছে অচেনা হয়ে গেছে—এমন ধারণাও তার ছিল। তাছাড়া, যে নামে চিঠিটি পাঠানো, সেই নামটি তিনি আগে কখনো শোনেননি। বারবার পড়ে মনে হয়েছে—নামটা তারই বানানো, কিন্তু কেন এইভাবে বারবার ফিরে আসছে তা তিনি নিশ্চিত হতে পারছিলেন না।
চিঠিতে লেখা ছিল—তামাউ লিপো। এমন নাম কারও হয় কি না, তা নিয়েও তিনি সংশয় তৈরি করছিলেন। প্রেরকের নামও তিনি চিনতে পারতেন না। তবে বারবার পড়ার কারণে মনে হচ্ছিল নামটি কোথাও যেন শুনেছেন—যদিও ঠিক কোথায় মনে করতে পারছিলেন না। ঠিকানাটা ছিল নিজের।
এ কারণে তার মনে হচ্ছিল, চিঠিটা হয়তো বাড়ির আগের কোনো ভাড়াটিয়ার নামে এসেছে। বাড়িটি ভাড়ার। তিনি সেখানে এসেছেন মাত্র কয়েক মাস হলো।
একদিন দুপুরে কাজ সেরে ফেরার পথে দেখা হয়ে গেল ডাকপিয়নের সঙ্গে। লোকটা তখন তার বাড়ির সামনে নয়, ডাকবাক্সেও কিছু দিচ্ছিল না। তবু নিজের গলি থেকে তাকে বেরোতে দেখে হাভিয়ের এগিয়ে গেল। কোনো সম্ভাষণ না করেই জানতে চাইল, ফেরত পাঠানো একটা চিঠি বারবার তার কাছে ফিরে আসে কীভাবে।
বাড়িতে একটি মাত্র শোবার ঘর। সঙ্গে ছোট্ট একটি বারান্দা। সেখান থেকে আঁকাবাঁকা পাথর-বিছানো গলিটা দেখা যায়। বসার ঘরের বড় বারান্দা থেকে সামনের বাড়িগুলোর ছাদের ফাঁক গলে শীতের ধূসর আকাশের নিচে সমুদ্রের একটা বিবর্ণ নীল রেখাও চোখে পড়ে।
ডাকবাক্সটা সিঁড়ির দরজার পাশে, আর বারান্দা থেকেই সহজে দেখা যায়। ফলে ডাকপিয়নকে সরাসরি হাতেনাতে ধরে দেওয়ার কথা ভেবে ঠিক করেন—বারান্দায় বসে তিনি খেয়াল করবেন কীভাবে চিঠি ফেরত আসে। কিন্তু যত চেষ্টাই হোক, বারান্দায় কাঁপতে কাঁপতে অপেক্ষা করলেও তিনি পিয়নকে দেখতে পাননি।
তবে চিঠি আসতেই থাকে। তিন-চার দিন পরপর ডাকবাক্সে হাজির হয়—মনে হয় মাটি ফুঁড়েই বেরিয়ে এসেছে। একাধিকবার তিনি পাথরের রাস্তার ওপর ঠেলাগাড়ির চাকার শব্দ শুনে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠেছেন; কখনো কাজ ফেলে ছুটেও গিয়েছেন দেখতে। কিন্তু তখন দেখা গেছে বাজার থেকে ফেরা কোনো বৃদ্ধা নিজের কেনাকাটার গাড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, কিংবা কোনো তরুণ দম্পতি শিশুর গাড়ি ঠেলে রাস্তা পার হচ্ছেন।
একদিন দুপুরে কাজ সেরে ফেরার পথে আবার ডাকপিয়নের সঙ্গে দেখা হয়। লোকটি তখন বাড়ির সামনে কিংবা ডাকবাক্সে কিছু দিচ্ছিল না। তবু নিজের গলি থেকে তাকে বেরোতে দেখে হাভিয়ের এগিয়ে যান। কোনো সম্ভাষণ না করেই তিনি ফেরত পাঠানো চিঠি বারবার কীভাবে তার কাছে ফিরে আসে, সেই প্রশ্ন করেন।
তুমি চিঠিটা খুলে পড়েছ। তার মানে তুমি নিজেই স্বীকার করে নিয়েছ এই নাম এখন তোমার। তোমার নামেই গেছে চিঠিটা। আমরা ধরে নিচ্ছি, তুমিও নিজেকে সেই পরিচয়ে মেনে নেবে। সেই সঙ্গে মেনে নেবে তোমার অপরাধও—রিফ অঞ্চলে এক ব্যক্তির শিরশ্ছেদ করার অপরাধ। মানুষটি ছিল আমার বাবা। বহু বছর ধরে আমরা তার হত্যাকারীকে খুঁজে বেড়িয়েছি। আমরা শুধু তার নামটা পেয়েছিলাম। হত্যাকারী নিজেই স্বাক্ষরের মতো করে তার নামটি পাথরের ওপর লিখে রেখে গিয়েছিল। এই চিঠি পড়ে তুমি সেই নামটা নিজের করে নিয়েছ।
লোকটা ঠেলাগাড়িটা পাশে রেখে সিগারেট বানাতে লাগল। আগুন ধরিয়ে এক টান ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ডাকঘরে গিয়ে অভিযোগ করুন।
অদ্ভুতভাবে, সেদিন আর চিঠিটা পায়নি হাভিয়ের। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন তিনি। মনে করেন সমস্যাটা হয়তো থেমে গেছে।
কিন্তু ভোররাতে পাথর-বিছানো রাস্তার ওপর চাকার কাঁপা কাঁপা শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। তারপর আর কোনো শব্দ থাকে না। মনে হতে থাকে—সম্ভবত স্বপ্নেই শুনেছেন। তবে সকালে নিচে নেমে ডাকবাক্সটা খুলতেই সেই চিঠিটাই আবার পেয়ে যান তিনি। এক মুহূর্তও দেরি করেননি; সোজা ডাকঘরের দিকে রওনা দিলেও গলির মাঝখানে এসে থেমে যান। তখন খেয়াল করেন, পায়জামাটা বদলাতে ভুলে গেছেন—পায়ে শুধু মোজা আর স্যান্ডেল। বাড়ি ফিরে পোশাক বদলাতে বদলাতে মনে করেন, এর একটা বিহিত করা দরকার।
রান্নাঘর থেকে ছুরি এনে অদক্ষ হাতে খামটা ছিঁড়ে ফেলেন তিনি।
চিঠিতে লেখা ছিল:
প্রিয় তামাউ লিপো,
একজন মানুষের নামই তার সবকিছু। নামই বলে দেয় আমরা কে, পৃথিবীতে আমাদের অবস্থান কোথায়। নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আমাদের ইতিহাস। নাম না থাকলে আমরা জানতাম না, হাতে পাওয়া চিঠিটা আমাদের জন্য, নাকি অন্য কারও উদ্দেশে লেখা।
তুমি চিঠিটা খুলে পড়েছ। তার মানে তুমি নিজেই স্বীকার করে নিয়েছ এই নাম এখন তোমার। তোমার নামেই গেছে চিঠিটা। আমরা ধরে নিচ্ছি, তুমিও নিজেকে সেই পরিচয়ে মেনে নেবে। সেই সঙ্গে মেনে নেবে তোমার অপরাধও—রিফ অঞ্চলে এক ব্যক্তির শিরশ্ছেদ করার অপরাধ। মানুষটি ছিল আমার বাবা। বহু বছর ধরে আমরা তার হত্যাকারীকে খুঁজে বেড়িয়েছি। আমরা শুধু তার নামটা পেয়েছিলাম। হত্যাকারী নিজেই স্বাক্ষরের মতো করে তার নামটি পাথরের ওপর লিখে রেখে গিয়েছিল। এই চিঠি পড়ে তুমি সেই নামটা নিজের করে নিয়েছ।
এখন হয়তো সেই ঘটনার কথা তোমার মনে পড়বে। হয়তো তুমি জানতে না, অথবা ভুলে গিয়েছিলে। যুদ্ধের সময় তুমি যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলে। পরে তোমার মা–বাবা ব্যাপ্টাইজের সময় তোমার নাম বদলে সেই অপরাধ আড়াল করতে চেয়েছিলেন।
আমাদের অনুসন্ধান অবশেষে শেষ হয়েছে। আমরা আশা করি, তামাউ লিপো, যখন আমরা তোমার গলা কেটে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেব, তখন অন্তত আমাদের চোখের দিকে তাকানোর সাহস তোমার থাকবে।
চিঠিটা পড়ে হাভিয়ের স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।
প্রতিটি চিৎকারের সঙ্গে হাভিয়েরের মনে হতে লাগল সে যেন একটু একটু করে তামাউ লিপো হয়ে উঠছে। খাম খোলার ছুরিটা সে আবার হাতে তুলে নিল। আরও শক্ত করে ধরল। ধীরে ধীরে সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল। সে জানত, শেষ ধাপে পৌঁছে দরজা খুললে রিফে শিরশ্ছেদ হওয়া সেই লোকের সন্তানেরা যে মুখটি দেখবে, সেটি আর হাভিয়েরের না। দেখবে তামাউ লিপোর মুখ।
রিফের সেই ঘটনার তারিখটা ঠিক মনে করতে পারছিলেন না তিনি—১৯১০? নাকি ১৯২০? তার মা–বাবারই তো তখন জন্ম হয়নি! এসব ভেবে পুরো বিষয়টা হেসে উড়িয়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু তবুও একধরনের অস্বস্তি তাকে গ্রাস করতে থাকে—যেন বহু পুরোনো কোনো অপরাধবোধ, নিজের চেয়েও পুরনো।
হঠাৎ স্মৃতির গভীরে ভেসে উঠল একটি দৃশ্য: একটি সামরিক পোশাক, পাহাড়ি প্রান্তর। একজন বৃদ্ধের বেরবারের রক্তাক্ত ঠোঁট। মৃত্যুর আগে মানুষটা প্রার্থনা করছিল।
—তামাউ লিপো! বাইরে থেকে কেউ একজন চিৎকার করে উঠল। একই সঙ্গে দরজায় ধাক্কা।
—আমরা জানি তুমি ভেতরে আছ, তামাউ লিপো!
—অন্তত আমাদের চোখের দিকে তাকানোর সাহস রেখো, আমরা যখন তোমার গলা কাটব!
প্রতিটি চিৎকারের সঙ্গে হাভিয়েরের মনে হতে লাগল সে যেন একটু একটু করে তামাউ লিপো হয়ে উঠছে। খাম খোলার ছুরিটা সে আবার হাতে তুলে নিল। আরও শক্ত করে ধরল। ধীরে ধীরে সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল।
তিনি জানতেন—শেষ ধাপে পৌঁছে দরজা খুললে রিফে শিরশ্ছেদ হওয়া সেই লোকের সন্তানেরা যে মুখটি দেখবে, সেটি আর হাভিয়েরের না হবে; দেখবে তামাউ লিপোর মুখ।
রোদোলফো লারা মেন্দোসা (জ. ১৯৭৩) কলোম্বীয়-ক্যারিবিয়ান কবি ও গল্পকার। গল্প ও কবিতার জন্য তিনি একাধিক পুরস্কার অর্জন করেছেন। তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি অ্যান্থলজিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গল্প-কবিতার পাশাপাশি তিনি কলম্বিয়ার সংবাদপত্রে প্রবন্ধ লিখে থাকেন। কলম্বিয়া ও চিলিতে বসবাস করেছেন। বর্তমানে আছেন দক্ষিণ স্পেনে।