বিশ্বকাপের আগে ইংল্যান্ড দলকে মাঠে বাজানোর জন্য তিনটি গানের নাম দিতে বলা হয়েছিল। ওয়েসিসের ‘ওয়ান্ডারওয়াল’ আর নিল ডায়মন্ডের ‘সুইট ক্যারোলিনের’ সঙ্গে আরেকটি গানও বেছে নেয় ইংল্যান্ড—বিটলসের ‘হেই জুড’।
ইংরেজ ব্যান্ড বিটলসের এই গান লেখা হয়েছিল ৫৮ বছর আগে। জুড বেলিংহামের জন্ম তারও ৩৫ বছর পর। তবু এই বিশ্বকাপের প্রেক্ষাপটে গানটি যেন বিশেষ অর্থ নিয়ে এসেছে—২৩ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডারের পারফরম্যান্সের সঙ্গে। নামটা এখন ইংল্যান্ডের ঘরে ঘরে; বেলিংহাম মানেই যেন ইংল্যান্ডের ভরসা। যারা এখনো ইংল্যান্ডের সমর্থক হিসেবে ‘ইটস কামিং হোম’ গাইতে পারছেন, সেই আনন্দে হ্যারি কেইনের অবদানও কম নয়—বেলিংহামের ভূমিকা আলোচনায় থাকছে সমানভাবেই।
ফুটবলের ভাষায় বেলিংহামকে বলা যায় আধুনিক ‘বক্স টু বক্স’ মিডফিল্ডার—যিনি খেলতে পারেন মাঠজুড়ে। তবে মিডফিল্ডারের জার্সি গায়ে খেললেও তিনি মাঠে নামেন কার্যকারিতার জন্যই। তা না হলে, একটি বিশ্বকাপে একজন মিডফিল্ডারের ৬ গোল করার কীর্তি যে খুব বেশি দেখা যায় না—এটাও মনে করিয়ে দেয় তাঁর প্রভাব কতটা তাৎপর্যপূর্ণ। এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের ছয় ম্যাচের মধ্যে চারটিতেই ম্যাচসেরা হয়েছেন বেলিংহাম—শুধু উপস্থিতি নয়, পারফরম্যান্সের কারণেই।
বেলিংহামের গল্প শুরু ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে, ২০১৯ সালের আগস্টে। মাত্র ১৬ বছর ৩৮ দিন বয়সে বার্মিংহাম সিটির জার্সিতে অভিষেক। এরপর ৪৪টি ম্যাচ খেলেই ২০ মিলিয়ন পাউন্ডে জার্মান ক্লাব ডর্টমুন্ডে পাড়ি জমান তিনি। বার্মিংহামের ১৭ নম্বর জার্সিটি ডর্টমুন্ডে তুলে রাখে চিরকালের জন্য—সাধারণত কিংবদন্তিদের সম্মান জানাতে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেই মর্যাদা বেলিংহাম ১৭ বছর বয়সেই পেয়ে গিয়েছিলেন বার্মিংহাম থেকেই।
ডর্টমুন্ডে তাঁর দুর্দান্ত অভিষেকের পরই ইংল্যান্ডের নজরে আসে, এই ছেলে হবে ইংলিশ ফুটবলের ‘নেক্সট বিগ থিং’। তবে ইংল্যান্ডের তৎকালীন কোচ গ্যারেথ সাউথগেট বেলিংহামকে নিয়ে তাড়াহুড়ো করেননি। ২০২১ ইউরোতে বদলি হিসেবে নেমেছিলেন তিন ম্যাচে। ২০২২ বিশ্বকাপে এসে বেলিংহাম যেন নিজের আগমনের বার্তা আরও জোরালোভাবে জানান।
ইরানের বিপক্ষে করেন নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক গোল—সেই বিশ্বকাপে একুশ শতকে জন্মানো কোনো ফুটবলারের সেটিই ছিল প্রথম গোল। ২০২৪ ইউরোতে স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত বাইসাইকেল কিকের গোলে তাঁর সেই বিখ্যাত ‘হু এলস’ উদ্যাপন বিশ্ব চিনেছিল।
বেলিংহামের জোড়া গোলে নরওয়েকে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছিল ইংল্যান্ড। এর মধ্যেই ইউরোপের বড় অনেক ক্লাবের নজরে পড়েন বেলিংহাম। আরও বড় অনেক খেলোয়াড়ের মতো তাঁর গন্তব্যও হয় রিয়াল মাদ্রিদ। ২০২৩ সালে অভিষেকের প্রথম মৌসুমেই ১৯ গোল, লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পর ইংল্যান্ডের পর স্পেনেও শুরু হয় ‘বেলিংহাম-ম্যানিয়া’।
তবে এক বছর ধরে দেখতে হয়েছে মুদ্রার উল্টো পিঠ। কাঁধের চোটে পড়ে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে ছিলেন তিনি। ইংল্যান্ড দলের একাদশেও আগের মতো অপরিহার্য ছিলেন না। এর মধ্যে নতুন ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেলের সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। টুখেল প্রকাশ্যে বেলিংহামের সমালোচনা করেন। পরে অবশ্য সে জন্য বেলিংহামের কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন তিনি।
বিশ্বকাপে দলে যদি তাঁর জায়গা নিয়ে প্রশ্ন উঠেও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই বেলিংহাম তার উত্তর দেন দারুণ গোলে। পানামার সঙ্গে গোলের পর নিজেদের সেরাটা ধরে রেখেছিলেন নকআউটের জন্য। শেষ ষোলোয় আজতেকায় মেক্সিকোকে স্তব্ধ করে দেওয়া জোড়া গোলের পর এবার নরওয়ের বিপক্ষেও জোড়া গোল—বেলিংহাম মানেই যেন ইংল্যান্ডের ‘চিট কোড’, যেটি দিয়ে জয় করা যায় যেকোনো বাধা।
কোয়ার্টার ফাইনাল শেষ হওয়ার পর পুরো ইংল্যান্ড বেলিংহাম প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সতীর্থ এলিয়ট অ্যান্ডারসন বলেছেন, ‘ও ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় কীভাবে থাকতে পারে, সেটি আমার কাছে একটা বিস্ময়।’ নরওয়ে ম্যাচের প্রতিপক্ষ আর্লিং হলান্ডের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘ইংল্যান্ড ভাগ্যবান ওর মতো একজন খেলোয়াড় পেয়েছে।’ ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি গ্যারি লিনেকারের কথাটা, ‘বেলিংহাম ইংল্যান্ডের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হতে পারে।’
নরওয়ের সঙ্গে ম্যাচের আগে হলুদ কার্ডের শঙ্কায় ছিলেন বেলিংহাম। কোনোভাবে আরেকবার শাস্তি পেলেই সেমিতে বসে থাকতে হতো। ম্যাচ শেষে বেলিংহাম বলেছেন, পুরো সপ্তাহে মা ডেনিস তাঁকে সতর্ক করে গেছেন নিজের ভাষা সামলাতে, ট্যাকল সাবধানে করতে, বেফাঁস কিছু না বলতে।
পুরো ইংল্যান্ডের পক্ষ থেকে বেলিংহামের মা একটা ধন্যবাদ পেতেই পারেন।