পশ্চিমবঙ্গের বারুইপুরে এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে নির্যাতনের চরম নৃশংসতা ফুটে উঠেছে। এই জঘন্য অপরাধের ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নির্দেশ দিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মঙ্গলবার তিনি বারুইপুরের দুর্ঘটনাস্থল এবং নিহত শিশুর বাড়ি পরিদর্শন করেন। অন্যদিকে, এই ঘটনার প্রতিবাদে কলকাতায় মিছিল করার অনুমতি পেয়েছেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও বর্তমান বিরোধীদলীয় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার পুলিশ জানিয়েছে, "ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ওই নাবালিকার শরীরে ২৮টির বেশি ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গেছে।"
পুলিশি তথ্যানুযায়ী, ওই শিশুর পাকস্থলীতে পানি পাওয়া গেছে, যা নির্দেশ করে যে পুকুরে ফেলার সময় সে জীবিত ছিল। পানিতে ডুবে যাওয়া এবং মাথার ক্ষত থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঁচড়, কামড়ের দাগ, আঘাতের চিহ্ন এবং মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধার প্রমাণ মিলেছে। তবে ফরেনসিক প্রতিবেদন হাতে এলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার বিকেলে এক বান্ধবীর বাড়ির দিকে যাওয়ার সময় চার যুবক ওই শিশুকে জোরপূর্বক অপহরণ করে। এরপর পুকুরপাড়ের একটি ঝুপড়িতে নিয়ে তাকে ধর্ষণ ও নির্যাতন করা হয়। শিশুটি মৃতপ্রায় হয়ে পড়লে অপরাধীরা তাকে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরার চেষ্টা করে। ব্যাগটি ছিঁড়ে যাওয়ায় তারা তাকে সরাসরি পুকুরে ফেলে দেয়। পরদিন রোববার সকালে পুকুর থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আনন্দ সর্দার, প্রভাস মণ্ডল ও দিবাকর সর্দার নামের তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মঙ্গলবার বারুইপুরে গিয়ে নিহত শিশুর মা-বাবার সঙ্গে কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি তাঁদের আশ্বস্ত করে বলেন, এই জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত কেউ রেহাই পাবে না এবং সবাই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবে। এরপর তিনি বারুইপুরের পুলিশ সুপারের (এসপি) কার্যালয়ে প্রসেনজিৎ নামের আরেক যুবকের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রসেনজিতের মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছিল, শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের পর বিক্ষুব্ধ জনতার গণপিটুনিতে তিনি মারা গেছেন। তবে পুলিশ পরে জানায়, খেলাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিবাদে পাঁচ যুবকের হাতে খুন হয়েছেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, এই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিহত যুবকের পরিবারও পাবে। পাশাপাশি রেললাইনে হামলা এবং পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের সাথে জড়িতরাও রেহাই পাবে না। পুলিশকে সতর্ক করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, কর্তব্যে কোনো ধরনের গাফিলতি বরদাশত করা হবে না। ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালক (ডিজি) সিদ্ধিনাথ গুপ্তকে।
এই নৃশংস ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে উত্তেজনা বিরাজ করছে। মঙ্গলবার সকালে বিজেপি নেত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ও লকেট চট্টোপাধ্যায়সহ ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল নিহত শিশুর বাড়িতে যান। এছাড়া তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিএম এবং আইএসএফ নেতা নওশাদ সিদ্দিকীও পরিবারের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানান। তৃণমূলের পক্ষে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, সায়নী ঘোষ, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য ও শিউলি সাহা ওই বাড়িতে যান।
এদিকে, বুধবার ৮ জুলাই বারুইপুরের ঘটনার প্রতিবাদে কলকাতায় মিছিল করার অনুমতি চেয়ে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেছিল তৃণমূল যুব ও ছাত্র পরিষদ। মঙ্গলবার বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য কিছু শর্ত সাপেক্ষে এই মিছিলের অনুমতি দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, বেলা আড়াইটায় বালিগঞ্জ ফাঁড়ি থেকে শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে চারটায় হাজরা মোড়ে মিছিলটি শেষ হবে। মিছিলটি রাস্তার একপাশ দিয়ে যেতে হবে এবং এতে এক হাজারের বেশি মানুষ অংশ নিতে পারবেন না। এই প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নেবেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।






