আকাশজুড়ে কালো মেঘের ঘনঘটা, জল থই থই বরষা—বর্ষার এই আবহকে ঘিরেই ‘রেইনস্কেপ’ শিরোনামে দুই সপ্তাহব্যাপী একটি চিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। লালমাটিয়ার ভূমি গ্যালারিতে নবীন ও প্রবীণ চিত্রকরদের আঁকা চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে।

১০ জুলাই শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীতে মোট ৭৫টি চিত্রকর্ম রাখা হয়েছে। ভূমি গ্যালারির বরাত দিয়ে আয়োজক পক্ষ জানিয়েছে, এটি শুধু বর্ষার দৃশ্যাবলি নয়; বাংলাদেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের সঙ্গে বর্ষার সম্পর্কের গভীরতা উপলব্ধির শিল্পিত উপায়; একই সঙ্গে নানা প্রজন্মের শিল্পীদের সঙ্গে শিল্পচর্চার ধারাবাহিকতা ও সৃজনশীল ভাববিনিময়েরও একটি আয়োজন।

অংশগ্রহণকারী ৪ বর্ষীয়ান শিল্পীর মধ্যে রয়েছেন আবদুল মান্নান, রনজিৎ দাস, জামাল আহমেদ এবং রেজাউন নবী। তাঁদের সঙ্গে আরও ২১ জন তরুণ শিল্পী অংশ নিয়েছেন। প্রদর্শনীতে ২৫ জনের মধ্যে প্রথমেই আছেন অগ্রজ শিল্পী আবদুল মান্নান। ‘বর্ষা’ শিরোনামে তাঁর আঁকা তিনটি চিত্রের একটিতে পটজুড়ে পাতার ফাঁকে একগুচ্ছ বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল ফুটিয়ে তোলা হয়েছে; আরেকটিতে আকাশজুড়ে মেঘ ভেদ করে নদীতে নেমেছে ঢল—কাছে-দূরে দুটি নৌকাকে দেখা যায় এই দুর্যোগের মধ্যে চলতে। কালচে রঙের আকাশ ও নদীকে প্রায় একাকার করে ঢেউয়ের দুলুনি এবং বর্ষণের সময়কার অনুভূতিকে শিল্পী দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

জামাল আহমেদ পুরান ঢাকা, বুড়িগঙ্গা নদীর দুই পাড়ের মানুষ ও জলযানের হাঁকডাক-ব্যস্ততা, নদী বা সাগরপাড়ের ভেজা বস্ত্রে বালিয়াড়ি পাড়ি দিয়ে বাড়ি ফেরা, গ্রামবাংলার হলুদ শর্ষেখেত ধরে হেঁটে যাওয়া পরিবার—এসব নানা বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আঁকছেন। এবারও তিনি বৃষ্টি মাথায় করে হেঁটে কিংবা ছাতাসহ নগরবাসীর নৌকাযোগে ঘরে ফেরার দৃশ্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কালচে আকাশ থেকে নেমে আসা বৃষ্টির তোড় এবং ছাতার কালো উপরিভাগের নকশার পাশাপাশি গাঢাকা দেওয়া মানুষের উপস্থিতি মিলিয়ে কাজগুলোকে বর্ষণের এক স্মারক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রনজিৎ দাসের আঁকা বর্ষার তিনটি চিত্রকর্মের মধ্যে ব্যতিক্রমী হিসেবে বলা হয়েছে একটি কাজকে—বজ্রপাতের আকাশ, গ্রামবাংলার মানুষ যাকে ঠাডা পড়া বলে। সাহস করে বিস্ময়কর ভীতিমিশ্রিত সময়ের চিত্র তিনি অবলীলায় এঁকেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে।

রেজাউন নবী বর্ষাকালের অনুভূতিকে ধারণ করে মূর্ত-বিমূর্তের ধারায় ‘মাটিতে বৃষ্টির চুম্বন’ এবং ‘বর্ষণের সুর’—দুটি কাজ উপস্থাপন করেছেন।

এ ছাড়া ২১ জন তুলনামূলক তরুণ শিল্পীর তিনটি করে মোট চিত্রকর্ম আছে এই প্রদর্শনীতে। আয়োজক পক্ষের তথ্যমতে, এগুলোর প্রায় সবই বাস্তবানুগ ধাঁচে আঁকা—বর্ষণের আগে-পরে গ্রাম ও নগর, নদী, নৌকা, রিকশায় ভিজতে ভিজতে মানুষের যাতায়াত, বৃষ্টিতে বিলীয়মান দূর নিসর্গ, বর্ষার কদম ফুল, ভেজা কাক, পুরান ঢাকার বর্ষণসিক্ত এঁদো গলি এবং ভবনের সারি—সব মিলিয়ে বৈচিত্র্যময় দৃশ্য উঠে এসেছে।

তরুণ শিল্পীদের মধ্যে রবিউল ইসলাম নগরে বৃষ্টির তোড় অনুভব করা যায় এমন একটি আঁকায় মনোযোগ দিয়েছেন। দামাসুস হাচ্চা বর্ষণে নেয়ে ওঠা প্রকৃতির সতেজতা তুলে ধরেছেন; আনিসুর রহমান বৃষ্টির পর নগরের মহল্লা ও রাজপথে জল জমে থাকার বাস্তবতা চিত্রায়িত করেছেন। প্রদ্যুৎ ভট্টের জলরং চিত্রকর্মে নদী ও নগরে বাতাস লাগা বর্ষণের তোড়জোড় ধরা পড়েছে। সুমন বৈদ্য গ্রামীণ পটভূমি বেছে নিয়েছেন বৃষ্টির ছবি আঁকার জন্য। আঁখি সরকার বৃষ্টিতে রিকশার ছুটে আসা এবং পাখির চোখে দেখা পথচারীদের ছাতার মিছিল এঁকেছেন। বৃষ্টি নিয়ে প্রতীকী ছবিও রয়েছে রাশেদ কামালের।

কামরুজ্জোহা বৃষ্টি-বিরতিতে গরু নিয়ে রাখালের ঘরে ফেরার আগে ধুয়ে যাওয়া প্রকৃতির একটি ছবি এঁকেছেন; আরিফুল ইসলাম বৃষ্টিবিধৌত নিসর্গ তুলে ধরেছেন। মনজুর রশিদ বৃষ্টির জলে ক্রীড়ারত মাছরাঙা আর পায়রার ছবি এঁকে প্রদর্শনীর বৈচিত্র্য বাড়িয়েছেন। ওয়ারিয়র রহমান সামির কাজে বর্ষার অনুভূতি এসেছে; সুবর্ণ চক্রবর্তী বৃষ্টির রাতে ঢাকার যানজট ফুটিয়ে তুলেছেন। সম্পা জোহারের চিত্রপটে গ্রাম আর নগর—দুটিই সার্থকতার সঙ্গে চিত্রিত হয়েছে।

আমানুজ জাহিদ রিকশা ও কদম ফুল এঁকে বৃষ্টিবন্দনা করেছেন। তামান্না লিজা, কারিদুল ইসলাম, রুবেল খান ও হেলাল শাহর চিত্রকর্মে বর্ষণমুখর সময়ের অনুভূতি পাওয়া যায়। জয়ন্ত মণ্ডলের ‘অবিরাম বর্ষণে’ বৃষ্টিভেজা ভেড়ার দল দেখা যায়। ফাইরুজ এমরান নগরে বৃষ্টিতে যাত্রীসহ রিকশা ও চালকের ছুটে চলাকে তুলে ধরেছেন; ঝলক সাহা বৃষ্টিতে ছাতার নিচে জড়সড় যাত্রীসহ নদী পারাপারের দৃশ্য এঁকে বর্ষণমুখর বাংলার এই বিশেষ সময়টিকে উপস্থাপন করেছেন।

আয়োজক পক্ষ জানিয়েছে, প্রদর্শনীতে বর্ষা মৌসুমের নানা দিক তুলে ধরা হলেও এই সময়টিতে ফসল নিয়ে কৃষকদের সেই তুমুল সংগ্রাম মূলত শিল্পীদলের নাগরিক মনোভঙ্গির কারণে উপেক্ষিত হয়েছে—এমন একটি মূল্যায়নও সামনে এসেছে।

প্রদর্শনীটি চলবে ২২ জুলাই পর্যন্ত।