মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের একটি মামলায় গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর আলোচিত ব্যক্তি হরিদাস চন্দ্র তরনীদাসকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গতকাল রোববার রাতে গাইবান্ধা জেলা পুলিশের সহযোগিতায় পলাশবাড়ীর রাম মন্দির থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সোমবার দুপুরে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে গাইবান্ধার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. জসিম উদ্দীন মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে জানান, "ঢাকায় দায়ের হওয়া মানি লন্ডারিং মামলায় হরিদাস চন্দ্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১০ কোটি টাকা অবৈধ লেনদেন ছিল, এটা নগদ লেনদেন। এ ছাড়া হুন্ডির মাধ্যমেও লেনদেন হয়েছে।"

এসপি আরও জানান, গত ২ জুলাই থেকে সিআইডি এই অর্থের উৎস ও সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুসন্ধান করছিল। অনুসন্ধানের পর গতকাল হরিদাস চন্দ্রের বিরুদ্ধে ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করা হয় এবং ওই মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করে রাতেই ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।

সিআইডির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, হরিদাস চন্দ্র গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার মধ্য রামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং তাঁর বাবার নাম গোপীনাথ তরনীদাস। তিনি ২০০৬ সালে হাসবাড়ী বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০০৮ সালে ঢাকার একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ২০১০ সালে অবৈধভাবে ভারতে গিয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফেরেন।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৯ সালে হরিদাস ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তৌহিদ ইসলাম নাম ধারণ করেন। এরপর তিনি নিজেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করতেন। তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়া, বদলি, হুন্ডি ও সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বৈধ আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাবে ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা জমা এবং প্রায় সমপরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে, যা সিআইডি সন্দেহজনক হিসেবে দেখছে।

তদন্তে জানা গেছে, হরিদাসের ব্যাংক হিসাবগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা করেছেন, যা তাঁর পেশার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এছাড়া বনানী থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৪ ধারাসহ দণ্ডবিধির ১৬৭, ১৬৮, ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে একটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় সিআইডি মামলাটি করেছে এবং তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

এর আগে ২০২২ সালের ৮ নভেম্বর র‍্যাবের যৌথ অভিযানে সহযোগীসহ ঢাকার বনানী থেকে আটক হয়েছিলেন হরিদাস। সে সময় মামলা না হওয়ায় তাঁকে ৫৪ ধারায় কারাগারে পাঠানো হয় এবং পরবর্তীতে তিনি মুক্তি পান।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর হরিদাস চন্দ্র মধ্যরামচন্দ্রপুর গ্রামে দুই একর জমির ওপর শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দিরের অবকাঠামো আধুনিকায়নের কাজ শুরু করেন। সেখানে ২৮ ফুট উচ্চতার শিবমূর্তি ও ৫৩ ফুট উচ্চতার কৃষ্ণমূর্তি নির্মাণ করা হয়েছে এবং ৮১ ফুট উচ্চতার রামের মূর্তি নির্মাণাধীন রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর মন্দিরটির ৫১ ফুট উচ্চতার কৃষ্ণমূর্তি উদ্বোধন করেন ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার শ্রী মনোজ কুমার। এছাড়া ২০১৯ সালে ময়মনসিংহ বিভাগের ফুলবাড়িয়া এলাকায় প্রায় এক বিঘা জমি কিনে সেখানে রিসোর্ট করার তথ্য পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি হরিদাস চন্দ্রের আয়ের উৎস অনুসন্ধান এবং তাঁকে গ্রেপ্তারের দাবিতে গাইবান্ধায় সচেতন নাগরিক ফোরামের ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয়। এর অংশ হিসেবে কয়েক দফায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়, যার সর্বশেষটি গতকাল রোববার দুপুরে পলাশবাড়ী উপজেলা সদরের চৌরাস্তা এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়।