নজরুল বুক ঠুকে লিখেছেন, ‘আমি চিরতরে দূরে চ’লে যাব, তবু আমারে দেব না ভুলিতে। আমি, বাতাস হইয়া জড়াইব কেশে, বেণী যাবে যবে খুলিতে।’
কাজী নজরুল ইসলামের সেই আত্মবিশ্বাস আমাদের মধ্যে দেখা যায় না—অন্তত কথায় কথায়। ছোটখাটো কষ্টে আমাদের চোখ ভিজে ওঠে। কখনও গলায় বিড়ালের মিউ তুলে প্রেমিকাকে বলা হয়, “আমরে কি ভুলে যাবা তুমি?”
প্রেমিকার ব্যাপারে শিহাবের অভিজ্ঞতা অবশ্য উল্টো সুরে। আমির খানের তৃতীয় বিয়ের দিন, শিহাবের চতুর্থ প্রেম বিস্ফোরিত হলো—মনে হলো, সম্পর্কটা ভেঙে গেল। কারণ সহজই—শিহাব আর্জেন্টিনার সমর্থক; তার প্রেমিকা রুনা ব্রাজিলের। সেদিন ব্রাজিল মাঠের মধ্যে হঠাৎ করেই গোল দিতে ভুলে গেল। পেনাল্টি পেল, গোলপোস্টে মারল না। ছুটে গিয়ে গোলকিপার পর্যন্ত বল নিয়ে যেতে থাকল, কিন্তু ডি-বক্সে ঢুকেই যেন ওদের মাথার ভেতর কেউ বলে উঠল—ভুলাআআ... ব্যস, কই গোলপোস্ট, কই তারা বল মারবে, কেন তারা মাঠে নেমেছে কিছুই তাদের যেন মনে পড়ে না। সব ভুলে গুলে খেয়েছে। শিহাব ব্যাপারটা বোঝাতেই ফেসবুকে দিল মোটামুটি নিরীহ এক পোস্ট—কী আজব এক রজনী, ব্রাজিল যেন গজনি!
‘গজনি’ ওই আমির খানেরই সিনেমা। তিনটা বিয়ে করতে না ভুললেও বিয়ের দিন প্রাক্তন স্ত্রীদের দাওয়াত দিতে না ভুললেও এই লোক ওই সিনেমায় সব ভুলে যেতেন। বুকে-পিঠে লিখে রাখতেন নাম-ঠিকানা-কর্তব্য!
এই স্ট্যাটাসটিই পরে রুনা আমলে নেন। শিহাবকে ফোন দিয়ে তিনি চিৎকার করে একটা গালি দিয়ে বললেন, “আমাদের মধ্যে আর কিছু নাই। আমারে ভুলে যাও...”
তবে চাইলেই তো ভুলে থাকা যায় না। শিহাবের ভেতরে এ কয় দিনেই দেবদাস লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কিছুক্ষণ পরপর তিনি টেক্সট দিচ্ছেন—লিখছেন, “ভুলতে পারতেছি না ভাই। ভুলতে পারতেছি না!”
আসলে ভুলে যাওয়ার দুর্নাম বাঙালির নয়—এ কথা বলার ভিতও আছে। হুমায়ূন আহমেদ নাকি তুলনা করেছিলেন গোল্ডফিশের সঙ্গে। গোল্ডফিশ নাকি কয়েক সেকেন্ড আগের জিনিসও মনে রাখতে পারে না; পৃথিবী তাই তার কাছে সব সময় নতুন। যদিও শুনেছি, এ কথা তেমন নিরেট সত্য নয়। গোল্ডফিশ ভুলুক বা না ভুলুক, আমরা তো ভুলে যাই-ই। ভুলে যাই বলে আমাদের রাস্তায় রাস্তায় অটোরিকশা চলে হাওয়ার বেগে; তারই সঙ্গে ট্রাক-বাস-বাংলা রিকশাও চলে। একই রাস্তায় একই সঙ্গে এত বিচিত্র যানবাহন যে ক্ষতিকর, তা আমরা মনে রাখতে পারি না।
ভুলে যাওয়ার এই অভ্যাস আরও বিস্তৃত। আমাদের গ্রামগুলো ভুলে গেছে বিদ্যুৎ শুধু যাওয়ার জিনিস না—আসা ও থাকারও জিনিস। ভুলে গেছি ডেঙ্গু বলে এক ভয়ংকর রোগ আছে এ দেশে। হামের ব্যাপার আমাদের যেমন বিস্মরণে, নিশ্চিতভাবে ডেঙ্গুকেও আমরা মনে না রেখে এড়িয়ে যেতে পারব। জ্বর হবে, শরীরব্যথা হবে, হাসপাতালে ভর্তি হব, কেউ কেউ মারাও যাব এবং খুব তাড়াতাড়ি এসব ভুলেও যাব—কারণ আমাদের মাথায় এত কিছু একসঙ্গে থাকে না।
থাকে যে না—তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ ফুটবল মাথার মধ্যে এমনভাবে ঢুকেছে যে এরই মধ্যে বাংলাদেশের ক্রিকেট চলছে তা খেয়াল করতে পারিনি। খেয়াল করলেও বুঝে উঠতে পারিনি। দেখা যায়, বাংলাদেশ জিম্বাবুয়ের সঙ্গে খেলতে নেমে যেন নিজেরাও জিম্বাবুয়ে হয়ে উঠেছে। এটা আমাদের আনন্দ দেয় খুব। পৃথিবীতে দুই ধরনের ক্রিকেট দল আছে—ভালো দল আর খারাপ দল। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এই দুইয়ের বাইরে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল হলো, যেখানে যেমন দল। এরা যদি অস্ট্রেলিয়া-সাউথ আফ্রিকার সঙ্গে খেলে, তাহলে তাদের মতো হয়ে ওঠে। মাঠে দারুণ ফাইট দেয়। আবার এরাই যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘জিম্বাবুয়ের সঙ্গে খেলে’ তখন তারা ঠিক তাদের মতো হয়ে যায়। ক্রিকেট-বিশ্বে এমন দলটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি...
এখন ফুটবল বিশ্বকাপের ফাঁকে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যে তেলেসমাতি করছে, তা কি আমরা ভুলে যাব, নাকি মনে রাখব?
তামিম ইকবাল কিন্তু বলেছিলেন, আমাকে ভুলে যাইয়েন না...






