‘আমার জীবনটাই দুঃখে দুঃখে গেল। কোথায় যাব, কী করব জানি না’—এই কথা বলতে বলতে বারবার চোখ মুছছিলেন রুমানা আক্তার। কিছু মাস আগেও তিনি বিশ্বাস করতেন, বিদেশে থাকা স্বামী ফিরোজ মিয়া ফিরবেন এবং ঋণ শোধ হয়ে সংসারের কষ্ট কিছুটা কমবে। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে স্বামীর মৃত্যুসংবাদের মধ্য দিয়ে। এখন স্বামী নেই, রয়ে গেছে ঋণের বোঝা। এর মধ্যে এক মেয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে আক্রান্ত এবং বড় মেয়ে ফারজানা আক্তার (১৬) দেড় মাস ধরে মানসিকভাবে অসুস্থ। এর সঙ্গে হামের সংক্রমণও রয়েছে। তিন সন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত—এই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে রুমানার।

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড–১৯ হাসপাতালে রুমানা আক্তারের সঙ্গে দেখা যায়। ওয়ার্ডের বাইরে একটি বেঞ্চে বসে কাঁদছিলেন তিনি। বড় মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন রুমানা আক্তার। পাশে আরেকটি বেঞ্চে বসে নীরবে কাঁদছিলেন তাঁর মা শরীফা বেগম (৬৫)।

গতকাল শনিবার আবার ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে দেখা যায় ফারজানা আক্তারকে, যেখানে তিনি একটি বেডে চিকিৎসাধীন। তার পাশে বসে ছিলেন মা রুমানা আক্তার ও নানি শরীফা বেগম। রুমানার ভাষ্য, হামের চিকিৎসায় ফারজানা কিছুটা সুস্থ হলেও মানসিকভাবে এখনো অসুস্থ। হাসপাতাল থেকে বারবার বেরিয়ে যেতে চাইছে—এমন অবস্থায় পরিবারের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এখন তার মানসিক অসুস্থতা।

রুমানা আক্তার জানান, প্রায় দেড় মাস ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছে ফারজানা। মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার বাড়িতে রেখে সামর্থ্য অনুযায়ী চিকিৎসা চলছিল। গত বুধবার ফারজানার মানসিক অবস্থার অবনতি হলে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই হাসপাতালে চিকিৎসকেরা ফারজানার শরীরে হামের উপসর্গ দেখতে পান। এরপর তাকে পাঠানো হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নেওয়া হলে জানানো হয়, প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। পরে তাঁরা ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড–১৯ হাসপাতালে আসেন। তিন দিন চিকিৎসার পর ফারজানার হামের অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও মানসিক অবস্থার তেমন পরিবর্তন হয়নি।

বড় মেয়ের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও রুমানার চিন্তা বারবার ফিরে আসে ছোট মেয়ে ফাহিমা আক্তারের দিকে। তার বয়স ১০ বছর। দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে আক্রান্ত এই শিশুটির জন্য রাজধানীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসা করাতে হয় বলে জানান তিনি। সবচেয়ে ছোট ছেলে আবদুর রহমানের বয়স মাত্র তিন বছর। তাদের দুজনকে বাসায় দাদির কাছে রেখে এসেছেন রুমানা।

রুমানা আক্তার বলেন, মেয়ে ফাহিমার চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে ঋণের বোঝায় পড়েন। দেশের আয়ে সেই ঋণ পরিশোধ সম্ভব হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত আরও ঋণ করে সংসারের ভাগ্য বদলানোর আশায় কাতারে গিয়েছিলেন তাঁর স্বামী মো. ফিরোজ মিয়া। পরিবারের সবাই ভেবেছিলেন, কয়েক বছর কষ্ট করলেই ঋণ শোধ হবে, মেয়ের চিকিৎসাও চলবে। কিন্তু ওই স্বপ্ন বেশি দিন টেকেনি। দেশে যাওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায়, প্রায় ৯ মাস আগে কাতারের একটি কারখানায় কাজ করার সময় মারা যান ফিরোজ মিয়া। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষের মরদেহ দেশে ফিরলেও পরিবারের স্বপ্নগুলো ফেরেনি। যে ঋণ শোধ করতে বিদেশে গিয়েছিলেন, সেই ঋণই এখন পরিবারের কাঁধে রয়ে গেছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রুমানা বলেন, ‘আমি ভাই অনেক দুঃখী। আমার স্বামী নেই। নিজের কোনো ভাই নেই। স্বামীরও কোনো ভাই নেই। বাবাও নেই। আমাদের দেখার মতো কেউ নেই। অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। বিধবা ভাতার জন্য গিয়েছিলাম, সেখানেও আমার নাম নেয়নি।’ তিনি জানান, কাতারের যে কারখানায় তাঁর স্বামী কাজ করতেন, সেখান থেকেও কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা পাননি। ফলে বিদেশে যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণ এখনো শোধ করতে পারেননি। পাওনাদারদের চাপ যেমন রয়েছে, তেমনি দুই মেয়ের চিকিৎসার খরচও থেমে নেই।

রুমানা বলেন, ‘আমার শ্বশুরের কোনো জায়গাজমি ছিল না। শাশুড়ি তাঁর বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া জায়গায় ঘর করে থাকতেন। এখন আমরাও সেখানেই থাকি। জায়গাজমি থাকলে হয়তো বিক্রি করে ঋণ শোধ করতে পারতাম। এখন সেই সুযোগও নেই।’ কথা বলতে বলতে তাঁর চোখ আবার ভিজে ওঠে। কিছুক্ষণ পর উঠে মেয়ের শয্যার পাশে গিয়ে বসেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। তারপর চুপচাপ তাকিয়ে থাকেন মেয়ের মুখের দিকে।

একদিকে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে ক্যানসারে আক্রান্ত এক মেয়ের চিকিৎসা, মানসিকভাবে অসুস্থ বড় মেয়ের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং ছোট শিশুকে নিয়ে সংসার—সব মিলিয়ে প্রতিটি দিনই এখন নতুন এক সংগ্রাম রুমানা আক্তারের জন্য। সামন্য সেলাইয়ের কাজ করে কোনোমতে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি।