বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টায় বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। তবে আটলান্টার এই লড়াইটি কেবল একটি ফুটবল ম্যাচের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে দুই দেশের দীর্ঘ ইতিহাসের দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয়বার শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে এগোতে চায়, অন্যদিকে ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবারের মতো ফাইনালে ফেরার স্বপ্ন দেখছে ইংল্যান্ড।

ম্যাচটি যত ঘনিয়ে আসছে, আলোচনা কেবল লিওনেল মেসি, হ্যারি কেইন কিংবা জুড বেলিংহামের কৌশলে সীমাবদ্ধ নেই। আলোচনায় ফিরে এসেছে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ এবং ১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক আজতেকা ম্যাচ, যেখানে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং শতাব্দীর সেরা গোল ফুটবল বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছিল।

আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি এই উত্তেজনা প্রশমিত করতে চেয়েছেন। তিনি সংক্ষিপ্তভাবে বলেছেন, ‘এটা একটা ফুটবল ম্যাচ। আমি এটুকুই বলতে পারি।’ তবে ডিয়েগো ম্যারাডোনার ছেলে ম্যারাডোনা জুনিয়র ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা এটাকে সাধারণ ম্যাচ ভাবতেন না। এই ম্যাচ মনে করিয়ে দেয়, ফকল্যান্ডের যুদ্ধ আর সেখানে মারা যাওয়া আমাদের ভাইদের কথা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোনো ম্যাচই আর স্বাভাবিক হতে পারে না।’

ইংল্যান্ডের বর্তমান দলের অধিকাংশ খেলোয়াড় ১৯৮৬ সালের অনেক পরে জন্মেছেন। জুড বেলিংহাম, বুকায়ো সাকা বা অ্যান্থনি গর্ডনদের কাছে ম্যারাডোনা কেবল ইতিহাসের চরিত্র। তবে তারা অবগত যে, এই ম্যাচের গুরুত্ব কেবল ৯০ মিনিটের খেলার চেয়ে অনেক বেশি।

নিজের দীর্ঘ ১৯ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ২০৫টি ম্যাচ এবং ১২৫টি গোলের অভিজ্ঞ লিওনেল মেসি এর আগে কখনো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেননি। ৩৯ বছর বয়সে এই নতুন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে যাওয়া মেসি বলেন, ‘ইংল্যান্ড ছাড়া সবার বিপক্ষে খেলেছি আমি। এটা বিশেষ। কারণ, ওরা একটা শক্তিশালী দল। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এমন দলের বিপক্ষে খেলাটা বিশেষ ব্যাপার।’

ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড মেসির প্রভাব স্বীকার করলেও সতর্ক থাকার কথা বলেছেন। তিনি জানান, ‘সবাই মেসির কথাই বলবে। কারণ, সে ইতিহাসের অন্যতম সেরা। কিন্তু শুধু মেসিকে নিয়ে ভাবলে ভুল হবে। আর্জেন্টিনা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন শুধু মেসির জন্য নয়, পুরো দলটাই অসাধারণ।’

এই আসরে ৮ গোল করা মেসি বয়সকে তুচ্ছ করে নিজের ফর্ম ধরে রেখেছেন। তবে আর্জেন্টিনার স্কোয়াডের গড় বয়স প্রায় ৩০, এবং নকআউট পর্বের টানা অতিরিক্ত সময়ের ম্যাচগুলো তাদের শারীরিক শক্তি কমিয়ে দিয়েছে। বিপরীতে ইংল্যান্ডের গড় বয়স ২৬.৬ বছর, যা তাদের গতিতে এগিয়ে রাখলেও অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকতে পারে।

আর্জেন্টিনা চাইছে ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়তে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড চাইছে ছয় দশকের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাতে। এই ম্যাচের জন্য আর্জেন্টিনা ফিফার কাছে নীল জার্সি পরে খেলার অনুমতি নিয়েছে, যা ১৯৮৬ সালের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।

বেলিংহামের ফর্ম, কেইনের অভিজ্ঞতা এবং পিকফোর্ডের আত্মবিশ্বাসে ভরসা করে ইংল্যান্ড প্রস্তুত। অন্যদিকে মেসির স্থিরতা এবং স্কালোনির নীরব আত্মবিশ্বাসে বিশ্বাসী আর্জেন্টিনা। শেষ পর্যন্ত মাঠের লড়াইয়ে কে জয়ী হবে তা সময়ই বলে দেবে, তবে ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার লড়াই হবে এই সেমিফাইনালের মূল আকর্ষণ।