মহাকাশ স্টেশনের পর এবার পৃথিবীর গভীরে এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের সূচনা হলো। সমুদ্রের রহস্যময় তলদেশে চালু হয়েছে মানুষের তৈরি প্রথম সম্পূর্ণ কার্যকর সাবসি হ্যাবিট্যাট বা পানির নিচের কৃত্রিম বাসস্থান। ল্যাবরেটরি, ডরমিটরি এবং ডাইভিং ভেসেলের সমন্বয়ে গঠিত এই কাঠামোর ভেতরেই এখন দিনের পর দিন কাটিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাবেন মানুষ।
বেসরকারি সমুদ্র প্রকৌশল সংস্থা 'ডিপ' (Deep) তৈরি করেছে এই স্বল্পমেয়াদি পানির নিচের বাসস্থান, যার নাম দেওয়া হয়েছে 'ভ্যানগার্ড'। ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানের হাত ধরেই প্রথমবারের মতো মানুষ সমুদ্রের তলদেশে দীর্ঘ সময় কাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন। তবে ভ্যানগার্ড কেবল শুরু; ২০২৭ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি 'সেন্টিনেল' নামের আরও একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প চালু করার পরিকল্পনা করছে। এর মাধ্যমে সমুদ্রের যেকোনো মহীসোপানে স্বল্পমেয়াদি বা স্থায়ীভাবে মানববসতি স্থাপন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা কিজ ন্যাশনাল মেরিন স্যাঙ্কচুয়ারির টেনেসি রিফের পানির ১৭ মিটার গভীরে একটি স্থায়ী প্ল্যাটফর্মের ওপর ভ্যানগার্ড স্থাপন করা হয়েছে। এখানে একসঙ্গে চারজন ক্রু মেম্বার অবস্থান করতে পারবেন। নাসার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অ্যাকুয়ানট এবং ভ্যানগার্ডের অন্যতম প্রথম ক্রু মেম্বার ডন কার্নাগিস জানান, বিজ্ঞানীদের জন্য পানির নিচে একটানা সময় কাটানো গবেষণার ক্ষেত্রে এক বিশাল আশীর্বাদ।
সাধারণত সমুদ্রের গভীর থেকে কোনো নমুনা বা স্পেসিমেন ওপরে আনলে চাপের দ্রুত পরিবর্তনের কারণে তার আণবিক বা কোষীয় গঠনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে, ফলে বিজ্ঞানীরা এর প্রকৃত অবস্থা নিখুঁতভাবে বুঝতে পারেন না। কিন্তু ভ্যানগার্ডের ভেতরে বসেই বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের তলদেশের চাপ অপরিবর্তিত রেখে রিয়েল-টাইমে সেসব নমুনা পরীক্ষা করতে পারবেন। মূলত একটি বড় ডিকম্প্রেশন চেম্বারের মতো কাজ করা এই স্থাপনাটি ভেতরের বাতাস এবং বায়ুচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। এখানকার বাসিন্দারা স্যাচুরেশন ডাইভার হিসেবে থাকবেন, ফলে প্রথাগত স্কুবা ডাইভিংয়ের ৬০ মিনিটের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে তারা কয়েক সপ্তাহ বা মাসজুড়ে সমুদ্রের তলদেশে থাকতে পারবেন। একটি আম্বিলিক্যাল কর্ড বা বিশেষ পাইপের মাধ্যমে ভ্যানগার্ড থেকে সরাসরি বাতাস নিয়ে তারা বাইরে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে পারবেন।
স্থাপনাটির অন্যতম আকর্ষণ হলো এর 'মুন পুল', যা নিচের দিকে থাকা একটি খোলা দরজা। ভেতরের ও বাইরের বায়ুচাপ সমান রাখা হয় বলে দরজাটি খোলা থাকলেও ভেতরে পানি ঢুকে পড়ে না এবং ডাইভাররা সরাসরি মেঝে থেকেই সাগরে ঝাঁপ দিতে পারেন। একটি আম্বিলিক্যাল কেব্লের মাধ্যমে স্টেশনটি ভূপৃষ্ঠের একটি ভাসমান বয়ার সঙ্গে যুক্ত, যা ক্রুদের জন্য বাতাস, বিদ্যুৎ এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগের ব্যবস্থা করে। ফলে মূল ঘাঁটির সঙ্গে ২৪ ঘণ্টা যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয়। এখানে স্বাদুপানির ট্যাংক রয়েছে এবং বর্জ্য পানি রিসার্কুলেট না করে সরাসরি নিরাপদে অপসারণ করা হয়।
বর্তমানে ভ্যানগার্ড বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সামুদ্রিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারের কাজে ব্যবহৃত হলেও এর পেছনে বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত স্বার্থ রয়েছে। মহাকাশ প্রযুক্তি, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং প্রতিরক্ষা খাতের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলো 'ডিপ'-এর অংশীদার। বিজ্ঞানী ডন কার্নাগিস আরও বলেন, ‘আমরা সাবসি হ্যাবিট্যাট বা সমুদ্রের নিচের বাসস্থানকে সাধারণ মানুষের কাছেও নিয়ে যেতে চাই। ভবিষ্যতে বিজ্ঞানী ছাড়াও শিল্পী, ইতিহাসবিদ, শিক্ষার্থী, শিক্ষাবিদ এমনকি রাজনীতিবিদদেরও এখানে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে তারা সমুদ্রের তলদেশের পরিবেশ ও জীবন সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন।






