ছেলেটার শরীরটা একটু গোলগাল, খুব জোরে দৌড়াতেও পারত না। সমবয়সীদের সঙ্গে ফুটবল মাঠে চলতে পারত না তাল মিলিয়ে। ৯ বছর বয়সে আর্সেনালের একাডেমিতে ট্রায়াল দিতে গিয়ে ছেলেটা তাই পারেনি কোচদের মুগ্ধ করতে। কান্নাভেজা চোখে বাসায় ফিরেছিল সে। বাবা শুধু বললেন, ‘কোনো সমস্যা নেই, আমরা নতুন ক্লাব খুঁজব।’ সেই ছেলেটা এখন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক, তাদের ‘ওয়ান্ডারওয়াল’। হ্যারি কেইন শুধু ইংল্যান্ডের মূল ভরসা নন, একটা অনুপ্রেরণার নামও।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আজ কেইন যখন মাঠে নামবেন, তাঁর পেছনে ফেলে আসা সেই জীবনের কথা কি একটু মনে পড়বে? সেই কেইন, যাঁকে একের পর এক ক্লাব ঘুরতে হয়েছে ধারে। মিলওয়াল, নরউইচ, লেস্টার ঘুরে কেইন একটা সময় সংশয়ে পড়ে গিয়েছিলেন, আদৌ কি বড় স্ট্রাইকার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে কোনো দিন? ২০১৩ সালে দেখা একটা ইউটিউব ভিডিও ফিরিয়ে দিল নিজের ওপর হারানো বিশ্বাস। আমেরিকান ফুটবল কিংবদন্তি টম ব্র্যাডিকে নিয়ে একটা তথ্যচিত্রে কেইন দেখেন—কীভাবে দুর্বল গড়ন, রোগা শরীর, কবজিতে জোর না থাকা ব্র্যাডি হয়ে গেছেন আমেরিকান ফুটবলের সেরা কোয়ার্টারব্যাকদের একজন। কেইনের জীবনটা বদলে যায় সেখানেই।
বদলে যাওয়া সেই কেইন এই বিশ্বকাপে যা করেছেন, সেটি তাঁকে ইংলিশ ফুটবলে অমরত্বই এনে দিয়েছে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোলে শুরু। এরপর ইংল্যান্ডের ত্রাতা হয়ে এসেছেন কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচে। হারতে থাকা ইংল্যান্ডকে প্রথমে সমতায় ফিরিয়েছেন দারুণ এক হেডে, এরপর ডান পায়ের দুর্দান্ত এক শটে ভাসিয়েছেন আনন্দে। পানামার বিপক্ষে তৃতীয় ম্যাচে ইংল্যান্ডের জার্সি গায়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটিও কেড়ে নিয়েছেন গ্যারি লিনেকারের কাছ থেকে। মেক্সিকোর বিপক্ষে আবার পেনাল্টি থেকে গোল, বিশ্বকাপে ১৪ গোলে ছুঁয়ে ফেললেন জার্মান কিংবদন্তি গার্ড মুলারকে।
কিন্তু এসব পরিসংখ্যানও পুরোপুরি কেইনকে বোঝাতে পারছে না। কঙ্গোর ম্যাচের পর সেই মুহূর্তটার কথা মনে করুন। দলকে জেতানোর পর ম্যাচ শেষে সতীর্থরা গোল হয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন তাঁর কথা। যেন খণ্ডযুদ্ধ জয়ের পর সেনাপতি মনে করিয়ে দিচ্ছেন, আসল লড়াইটা এখনো বাকি। কিংবা সেই কেইনের কথাই মনে করুন, যিনি সেই ম্যাচ শেষে গ্যালারিতে গিয়ে সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। পারিবারিক জীবনেও খুবই সুস্থির কেইন, দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গিনীকে নিয়ে সুখী সংসার তাঁর। একজন নিপাট ভদ্রলোক ও ‘ফ্যামিলি ম্যান’—কেইন যেন ব্রিটিশ ফুটবলে সবার চোখেই আদর্শ একজন ‘ভালো ছেলে’।
কেইনের মাথাটা কেমন ঠান্ডা, সেই প্রমাণ পাওয়া যায় পেনাল্টি বক্সে। পেনাল্টিতে কেইনের সাফল্যের হার ৮৭ শতাংশ। টাইব্রেকার বাদ দিলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে তাঁর চেয়ে বেশি সফল পেনাল্টি (৬টি) আর কেউ নেয়নি। এই পেনাল্টি নিয়েও কেইনের আছে বিশেষ একটা আচার। বল বসানো, বুট মোছা, জার্সি ঠিক করা, সাত পা পিছিয়ে গিয়ে দুবার গভীর নিশ্বাস—কেইনের কাছে পুরো ব্যাপারটাই একটা গভীর ধ্যান।
অধিনায়ককে তো নেতা হতেই হয়, কেইন হয়ে উঠেছেন দলের অভিভাবকও। নরওয়ের বিপক্ষে জয়ের পর ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেল ও দলের আরেক তারকা জুড বেলিংহামের মধ্যে মতবিভেদ নিয়ে মিডিয়ায় যখন তোলপাড়, কেইনই এগিয়ে এলেন আগুন নেভাতে। যা বলেছেন, তার সারমর্ম এই গোটা দলটাই একটা পরিবার। আর পরিবারের মধ্যে তো মত-দ্বিমত হতেই পারে! এই দলের মূল ভরসা তিনি; কিন্তু বারবারই মনে করিয়ে দেন, ইংল্যান্ড শুধু একজনের ওপর নির্ভরশীল নয়।
ইংল্যান্ডের অ্যান্থনি গর্ডন একবার একটা কথা বলেছিলেন, সুযোগ থাকলে তিনি কেইনের প্রতিটি অভ্যাস আয়ত্ত করতে চান। আজ আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেই নিখুঁত, ধ্যানী কেইনকেই চাইবে ইংল্যান্ড।






