শিল্পের ইতিহাসে শরীর কেবল জৈবিক উপস্থিতির সীমাবদ্ধতা নয়; এটি কখনো স্মৃতির ধারক, কখনো মানসিক ক্ষতের চিহ্ন, আবার কখনো সামাজিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। বুবলী বর্ণার সাম্প্রতিক শিল্পচর্চায় এই দীর্ঘ আলোচনার সূত্র থাকলেও, তাঁর অনুসন্ধানের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা—মাতৃত্বের ফলে শরীরের পরিবর্তন, পরিচয়ের রূপান্তর এবং অদৃশ্য শ্রমের প্রশ্ন।
প্রথম দর্শনে বুবলী বর্ণার ব্যবহৃত কাপড়, সেলাই, নরম ভাস্কর্য (সফট স্কাল্পচার) এবং খণ্ডিত শরীরের (ফ্র্যাগমেন্টেড বডি) প্রয়োগ সমসাময়িক শিল্প-ইতিহাসের পরিচিত কিছু ধারার কথা মনে করিয়ে দেয়। লুইজ বুর্জোয়ার কাপড়নির্ভর শরীর, ইভা হেসের নরম ও অনিশ্চিত বস্তুভাবনা, জুডি শিকাগোর নারীর অভিজ্ঞতাকে শিল্পের কেন্দ্রে আনার প্রচেষ্টা এবং মিয়ারলে লেডারম্যান ইউকেলেসের অদৃশ্য শ্রম নিয়ে চিন্তার সঙ্গে তাঁর কাজের এক ধরনের সংলাপ পরিলক্ষিত হয়।
তবে এই সম্পর্ক অস্বীকার করার সুযোগ নেই; বরং এখান থেকেই বুবলী বর্ণার কাজকে বিচার করা প্রয়োজন। সমসাময়িক শিল্পে মৌলিকতা কেবল নতুন দৃশ্যভাষা আবিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি প্রতিষ্ঠিত ভাষাকে নতুন অভিজ্ঞতা, সামাজিক বাস্তবতা ও নতুন প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে স্থাপন করার মধ্যেই তা তৈরি হয়।
লুইজ বুর্জোয়ার কাছে কাপড়ের শরীর ছিল স্মৃতি, শৈশব, ভয় ও মানসিক আঘাতের (ট্রমা) ক্ষেত্র, যেখানে সেলাই ছিল ভাঙা স্মৃতি পুনর্গঠনের প্রতীক। বুবলী বর্ণার কাজেও শরীর খণ্ডিত হয়, সেলাই করা হয় বা অসম্পূর্ণ থাকে, তবে এর উৎস সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর খণ্ডিত শরীর কোনো ধার করা শিল্পরূপ নয়, বরং জন্ম নিয়েছে নিজস্ব অভিজ্ঞতার গর্ভ থেকে। গর্ভধারণের সময় পরিবর্তিত শরীরকে সম্পূর্ণভাবে দেখতে না পাওয়া, সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শরীরের বিভাজন, নতুন প্রাণের জন্ম এবং পুনরায় সেলাই হওয়া শরীর অনুভব করা—এই বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলোই তাঁর দৃশ্যভাষার ভিত্তি।
ফলে বুবলী বর্ণার তৈরি শরীর কেবল আহত শরীর নয়, বরং এটি একটি পরিবর্তিত শরীর। ব্যক্তিগত স্মৃতি বহন করলেও এটি ধীরে ধীরে একটি সামাজিক শরীরে (সোশ্যাল বডি) রূপান্তরিত হয়। শিল্পীর নিজের ভাষায়, তাঁর কাজ শুরু হয়েছিল আবেগময় স্মৃতির শরীর (ইমোশনাল মেমোরি বডি) থেকে; কিন্তু এখন তা এগিয়ে যাচ্ছে সামাজিক শরীরের দিকে। এই পরিবর্তনই তাঁর কাজকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর প্রশ্নে নিয়ে গেছে।
বুবলী বর্ণার কাছে মাতৃত্ব কোনো সরল আবেগ নয়, বরং একটি জটিল নির্মাণ। সমাজ ও ধর্ম মাতৃত্বকে যে পবিত্র ও মহিমান্বিত অবস্থানে স্থাপন করে, সেই কাঠামোর ভেতরেই অনেক সময় মায়ের শরীরের পরিবর্তন, পরিচয়ের সংকট এবং অদৃশ্য শ্রম উপেক্ষিত থাকে। বুবলী এই দ্বন্দ্বের জায়গাতেই কাজ করেন। তিনি মাতৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করেন না, বরং মাতৃত্বকে ঘিরে তৈরি হওয়া রোমান্টিকীকরণকে (রোমান্টিসিজম) প্রশ্ন করেন।
এই প্রেক্ষাপটে বুবলীর সেলাই বিশেষ অর্থ বহন করে। সেলাই তাঁর কাছে কেবল উপকরণ জোড়া দেওয়ার পদ্ধতি নয়, বরং এটি শ্রম ও সময়ের দলিল (রেকর্ড অব লেবার অ্যান্ড টাইম)। প্রতিটি সেলাইয়ে জমা থাকে পুনরাবৃত্তি, ধৈর্য এবং সেই অদৃশ্য কাজের ইতিহাস, যাকে বহু সমাজে নারীর স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রদর্শনীর সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ সম্ভবত তাঁর বিশাল লাল হাতের স্থাপনাগুলো। প্রথম দৃষ্টিতে এগুলো মাতৃত্বের হাত—যা রক্ষা করে, স্পর্শ করে এবং ধরে রাখে। কিন্তু কাছে গেলে দেখা যায়, এই হাতগুলো অস্বাভাবিক বড়, ফুলে ওঠা এবং ভারী। আঙুলগুলো কোমল হলেও সেখানে এক ধরনের চাপের উপস্থিতি রয়েছে। এই হাত একই সঙ্গে যত্ন ও নিয়ন্ত্রণ, আশ্রয় ও প্রত্যাশা এবং ভালোবাসা ও দায়িত্বের ভার বহন করে। এই দ্বৈততার কারণেই কাজগুলো কেবল মাতৃত্বের প্রতীক হয়ে থাকেনি।
আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই হাতগুলো দেয়ালে স্থির বস্তু হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেগুলো দেয়াল ও ঘরের সীমা অতিক্রম করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রবাহিত হয়েছে, স্থাপত্যের সীমানাকেই শরীরের অংশ করে নিয়েছে। এখানে বুবলীর কাজ কেবল ভাস্কর্য নয়, বরং একটি বিস্তৃত শরীর (এক্সপান্ডেড বডি) তৈরি করেছে। দর্শক এখানে কেবল পর্যবেক্ষক নন, বরং সেই শরীরের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং হাতগুলো তাকে ঘিরে ধরে। ফলে মাতৃত্ব একজন ব্যক্তির শরীর থেকে বেরিয়ে একটি পরিবেশ ও সামাজিক অবস্থায় পরিণত হয়।
স্থান ব্যবহারের এই কৌশলেই তিনি লুইজ বুর্জোয়া থেকে দূরত্ব তৈরি করেছেন। বুর্জোয়ার শরীর যেখানে স্মৃতি ও মনস্তত্ত্বের বন্ধ ঘরে ফিরে যায়, বুবলীর শরীর সেখানে বাইরে ছড়িয়ে পড়ে, ঘর দখল করে এবং দর্শকের অবস্থান বদলে দেয়। এখানে শরীর ব্যক্তিগত হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক, সম্পর্কনির্ভর ও স্থানিক।
তবে কাপড়, সেলাই ও খণ্ডিত শরীরের ভাষা আন্তর্জাতিক নারীবাদী শিল্পচর্চায় আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। তাই এই পরিচিত ভাষাকে কতটা অনিবার্য নিজস্ব অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করতে পারেন, সেটিই বুবলী বর্ণার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে তাঁর শক্তির জায়গাটি এখানেই যে, তিনি নতুন উপকরণ আবিষ্কারের বদলে পরিচিত উপকরণকে এমন এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় স্থাপন করেছেন, যেখানে তার অর্থ বদলে যায়।
পশ্চিমা নারীবাদী শিল্পে শরীরের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত স্মৃতির আলোচনার সঙ্গে বুবলী যুক্ত করেছেন দক্ষিণ এশীয় মাতৃত্বের জটিল বাস্তবতা—যেখানে ভালোবাসা ও নিয়ন্ত্রণ, আত্মত্যাগ ও ক্ষমতা এবং যত্ন ও অদৃশ্য শ্রম একই সঙ্গে অবস্থান করে।
বুবলী বর্ণার শিল্প কোনো সহজ উত্তর দেয় না, বরং এক অস্বস্তিকর জায়গা তৈরি করে যেখানে দর্শককে ভাবতে হয়— "যে হাত আমাদের সবচেয়ে বেশি রক্ষা করে, সেই হাতের মধ্যেই কি কখনো অদৃশ্য সামাজিক ভার জমা থাকে না?"
এই প্রশ্নটি তৈরি করার ক্ষমতাই তাঁর শিল্পচর্চার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। তাঁর কাজ এখনো নির্মাণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আর এই প্রক্রিয়ার ভেতরেই দৃশ্যমান হচ্ছে একজন শিল্পীর নিজস্ব ভাষা খুঁজে নেওয়ার গভীর ও প্রয়োজনীয় যাত্রা।
রাজধানীর লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্রে গত ৪ জুলাই থেকে বুবলী বর্ণার একক প্রদর্শনী ‘বিচ্ছিন্ন অস্তিত্বে, অবিচ্ছিন্ন সত্তা ২’ (ফ্র্যাগমেন্টেড ইয়েট ট্যাঙ্গল্ড: লিভিং উইদিন ২) শুরু হয়েছে। প্রদর্শনীটি চলবে ২৫ জুলাই পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকবে এই আয়োজন।






