অতিবৃষ্টিজনিত জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা, দ্রুত ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিতভাবে কাজ করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও মাঠ প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

আজ রোববার দুপুরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জুম প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশের আট বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশের ডিআইজি, জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), সিভিল সার্জনসহ মাঠ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল সভায় তিনি এ নির্দেশ দেন।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) এ তথ্য জানান। তিনি জানান, সভায় বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজ নিজ এলাকার জলাবদ্ধতার সর্বশেষ পরিস্থিতি, ক্ষয়ক্ষতি, আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থা, উদ্ধার কার্যক্রম, ত্রাণ বিতরণ এবং চিকিৎসাসেবার অগ্রগতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব আরও বলেন, দুর্যোগপূর্ণ এ পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষাই প্রশাসনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার—এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী গাফিলতির সুযোগ না রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে দ্রুত ত্রাণসামগ্রী, শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি, শিশুখাদ্য, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন তিনি।

একই সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় নিরাপদ পরিবেশ, পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ ও যোগাযোগসুবিধা সচল রাখার বিষয়েও গুরুত্ব আরোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে নারী, শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী এবং গর্ভবতী নারীদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয় বলেও জানান উপ-প্রেস সচিব।

সুজন মাহমুদ জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্যোগকালীন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো অসাধু চক্র যেন চুরি, ডাকাতি, মজুতদারি, ত্রাণ আত্মসাৎ বা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সভায় দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের প্রস্তুতি, স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রম, উদ্ধার কার্যক্রমে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়, নদ-নদীর পানির স্তর এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়মিত পর্যবেক্ষণের বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।

এ সময় চট্টগ্রাম থেকে যুক্ত হওয়া কর্মকর্তারা জানান, সেখানকার জলাবদ্ধতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। তবে সিলেট অঞ্চলে মনু নদের বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে এবং রংপুর বিভাগে নতুন করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ তথ্য জানার পর প্রধানমন্ত্রী সম্ভাব্য সব ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ, প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা এবং জনগণের পাশে থেকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন বলে জানান উপ-প্রেস সচিব সুজন মাহমুদ।

এর আগে আজ সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ধানমন্ডি ও গুলশান লেকের সংস্কার ও উন্নয়ন এবং স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন–সংক্রান্ত একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন জানান, বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ধানমন্ডি লেক সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ, নজরুলসরোবর নির্মাণ এবং ঢাকার পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন–সংক্রান্ত প্রকল্প সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়। একই সঙ্গে গুলশান ও বারিধারা লেকের সঙ্গে সংযুক্ত সব অবৈধ বর্জ্য নির্গমন লাইন আগামী ছয় মাসের মধ্যে পুরোপুরি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ বলেন, বৈঠকে রাজউকের নেতৃত্বে গুলশান লেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, সৌন্দর্যবর্ধন এবং পরিবেশগত উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী ঢাকার লেকগুলো পুনরুদ্ধার ও পরিচ্ছন্ন রাখা এবং বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের বিষয়ে কয়েকটি উপস্থাপনা পর্যালোচনা করেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং রাজধানীর পরিবেশ ও জলাধার সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপও করেন প্রধানমন্ত্রী।

আরেক বৈঠকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আমিনবাজার এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটির মাতুয়াইলে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দুটি প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপ–প্রেস সচিব শাহাদাৎ হোসেন জানান, সকালে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বলা হয়—চীনের সিএমইসি গ্রুপ আমিনবাজারে একটি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণে বিনিয়োগ করবে। প্রকল্পটি প্রতিদিন ঢাকা শহরের প্রায় তিন হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং ২০২৮ সালের আগস্টের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে আগামী ২৫ বছর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলেও বৈঠকে জানানো হয়।

এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার বিঅ্যান্ডএফ কোম্পানি ঢাকা দক্ষিণ সিটির মাতুয়াইলে একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বলেও উল্লেখ করা হয়। বৈঠকের তথ্য অনুযায়ী, এ প্রকল্পের মাধ্যমে বছরে বর্জ্য থেকে প্রায় ১৫ হাজার টন মিথেন গ্যাস উৎপাদিত হবে এবং তা থেকে বছরে প্রায় ৮১ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে—যা দৈনিক প্রায় ২২১ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমতুল্য। এছাড়া প্রকল্প থেকে সৌরবিদ্যুৎ, সার, পশুখাদ্য এবং পরিবেশবান্ধব ইকো-ব্রিকস উৎপাদন করা হবে বলে জানানো হয়। প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার হবে বলেও বৈঠকে বলা হয়।

প্রকল্প দুটি দ্রুত এগিয়ে নিতে স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক আয়োজনের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

বৈঠকগুলোতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান, ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।