সেদিন সকালে বউকে জানালাম, আজ অফিসে যাব না। ঠান্ডা স্বরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন? শরীর খারাপ তোমার?’
আমি বললাম, ‘না। আজ ব্রাজিল হারছে।’
চোখ কপালে তুলে তিনি বললেন, ‘ওমা! তুমি ব্রাজিল!’
তারপরই তিনি শুনিয়ে দিলেন, ‘আরে বস তো ব্রাজিলভক্ত। আজ তার দাঁতের বাগান বের হবে না। তার মলিন মুখ আমার কিছুতেই সহ্য হবে না।’
এ কথা শুনেই বউ বললেন, ‘এ জন্যই তোমাকে আজ যেতে হবে। তুমি না বলো, সহকর্মী মানে সহমর্মী। এই তোমার মানবিকতার নমুনা! ছি ছি! আর ওই ফিফার বাচ্চা! আরেকটা দলকে এমন দুর্বল টিমের সাথে ফেলায়! চ্যালচ্যালাইয়া জেতে...।’
তিনি অনএয়ারে রেখেই আবারও বললেন, ‘তুমি না ফ্রান্স! তোমার দলের সাথে পড়লে এমনিতেই প্যাকেট...।’
আমি হেসে বললাম, ‘হ। যার হিসাব তার কাছে।’ এরপর তিনি মোবাইল এগিয়ে ধরে বললেন, ‘এরে দেখলেই দানব দানব লাগে। দলটাকে নাকানিচুবানি দিছে একেবারে।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আজিব। তোমার মায়াকান্না কেন?’
উত্তরে তিনি বললেন, ‘হ, ওইটা তুমি বুঝবা না। আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা যেইভাবে সারা দিন ট্রল করবে। এই জ্বালায় ব্রাজিলিয়ানরা অনলাইনেই আসবে না। আর আমার পোস্টেও লাইক কম পড়বে।’ তারপর তিনি মোবাইল দেখিয়ে যোগ করলেন, ‘দেখো, মাহী কী পোস্ট দিছে। ফাজিল!’
মাহীর পোস্টে লেখা, ‘হলুদের বুকে লাল, এখন থেকে তারা পর্তুগাল।’ পোস্টের কমেন্টস বক্সে নানা ধরনের ট্রলও দেখা গেল। কিছু কমেন্টস আবার পড়ার অযোগ্য।
রাজনৈতিক ভাষায় বলা হয়, ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু।’ কিন্তু ফুটবল সমর্থনের ক্ষেত্রে বাস্তবটা অন্য। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের বিরুদ্ধে সবাই যেন এক কাতারে। ফলে সকালটা কেটে গেল নানা তত্ত্ব-তথ্যের মধ্যে।
অফিসে যাওয়ার পথে রাহাতের সঙ্গে দেখা। তিনি বললেন, ‘আঙ্কেল, আমার দলের পাল্লা এখন ভারী।’ ছয় বছর বয়সী এই ছেলে কলোনির পর্তুগালের একমাত্র প্রতিনিধি। তার পাশে থাকা এক তরুণ ওকে উদ্দেশ করে বলল, ‘তোমার দলের আয়ু আঠারো ঘণ্টা।’ কথায় পরিষ্কার, তারা পর্তুগালকে চাইছে না।
ওদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে হাঁটতে হাঁটতে ফকিরাপুল মোড়ের এক পত্রিকার দোকানের সামনে দাঁড়ালাম। হকার জানালেন, ‘কারবারডা দেখলেন? ভাগ্যিস, তাগো খেলা ৭ তারিখে পড়ে নাই। মেসির ৭, এমবাপ্পের ৭, আবার এই হালায় হালান্ড, হেরও ৭ গোল।’ তখন এক তরুণ বলে উঠল, ‘রাতে আপনারাও নরেনটিনা হলেন।’
সন্ধ্যা পর্যন্ত মিশে গেল অম্ল-মধুর কথার মধ্যে। রাত নামতেই আর্জেন্টিনার সমর্থকদের দেওয়া ‘পর্তুজিল’ বিদায় নিল। বুকে পাথর চাপা দিয়ে পিরামিডের দেশটির জন্য প্রার্থনা শুরু করল পর্তুজিলরা।
৭ জুলাই সন্ধ্যায় পল্টন মোড়ে এক দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদকের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি জার্মানির সাপোর্টার। তার ভাষায়, এই দলের সাপোর্টাররা এখন নির্ভার। তিনি শিল্পী ধ্রুব এষের বাসায় গেছেন লেখা চাইতে। ধ্রুব এষ নাকি তাঁকে বলেছেন ‘আর্জেন্টিনা হারলে লিখবেন না।’
‘খেলা’ আর ‘লেখা’—একই অক্ষরঘেঁষা দুই শব্দ। আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য জয়ের হিসাব নিয়েই একজন সম্পাদকের লেখা দাঁড়িয়ে আছে বলেই মনে হলো। আবেগের কাছে বিবেকের মূল্য নিয়ে প্রশ্নটা ঘুরপাক খেল মনে।
রাত দশটা বাজতেই ঘরে বসে আছি। কলোনির ক্লাব থেকে ভেসে এল ভারী গর্জন। এত দ্রুত আর্জেন্টিনা গোল দিল! গুগল থেকে স্কোর মিলিয়ে চোখ বড় হয়ে গেল। দ্রুত ক্লাবের টিভির সামনে যেতে হলো। সেখানে কাওসার দুলাভাই, এবং মুরব্বিরাও ছিলেন।
কাওসার দুলাভাইয়ের কণ্ঠে শোনা গেল, ‘আজকে যে করেই হোক, মিসরকে জেতাতে হবে।’ কথা শেষ হতে না হতেই সঙ্গে সঙ্গে গুঞ্জন উঠল—‘ঠিক ঠিক। শালার পেনালটিনাকে সাইজ করবে।’
এরপর পেনালটিও মিস হলো। কলোনির মানুষ জোরে জোরে চিৎকার করে উঠল, ‘মেসি মিস, মেসি মিস।’ চিৎকারে মুখর হয়ে উঠল পুরো এলাকা। চিল্লাচিল্লি শুনে আমজাদ সাহেবও ছুটে এলেন। উপস্থিতি দেখে তিনি আমাকে, কাওসার দুলাভাইকে এবং জাকির হোসেন মিমকে দেখে বললেন, ‘যাক এখানে তিন মুরব্বি আছে, চিন্তা নাই!’ এরপর তিনি চলে গেলেন।
মিম সাহেব আর্জেন্টিনার ঘোর সাপোর্টার। তার আফসোস, ‘আমাদের সাপোর্টাররা সারা দিন কইছে, মিসর শক্তিশালী টিম। ওগো মুখের কথা ফইলা গেল!’ কথা শেষ হতেই আবারও হাসির রোল উঠল। একটু পর শুরু হলো মিসরের ‘গোল বাতিল’ উৎসব—আবারও মিসরের স্কোর লাইনে যোগ হলো ‘দুই’। তখন একজন বলল, ‘আল্লাহর মাইর, দুনিয়ার বাইর।’ আরও একজন বলল, ‘হ, হ’।
আরেক তরুণের মন্তব্য—‘তিন দিনের দুনিয়া। তিন পীরের বিদায় এক–এক করে।’
নেইমার, রোনালদো, মেসি—শোকসন্তপ্ত পরিবেশ। তবে পাল্টা গোল উৎসবে শেষ মুহূর্তের টানটান আবহ কেটে গিয়ে স্বাভাবিক হতে থাকে। ম্যাচ শেষে বকরটিনা জানতে চাইল, ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়?’ উত্তরে বলা হলো, ‘হ, তা যায়। মাফিয়ার মান রেফারি বাঁচায়।’
এরপর কাওসার দুলাভাই কোমরে গামছা পেঁচিয়ে বললেন, ‘পরিবেশ ঠান্ডা করতে হবে তাড়াতাড়ি।’ হাতাহাতির পর্যায় পেরিয়ে সবাইকে ঘরে ফিরিয়ে বাসায় যেতে যেতে মনে হলো, ম্যাচের সঙ্গে সঙ্গে কথার তাপও বাড়ে।
বউ ঘরে ফিরে বললেন, ‘গোল হওয়ার মুহূর্তে কমেন্ট্রি বক্সের ঘোষণাকারীর কণ্ঠ পরীক্ষা করসো? দেখো, মিসর গোল দিলে তাদের গলার স্বর কেমন! আর আর্জেন্টিনার সময় কেমন!’
এরই মধ্যে অন্তর্জালজুড়ে পক্ষ-বিপক্ষ, যুক্তিতর্ক, ফিফান্টিনা, ম্যাচ অব দ্য রেফারি, ক্লাব ফুটবলের নিয়মনীতি, রুলসমারানি, মেসি ইকোনমিকস—সহ নানা ধরনের শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠলাম সপ্তাহজুড়ে।






