নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরে রেলওয়ের ৩৩টি শতবর্ষী গাছ কাটার লক্ষ্যে গৃহীত নিলাম কার্যক্রম স্থগিত করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং স্থানীয় নাগরিকদের তীব্র সমালোচনার মুখে ‘অনিবার্য কারণবশত’ এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আপাতত নিলাম স্থগিতের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানানো হলেও এটিই চূড়ান্ত সমাধান নয়। কারণ, রেলওয়ের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে—পরবর্তী সময়ে নতুন বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিলামের তারিখ জানানো হবে। ফলে এই জীবন্ত ঐতিহ্যগুলো পুরোপুরি অক্ষত থাকবে কি না, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি না মেলায় পরিবেশসচেতন নাগরিকরা উদ্বিগ্ন।
১৮৭০ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের বৃহত্তম কারখানাটি সৈয়দপুরে গড়ে ওঠার সাথে সাথেই এই পরিকল্পিত শহরের পত্তন ঘটে। ব্রিটিশ আমল থেকে আজ পর্যন্ত এই গাছগুলো কেবল শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেনি, বরং ইতিহাসের এক নির্বাক সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো শহরের ফুসফুস এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের অতন্দ্র প্রহরী। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি, গাছগুলোর অধিকাংশ বর্তমানে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হয়ে পড়েছে এবং সে কারণেই বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে সেগুলো কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে উন্নয়ন বা নিরাপত্তার অজুহাতে পুরোনো গাছ কেটে ফেলার এই ধ্বংসাত্মক মানসিকতা প্রশ্নবিদ্ধ। প্রশ্ন জাগে, শতবর্ষী একটি গাছকে কেবল ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ তকমা দিয়ে কেটে ফেলাই কি একমাত্র সমাধান?
পরিবেশবিদ ও আধুনিক নগর-পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি শতবর্ষী বৃক্ষ কেটে ফেলার বিপরীতে পাঁচ হাজার নতুন চারা রোপণ করলেও সেই পরিবেশগত শূন্যতা পূরণ হতে কয়েক দশক সময় লাগে। এছাড়া ঐতিহ্যবাহী গাছ কাটার পরিবর্তে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ডালপালা ছাঁটা বা বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রয়েছে। সৈয়দপুরের স্থানীয় বাসিন্দারাও এই গাছগুলো কাটার পরিবর্তে সংরক্ষণের সুযোগ খোঁজার যৌক্তিক দাবি জানিয়েছেন।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের উচিত হবে নতুন করে নিলামের আয়োজন না করে পরিবেশবিদ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা। গাছগুলো প্রকৃতপক্ষে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ এবং ডালপালা ছেঁটে সেগুলোর আয়ু ও নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ঐতিহাসিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনা করে এই ৩৩টি গাছকে ‘ঐতিহ্যবাহী স্মারক’ হিসেবে ঘোষণা করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়াই হবে যৌক্তিক। ইতিহাস ও পরিবেশ ধ্বংস করে কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়; রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এই সত্যটি অনুধাবন করে গাছগুলো রক্ষায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে—এটাই প্রত্যাশা।