গায়ে একটা পাতলা রেইনকোট। মাথার ওপর বড় ছাতা দিয়ে ঢাকা ফলের ভ্যান—তবু মুষলধারে বৃষ্টির ছাঁট আর জমে থাকা পানি থেকে রেহাই মিলছে না। ক্রেতাশূন্য রাস্তায় অনিশ্চয়তা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ফল বিক্রেতা মো. জিয়া।
মোহাম্মদপুরের টিক্কাপাড়া রোডে আজ রোববার বেলা পৌনে ১২টার দিকে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। তখন চারপাশে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিল। এর মধ্যেই ফলের ভ্যানের পাশে ক্রেতার আশায় দাঁড়িয়েছিলেন এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
মো. জিয়া বলেন, স্বাভাবিক দিনগুলোতে দুপুরের আগেই কয়েক হাজার টাকার ফল বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু আজ তাঁর পকেট প্রায় খালি। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে জিয়া বলেন, ‘বৃষ্টি না থাকলে এতক্ষণে ২-৩ হাজার টাকার বিক্রি হইত। কিন্তু আজ সকাল থেকে মাত্র একজনের কাছে ৮০ টাকার ফল বেচছি। আসলে এমন বৃষ্টিতে কেউ বাসা থেকে বের হতে চায় না।’
শনিবার গভীর রাত থেকে আজ রোববার ভোর পর্যন্ত টানা বৃষ্টির পর সকাল থেকে রাজধানীতে আবার শুরু হয় মুষলধারে বর্ষণ। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গতকাল দিবাগত রাত ১২টা থেকে আজ সকাল ৬টা পর্যন্ত ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে, চলতি মাসে এই সময়ে যা সর্বোচ্চ। এই কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে গ্রিন রোড, পান্থপথ, ধানমন্ডি, মিরপুরের কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি জমে গেছে। মোহাম্মদপুরের রাস্তাঘাটেও অনেক স্থানে পানি জমেছে।
টানা ভারী বর্ষণ ও বিভিন্ন স্থানে পানি জমায় স্থবির হয়ে পড়েছে রাজধানীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। তবে এ ধরনের দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খায় জিয়ার মতো ক্ষুদ্র ও ভাসমান ব্যবসায়ীরা। দিন এনে দিন খাওয়া এসব মানুষের অনেকের আয় একেবারে তলানিতে ঠেকেছে। যেসব এলকার সড়কে হাঁটু বা কোমড়সমান পানি জমেছে, সেখানে বেচাকেনা কার্যত বন্ধ।
মোহাম্মদপুরের বিজলি মহল্লার বাসিন্দা জিয়া জানান, তিনি আজ সকাল ৬টায় সদরঘাটের বাবুবাজার পাইকারি আড়তের উদেশে যান। তখনো বৃষ্টি হচ্ছিল। বাবুবাজারে গিয়ে দেখেন, সেখানে রাস্তার ওপর পানি জমেছে। পানি ও বৃষ্টির মধ্যেই দুটি আড়ত ঘুরে পেয়ারা, ড্রাগন, মাল্টা, আম, আপেল ও নাশপাতি কিনে সকাল ৯টায় মোহাম্মদপুরে ভ্যানের ওপরে দোকান সাজিয়ে বসেন। কিন্তু বৃষ্টির কারণে বেচাকেনা হচ্ছে না বলে জানান তিনি।
জিয়া বলেন, সাধারণ দিনশেষে তাঁর ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা বিক্রি হয়। তবে সারা দিন এমন বৃষ্টি থাকলে এবং চেনা-পরিচিত গ্রাহকেরা না এলে ৩-৪ হাজার টাকার বেশি বিক্রি হওয়ার সুযোগ নেই।
বিক্রির এই সংকটের পাশাপাশি রয়েছে পণ্য নষ্ট হওয়ার শঙ্কাও। জিয়া জানান, আম পানিতে ভিজলে রং কালো হয়ে যায়, ফলে এই আম কেউ নিতে চায় না। তাই কিছুক্ষণ পরপর কাপড় দিয়ে ফলগুলো মুছছেন তিনি।
গায়ে রেইনকোট থাকলেও পানিতে পা ভিজে যাওয়ার কথা জানিয়ে জিয়া বলেন, ‘বৃষ্টিতে ঠান্ডা তো লাগে, এখন কী করব? দোকান যখন খুলছি, হালকাপাতলা তো ভেজা লাগবই।’
জিয়ার পাশের আরেকটি ফলের ভ্যানে রাজু হাওলাদারকেও দেখা গেছে। বৃষ্টি থামার আশায় দেরিতে দোকান খুললেও দুপুর পর্যন্ত ক্রেতার দেখা পাননি তিনি। হতাশা প্রকাশ করে রাজু বলেন, ‘কী কমু ভাই! বেচাকেনার অবস্থা একেবারে ভালো না। এখন পর্যন্ত একজনের কাছেও বিক্রি করতে পারিনি।’
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বৃষ্টির এই ধারা আরও কিছু সময় থাকতে পারে। অন্যান্য দুর্যোগের মতো এমন বাদল দিনে নিম্ন আয়ের মানুষেরাই সবচেয়ে ভুক্তভোগী হন।






