এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষার্থীবান্ধব যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন এই কথা জানিয়েছেন। তিনি জানান, যাতায়াত সমস্যা বা জলাবদ্ধতার কারণে কোথাও বিঘ্ন ঘটলে স্থানীয় প্রশাসন প্রয়োজনে কেন্দ্র পরিবর্তন, পরীক্ষা স্থগিত কিংবা পরীক্ষার সময় বৃদ্ধিসহ প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
গতকাল অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষা পুনরায় নেওয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে আজ মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের পর রাতে এক ফেসবুক পোস্টে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানান মাহদী আমিন।
পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, "দেশজুড়ে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলমান রয়েছে। বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যে কেন এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, এ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শুভানুধ্যায়ীদের উদ্বেগ ও প্রশ্ন রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও যথেষ্ট ভেবেছে। পারিপার্শ্বিক সব পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের সব বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং অন্যান্য অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ভারী বর্ষণের কারণে সাময়িক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিল। তবে দেশজুড়ে পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে।"
শিক্ষার্থীদের গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘পরীক্ষার্থীরা আমাদের সন্তানতুল্য। তাদের ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন ও মানসিক অবস্থার গুরুত্ব সরকার গভীরভাবে উপলব্ধি করে। জনগণের নির্বাচিত সরকার হিসেবে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশে পরীক্ষা নিশ্চিত করতে দায়বদ্ধ। পরীক্ষার্থীদের যেন কোনো দুর্ভোগ না হয়, সেটি যেমন সরকারের লক্ষ্য, ঠিক তেমনি তাদের দীর্ঘদিনের পাঠ্যক্রম ও মানসিক প্রস্তুতিকে মূল্যায়ন করে যথাসময়ে ও সুষ্ঠুভাবে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সম্পন্ন করাও দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষাই অগ্রাধিকার।’
উপদেষ্টা জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয় আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। মঙ্গলবার সকালেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পর দেখা গেছে, চট্টগ্রাম বোর্ড ছাড়া বাকি সব বোর্ডের এলাকায় পরীক্ষার অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। তবে সীমিতসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভোগান্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি—এই পাঁচ জেলায় ১৬ জুলাই পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। মাহদী আমিন জানান, পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নে দুটি ভুল পাওয়া যাওয়ায় সবাইকে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা শিক্ষার্থীবান্ধব নীতিরই প্রতিফলন।
তিনি আরও বলেন, "স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, কোথাও যাতায়াত বা জলাবদ্ধতার কারণে সমস্যা হলে প্রয়োজনে কেন্দ্র পরিবর্তন, পরীক্ষা স্থগিত কিংবা পরীক্ষার সময় বৃদ্ধিসহ যেকোনো প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত তাঁরা নিতে পারবেন। যদি বিরূপ আবহাওয়ার কারণে দেশের কোথাও কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে না পারে, তবে তারা চট্টগ্রাম বোর্ডের স্থগিত হওয়া পরীক্ষার সঙ্গে একই দিনে অংশগ্রহণ করতে পারবে।"
সোমবার কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে নৌকায় পরীক্ষার্থী পারাপারের ছবি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি জানান, কুমিল্লা বোর্ডের ১৯৩টি কেন্দ্রের মধ্যে কেবল এই একটি কেন্দ্রের ৯৮৭ জন শিক্ষার্থী সাময়িক সমস্যায় পড়েছিল। ফলে সমন্বিত সিদ্ধান্তে ওই কেন্দ্রের পরীক্ষা এক ঘণ্টা পিছিয়ে দিয়ে পূর্ণ সময় নিশ্চিত করা হয়। বাকি ১৯২টি কেন্দ্রে পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিও ও ছবি প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, "সারা দেশে ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তার মধ্যে মুষ্টিমেয় কিছু কেন্দ্রের ছবি ও ভিডিও নিশ্চয়ই পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে না। মিথ্যা-পুরোনো ছবি ও ভিডিও দিয়ে অপপ্রচার চালানো কিংবা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল ও উসকানি গণ-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ বিষয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা নিশ্চয় সজাগ রয়েছে।"
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গঠনমূলক সমালোচনা ও মতের পার্থক্য থাকতে পারে, তবে জাতীয় স্বার্থে ঐক্য প্রয়োজন। তিনি বিশ্বাস করেন, এই শিক্ষার্থীরাই আগামী বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে, তাই তাদের সহযোগিতা করা সবার দায়িত্ব।
বর্তমান সরকারের দায়বদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় তাঁরা জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিছু শিক্ষার্থীর কষ্ট হয়েছে এবং কিছু কেন্দ্রে ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে, তবে বড় একটি অংশ নির্বিঘ্নে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।
তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, এইচএসসি পরীক্ষার্থীরাই আগামীর দেশ বিনির্মাণের কারিগর। তাই সব দ্বিধা ও অস্থিরতা কাটিয়ে মেধার ওপর আস্থা রেখে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করে সর্বোচ্চ ফল অর্জন করা উচিত।
সবশেষে তিনি বলেন, ‘আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব, এমন পরিবেশ অটুট রাখা, যেন শিক্ষার্থীরা আতঙ্কিত না হয় বা তাদের আত্মবিশ্বাস কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়। আগামী দিনের পরীক্ষাগুলোতে শিক্ষার্থীরা সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে অংশগ্রহণ করবে, নিজেদের সাফল্যে নিশ্চিত করবে বাংলাদেশের সমৃদ্ধি, ইনশা আল্লাহ।’






