চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রথম ছয় মাসে দেশে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতায় ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে এসব সহিংসতায় আহত হয়েছেন ৫ হাজার ২৪৬ জনেরও বেশি সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মী। এছাড়া মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৩৩ জন এবং আহত হয়েছেন ২৫৬ জন।
বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) তাদের ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমের সংবাদ, নিজস্ব সংগৃহীত তথ্য এবং ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এই অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রথম ছয় মাসে মোট ৮৩০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫৬ জন নিহত এবং ৫ হাজার ২৪৬ জনের বেশি আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির সদস্য ৩৭ জন, জামায়াতের ৬ জন, আওয়ামী লীগের ৩ জন, অন্যান্য দলের ৮ জন, চরমপন্থী দলের একজন এবং একজন সাধারণ নারী রয়েছেন। এসব সহিংসতার ৮১ শতাংশই ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল অথবা বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য দলের সংঘর্ষের ফলে।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনি প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্মীয় অবমাননা, আধিপত্য বিস্তার ও বাগ্বিতণ্ডার মতো বিভিন্ন অভিযোগ কেন্দ্র করে ২৬১টি ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত এবং ২৫৬ জন আহত হয়েছেন।
নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতা নিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ৩৯৬টি ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ২ হাজার ৫৭৮ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে ৬০০টির বেশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক মামলা ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছয় মাসে সন্ত্রাসবিরোধী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক আইনের আওতায় ১৪৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ৩ হাজার ২৬৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং ২৪ হাজার ৫১৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এই সময়ে অন্তত ৩ হাজার ৬৭ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৪০টি সভা-সমাবেশে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাধা দিয়েছে, যার ফলে ৩১১ জন আহত এবং ৩৮ জন আটক হয়েছেন।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়ে বলা হয়েছে, ছয় মাসে ২০০টি ঘটনায় ৩৮৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৩৪ জন আহত, ৬০ জন লাঞ্ছিত, ৪৯ জন হুমকির মুখে পড়েছেন এবং ১১ জনকে আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর আওতায় ১৫টি মামলায় ৩৩ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫০টি হামলার ঘটনায় ৫৬ জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এই সময়ে ১৯টি মন্দির, ১৫টি প্রতিমা এবং ৪৩টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া জমি দখলের চারটি ঘটনার পাশাপাশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর এক নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৩২টি ঘটনায় বিএসএফের হামলায় ৯ জন নিহত ও ৩৫ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ৩৮ জনকে আটক এবং ১৭৩ জনকে পুশ ইন (ঠেলে পাঠানো) করা হয়েছে। মিয়ানমার সীমান্তে ২০টি ঘটনায় একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন এবং আরাকান আর্মির স্থলমাইনের বিস্ফোরণে আরও ছয়জন নিহত হয়েছেন।
বিচারবহির্ভূত হত্যা প্রসঙ্গে জানানো হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ ও কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ছয় মাসে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে কারাগারে ৫৮ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছয় মাসে ১ হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪০৪ জন ধর্ষণের শিকার, ৮৮ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষণের পর ১৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে ১ হাজার ৭৭ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে এইচআরএসএস।






