হাঁটাচলার গতি কমে যাওয়া, হাত-পায়ের নিয়ন্ত্রণ হারানো কিংবা হাত কাঁপা—এগুলো পারকিনসনস রোগের পরিচিত লক্ষণ। সাধারণত প্রবীণদের এই সমস্যা বেশি দেখা গেলেও, অনেকের ক্ষেত্রে বয়স ৫০ বছরের আগেই এই রোগটি দেখা দিতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পারকিনসনস রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না, তবে মস্তিষ্কে প্রদাহ, স্ট্রোক কিংবা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলে এই সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে অল্প বয়সে এই রোগের লক্ষণ দেখা দিলে ‘উইলসন ডিজিজ’ নামক রোগটির কথা মাথায় রাখা প্রয়োজন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, ৫০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই পারকিনসনস হলে তাকে ‘যুব বয়সের পারকিনসনস রোগ’ বলা হয়। এর পেছনে বংশগত কিছু ত্রুটিপূর্ণ ‘জিন’ দায়ী হতে পারে। এছাড়া মানসিক রোগের ওষুধ, দুশ্চিন্তা, হতাশা ও ঘুমের ওষুধের দীর্ঘমেয়াদী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এই রোগ হতে পারে। অনেক সময় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই দীর্ঘ সময় ওষুধ সেবনের ফলে সমস্যাটি আরও জটিল আকার ধারণ করে।

সাধারণত ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের এই রোগের ঝুঁকি থাকে, তবে পুরুষেরা নারীদের তুলনায় বেশি আক্রান্ত হন। যাদের পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে, তাদের ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় কীটনাশক বা ভারী ধাতুর সংস্পর্শে থাকলে এই রোগের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এছাড়া ডায়াবেটিস রোগী, স্ট্রোক আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা অতীতে মাথায় আঘাত পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও পারকিনসনস হতে পারে।

এই রোগের প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—হাঁটাচলা ধীর হওয়া, কথা বলার আওয়াজ কমে যাওয়া, লেখার গতি কমে যাওয়া এবং লেখা ছোট হয়ে যাওয়া। এছাড়া হাত-পা কাঁপা, শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া এবং চলাফেরার সময় ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারা অন্যতম লক্ষণ। পাশাপাশি স্মৃতিশক্তি হ্রাস, অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

পারকিনসনস রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক রোগীর বিস্তারিত ইতিহাস এবং শারীরিক পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদী ওষুধ সেবনের ইতিহাস খতিয়ে দেখা হয়। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের এমআরআই (MRI) করা হতে পারে।

পারকিনসনস সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য না হলেও এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মস্তিষ্কে ডোপামিনের অভাবের কারণে এই রোগ হয়, তাই ডোপামিনজাতীয় ওষুধ চিকিৎসায় অত্যন্ত কার্যকর। তবে এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, তাই নিউরোলজি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ওষুধের পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম এবং ভারসাম্য রক্ষায় লাঠির ব্যবহার সহায়ক হতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। যাদের সমস্যা ওষুধে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না, তাদের জন্য ‘ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন’ নামক শল্যচিকিৎসা অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। সঠিক চিকিৎসা এবং নিয়ম মেনে চললে পারকিনসনস আক্রান্ত ব্যক্তিও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।