সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলায় অবস্থিত সুখাইড় রাজবাড়ি প্রাচীন নির্মাণশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি স্থানীয়দের কাছে ‘রাজমহল’ নামে পরিচিত। সুনামগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে, মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে এবং পাহাড়ি নদ বৌলাই ও ঘাগলাজুরের উত্তর তীরে এর অবস্থান। তৎকালীন সময়ে এই জমিদারি এস্টেটটি ছিল ওই অঞ্চলের অন্যতম প্রভাবশালী ও ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র।

ইতিহাস অনুযায়ী, আনুমানিক ১৬৯১ সালে মোগল শাসনামলে মহারাজা মহামাণিক্য দত্ত হুগলী থেকে আসামে যাওয়ার পথে ‘কালিদহ সাগর’ বা বৃহৎ হাওর ও ভাটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সুখাইড়ে জায়গির কেনেন। এরপরই এখানে বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু হয়। পরবর্তীকালে ১৬৯৫ সালে জমিদার রাজীব রায় চৌধুরী, মোহনলাল রায় চৌধুরী ও কেশব রায় চৌধুরী ২৫ একর জমির ওপর মূল রাজবাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। কয়েক প্রজন্মের প্রচেষ্টায় নির্মিত এই রাজমহলটি তৎকালীন সুনামগঞ্জের ৩২টি পরগনার মধ্যে তার স্থাপত্যশৈলীর জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিল।

সুখাইড় জমিদারির বিস্তৃতি ছিল দক্ষিণে ঘাগলাজুর নদ, উত্তরে বংশীকুন্ডা, পশ্চিমে ধর্মপাশা উপজেলা এবং পূর্বে জামালগঞ্জ উপজেলা পর্যন্ত। এই জমিদারির অধীনে কালা পানির বিল, ফিরা গাঙ্গের বিল, ধানকুনিয়া বিল, চারদা বিল, দাইড়, সোনামোড়ল, পাশোয়া, ছাতিধরা, রাকলা, বৌলাই, নোয়ানদী ও চেপ্টা এক্স হেলইন্নাসহ ২০টির বেশি বৃহৎ জলমহল বা বিল অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্ষাকালে চারপাশের হাওর পানিতে ভরে গেলে রাজবাড়িটিকে একটি ভাসমান প্রাসাদের মতো মনে হয়।

এই রাজবাড়িকে কেন্দ্র করে একটি জনপ্রিয় লোককথা প্রচলিত আছে। বলা হয়, তৎকালীন ইংরেজ প্রশাসক বেলেন্টিয়ার টাঙ্গুয়ার হাওরে বাঘ শিকারে গিয়ে তিনটি বাঘের মুখে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। খবর পেয়ে তৎকালীন জমিদার চিত্তরঞ্জন রায় চৌধুরী ব্রিটিশ আইন উপেক্ষা করে সাহসিকতার সাথে বাঘ তিনটিকে গুলি করে মেরে বেলেন্টিয়ারকে উদ্ধার করেন। এই বীরত্বের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ইংরেজ সাহেব তাঁকে একটি বন্দুক উপহার দিয়েছিলেন।

মহারাজা মহামাণিক্য দত্তের উত্তরাধিকারীদের ‘রায় চৌধুরী’ উপাধির পেছনেও রয়েছে বিশেষ ইতিহাস। বংশধর মলয় রায় চৌধুরীর সূত্রে জানা যায়, তাঁদের এক পূর্বপুরুষ রাজাপুরে এক সুন্দরী ও ধনাঢ্য পরিবারের কন্যাকে বিয়ে করে নিজের উপাধি পরিবর্তন করেন। পরবর্তীতে মহারাজা মহামাণিক্যের চতুর্থ পুরুষ প্রতাপ রায় চৌধুরী রাজাপুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের কন্যাকে বিয়ে করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তাঁর নাম হয় মুহাম্মদ আমির চৌধুরী। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর তিনি জমিদারির অর্ধেক অংশ লাভ করেন এবং রাজাপুরের জমিদার হিসেবে শাসনভার পরিচালনা করেন।

তৎকালীন সময়ে সুখাইড় রাজবাড়ির জাঁকজমক ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রচলিত আছে যে, ব্রিটিশ ভারতের সুনামগঞ্জ মহকুমার এসডিও (বর্তমান ডিসি) অফিসে যখন আলোর জন্য সাধারণ হারিকেন ব্যবহৃত হতো, তখন সুখাইড় রাজবাড়িতে শোভা পেত বিভিন্ন ধরনের রঙিন আধুনিক আলো।

১৯৫০ সালে পাকিস্তানি শাসনামলে প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের প্রজাস্বত্ব আইন পাসের পর জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি ঘটে, যা ১৯৫৬ সালে সুখাইড় এস্টেটে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়। এর ফলে রাজবাড়ির ২৫ একর জায়গা এবং সামান্য কিছু ধানের জমি ছাড়া বাকি সব সম্পত্তি সরকারের খাস খতিয়ানে চলে যায়।

বর্তমানে অযত্ন ও অবহেলায় রাজবাড়ির বাংলোঘর, কাছারিঘর, জলসাঘর, গুদামঘর, সদরমহল, অন্দরমহল, হাতিশাল, ঘোড়াশাল, খাসকামরা ও আঙিনার বিশাল পুকুর হারিয়ে যেতে বসেছে। জরাজীর্ণ অবয়ব সত্ত্বেও এই রাজবাড়ি আজও পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমীদের আকর্ষণ করে। এই অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যটিকে রক্ষা করতে এবং এর সংস্কার ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে।