বাংলাদেশে শিশুদের জ্বর হলে চিকিৎসক ছাড়াই ওষুধের দোকানদার বা প্রতিবেশীর পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানোর একটি প্রচলিত প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে জ্বর তিন-চার দিনের বেশি স্থায়ী হলে অভিভাবকরাই চিকিৎসককে অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করার জন্য চাপ দেন। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, এই অভ্যাস শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

অপ্রয়োজনে বারবার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো নষ্ট হয়ে যায়, যা হজমশক্তি স্বাভাবিক রাখা এবং ইমিউন সিস্টেম গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য। ফলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সাধারণ সর্দি-কাশির মতো সমস্যায়ও শরীর লড়াই করতে পারে না, যার ফলে শিশু ঘন ঘন অসুস্থ হয়।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স। অপ্রয়োজনে কিংবা ওষুধের অসম্পূর্ণ কোর্সের কারণে শরীরের ব্যাকটেরিয়াগুলো ওই ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এর ফলে পরবর্তীতে যখন শিশু সত্যিই কোনো মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে আক্রান্ত হয়, তখন অ্যান্টিবায়োটিক আর কার্যকর হয় না। বর্তমানে বাংলাদেশে এমন অনেক শিশু পাওয়া যাচ্ছে যাদের শরীরে ছয়-সাত ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক আর কোনো প্রভাব ফেলছে না, যা অত্যন্ত ভয়াবহ একটি পরিস্থিতি।

এছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ডায়রিয়া, বমি, অ্যালার্জি বা ত্বকে র‍্যাশ দেখা দিতে পারে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, জীবনের শুরুর দিকে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে মনোযোগের ঘাটতি, অতিরিক্ত চঞ্চলতা এবং বিভিন্ন আচরণগত সমস্যা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এই ঝুঁকি এড়াতে করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লি. ময়মনসিংহের কনসালট্যান্ট (শিশুরোগ) ডা. মানিক মজুমদার। তিনি জানান, কখনোই নিজ থেকে বা দোকানদারের পরামর্শে শিশুকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো যাবে না; এটি হতে হবে কেবল নিবন্ধিত চিকিৎসক বা শিশুবিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী। মনে রাখতে হবে, ভাইরাসজনিত সাধারণ সর্দি, কাশি বা জ্বরে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না, বরং সঠিক যত্ন, পুষ্টি ও বিশ্রামে এসব সেরে যায়। চিকিৎসক যদি অ্যান্টিবায়োটিক লিখে দেন, তবে অবশ্যই পুরো কোর্স শেষ করতে হবে, অন্যথায় ড্রাগ রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সুষম পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধ পানি ও হাঁচি-কাশির শিষ্টাচারের প্রতি লক্ষ্য রাখা জরুরি।