আদালতের রায়ে আইনি জট কেটে যাওয়ার পর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এতে দীর্ঘ সময় একই পদে আটকে থাকা সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে স্বস্তি বাড়লেও তাদের সামনে নতুন করে আরেক দফা জট তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও কাজ করছে। জ্যেষ্ঠতার তালিকা নিয়ে আবার কোনো জটিলতা দেখা দেয় কি না—এটাই এখন ভাবাচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রংপুর বিভাগের এক সহকারী শিক্ষক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আদালতের রায়ের পর আমরা নতুন করে আশাবাদী। চাকরিজীবনের দীর্ঘ সময় একই পদে কেটে গেল। এখন আমাদের একটাই চাওয়া—অধিদপ্তর যেন দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে।’
মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের প্রত্যাশা, প্রশাসনিক কোনো ধীরগতি যেন এই প্রক্রিয়াকে আর আটকে না রাখে।
২ জুলাই আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির সব আইনি বাধা দূর হয়। বর্তমানে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩৬ হাজার ২৩৫টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদে পদোন্নতি কার্যক্রম শেষ হলে দীর্ঘদিনের নেতৃত্বসংকটও অনেকটা কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষকদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক না থাকায় অনেক বিদ্যালয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রশাসনিক সমন্বয় ও একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকেরা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করলেও পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে একই অবস্থায় থেকে গেছেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছি। আদালতের রায়ের সার্টিফায়েড কপি দ্রুতই আমাদের হাতে পৌঁছাবে। এরপর গ্রেডেশন তালিকা থেকে শুরু করে বিধি অনুযায়ী পদোন্নতির প্রয়োজনীয় সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।’
২০১৩ সালে বিপুলসংখ্যক বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের পর জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। এর পর থেকেই প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ১২ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার পরও হাজারো সহকারী শিক্ষক বছরের পর বছর একই পদে কর্মরত থাকেন। অনেকেই পদোন্নতি না পেয়ে অবসরেও যান। আবার বহু বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হয়েছে।
বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের পর নিয়োগ বিধিমালা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে আদালতে রিট করেন শিক্ষকরা। ২০১৯ সালে হাইকোর্ট ওই বিধির অংশবিশেষ অবৈধ ঘোষণা করলে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের আপিল মঞ্জুর করায় প্রায় এক যুগের জটের অবসান হয়।
তবে শুধু মামলাই নয়; মাঠপর্যায়ের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের বিভক্তি, পাল্টাপাল্টি অবস্থান এবং অভ্যন্তরীণ মামলাও পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করেছে। নেতাদের বিরোধের সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হয়েছে সাধারণ সহকারী শিক্ষকদের।
ঢাকা অঞ্চলের এক সহকারী শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘নেতাদের বিরোধ আর মামলার বোঝা আমরা সাধারণ শিক্ষকেরাই টেনেছি। পদোন্নতি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের টানাপোড়েনে এতগুলো বছর কেটে গেছে। এখন আদালতের রায়ে সব আইনি বাধা দূর হয়েছে। তাই আমরা চাই, দ্রুত প্রজ্ঞাপন চাই। এর ফলে আমাদের পেশাগত বঞ্চনার অবসানই হবে না, বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোও স্বাভাবিক হবে।’
এদিকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬৫ হাজারের বেশি। নতুন নিয়ম অনুযায়ী ৩৬ হাজার ২৩৫ জন সহকারী শিক্ষক প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি পাবেন। এর ফলে সমসংখ্যক সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য হবে। বর্তমানে বিদ্যমান শূন্য পদের সঙ্গে মিলিয়ে তখন একযোগে ৩৮ হাজার ৪৩৩ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে আরও জানা গেছে, আদালতের রায়ের পর পদোন্নতি কার্যক্রম এগিয়ে নিতে আর কোনো আইনি বাধা নেই। ফলে গ্রেডেশন তালিকা চূড়ান্ত করা, পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি এবং পরবর্তী নিয়োগ—সবকিছুই নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা সম্ভব।






