দেশের বেসরকারি খাতের ব্যাংক পূবালী ব্যাংক আমানতের প্রথমবারের মতো এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। দেশের বেসরকারি খাতের দ্বিতীয় ব্যাংক হিসেবে এ মাইলফলক স্পর্শ করে ব্যাংকটি। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে এক লাখ কোটি টাকার আমানতের ক্লাবে পঞ্চম ব্যাংক হিসেবে নামও লিখিয়েছে পূবালী ব্যাংক। বর্তমানে লাখ কোটি টাকার আমানতের ক্লাবে রয়েছে সোনালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংক।
গত সপ্তাহ শেষে পূবালী ব্যাংকের মোট আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮০০ কোটি টাকায়। এই মাইলফলক ছাড়াও ব্যাংকটি দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম শক্তিশালী ব্যাংক হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের আস্থা ও বিশ্বাস ধরে রাখতে পারার ধারাবাহিক চেষ্টার ফলেই এ অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছে পূবালী ব্যাংক।
১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত পূবালী ব্যাংক সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল সেবার পরিধিও বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও করপোরেট সুশাসনের মাধ্যমে নিজেদের ভিত্তি শক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ইতিবাচক প্রভাব হিসেবে ব্যাংকটির প্রতি গ্রাহকের আস্থা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশের ব্যাংক খাতে এক লাখ কোটি টাকার আমানত দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ২০১৬ সালে রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক প্রথমবারের মতো এ মাইলফলক অতিক্রম করে। এরপর ২০২০ সালের জুনে বেসরকারি খাতের প্রথম ব্যাংক হিসেবে এই ক্লাবে যোগ দেয় ইসলামী ব্যাংক। ২০২১ সালে তালিকায় যুক্ত হয় রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক। সবশেষে গত সপ্তাহে পূবালী ব্যাংকের আমানতও এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এর মাধ্যমে সরকারি–বেসরকারি মিলিয়ে দেশের পঞ্চম ব্যাংক হিসেবে এই মাইলফলক স্পর্শ করে ব্যাংকটি। বর্তমানে এক লাখ কোটি টাকার আমানতের ক্লাবে থাকা পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে তিনটি রাষ্ট্রমালিকানাধীন এবং দুটি বেসরকারি খাতের। এর মধ্যে গত ৩১ মে ইসলামী ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। আর ২০২৫ সাল শেষে সোনালী ব্যাংকের আমানত ছিল ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ১ লাখ ১৩ হাজার ৬৪ কোটি টাকা এবং জনতা ব্যাংকের ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা।
সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সাল শেষে পূবালী ব্যাংকের আমানতের স্থিতি ছিল ৫১ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে তা এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ, ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর ২০২২ সাল পর্যন্ত ৬৩ বছরে যত আমানত সংগ্রহ হয়েছিল, প্রায় সমপরিমাণ নতুন আমানত এসেছে গত সাড়ে তিন বছরে। গত বৃহস্পতিবার ব্যাংকটির মোট আমানত দাঁড়ায় ১ লাখ ৮০০ কোটি টাকা। গত বছরের শেষে এই পরিমাণ ছিল ৮৯ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা।
পূবালী ব্যাংকের বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোর পথটি সহজ ছিল না। বাঙালি মুসলিম উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে ১৯৫৯ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ‘ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক’ নামে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর ব্যাংকটিকে জাতীয়করণ করা হয় এবং নতুন নাম দেওয়া হয় পূবালী ব্যাংক।
জাতীয়করণের পরবর্তী সময়ে ঋণ অনিয়ম ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৮৪ সালের মধ্যে বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৫৪ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকটিকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সরকার আবার সেটিকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়। ১৯৮৪ সালে মাত্র ১৬ কোটি টাকার বিনিময়ে পূবালী ব্যাংকের শেয়ার বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হয়। ফলে স্বাধীনতার আগে ব্যাংকটির সঙ্গে যুক্ত অনেক উদ্যোক্তা বা তাঁদের উত্তরসূরিরা আবারও মালিকানায় ফিরে আসেন।
বেসরকারি খাতে ফিরে আসার পর ব্যাংকটির পরিচালনায় ব্যাপক সংস্কার আনা হয়। প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, মানবসম্পদের কার্যকর ব্যবহার এবং করপোরেট সুশাসনের ওপর জোর দিয়ে নতুনভাবে কার্যক্রম সাজানো হয়। সেই ধারাবাহিক সংস্কারের ফলেই ধীরে ধীরে সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় পূবালী ব্যাংক—যা লাখ কোটি টাকার আমানতের মাইলফলকে পৌঁছানোর ভিত্তি তৈরি করেছে।
আমানতের মাইলফলকের পাশাপাশি অন্যান্য আর্থিক সূচকেও ব্যাংকটির অবস্থান শক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গত বছরের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৭১ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। বর্তমানে সেই ঋণের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ঋণের মানের দিক থেকেও ব্যাংকটি তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাতে যেখানে খেলাপি ঋণের গড় হার প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানে পূবালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার মাত্র ২ দশমিক ২০ শতাংশ।
দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যেও ব্যাংকটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। গত বছর পূবালী ব্যাংকের মাধ্যমে ৩৮ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকার রপ্তানি এবং ৪৭ হাজার ৩১৪ কোটি টাকার আমদানি বাণিজ্য সম্পন্ন হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংকটির মাধ্যমে দেশে এসেছে ১১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকার প্রবাসী আয়। এসব কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় গত বছর ব্যাংকটি ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা প্রকৃত বা নিট মুনাফা করেছে।
ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি গ্রাহকসেবার নেটওয়ার্কও বিস্তৃত করেছে ব্যাংকটি। বর্তমানে দেশজুড়ে পূবালী ব্যাংকের রয়েছে ৫১৯টি শাখা, ২৯০টি উপশাখা এবং ১ হাজারের বেশি এটিএম ও সিআরএম বুথ।
শাখাভিত্তিক সেবার পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যাংকিংয়েও কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে পূবালী ব্যাংক। ব্যাংকটির নিজস্ব অ্যাপ ‘পাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম’-এর সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৬ লাখ। নগদ টাকাবিহীন লেনদেন সম্প্রসারণে দেশজুড়ে ২৫ হাজারের বেশি মার্চেন্ট পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) টার্মিনাল এবং প্রায় দেড় লাখ ‘বাংলা কিউআর’ কোড স্থাপন করেছে ব্যাংকটি। ডিজিটাল অনবোর্ডিং সুবিধার কারণে গ্রাহকেরা এখন ঘরে বসেই কয়েক মিনিটের মধ্যে হিসাব খুলে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। ভৌত শাখার পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও সেবা সম্প্রসারণকে ব্যাংকটির সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতে, আমানতে এক লাখ কোটি টাকার মাইলফলক পূবালী ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন। দেশের চলমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও শক্ত গ্রাহকভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই এ অর্জন সম্ভব হয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন। এই সাফল্যের পেছনে চারটি বিষয় সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে—সম্পদের গুণগত মান, নিরাপদ ও সুরক্ষিত ঋণ পোর্টফোলিও, করপোরেট সুশাসন এবং টেকসই উন্নয়ন ও ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি।
এ বিষয়ে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ আলী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘দেশজুড়ে আমাদের বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক এবং আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রাহকেরা ঘরে বসেই ব্যাংকিং সেবা নিতে পারছেন। এর ফলে আমানতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাজারে গড়ে ওঠা আস্থা ও বিশ্বাসও এই প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’তিনি বলেন, ‘আমরা গ্রাহকদের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবা দিচ্ছি। নতুন প্রজন্ম ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, আর নিরাপদ ও সহজ সেবার কারণে তারা পূবালী ব্যাংকের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন।’






