সারা বিশ্বের পর্যটক ও ইতিহাসের অনুরাগীদের কাছে ভারতীয় পর্যটন-প্রতীকের নাম তাজমহল। তবে উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ হাইকোর্ট গতকাল সোমবার কেন্দ্রীয় সরকার এবং আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এএসআই)কে নোটিশ দিয়ে উত্তর প্রদেশের আগ্রা আদালতের একটি আদেশ সম্পর্কে তাঁদের মতামত জানতে চেয়েছে।

এই মামলার প্রেক্ষাপট হিসেবে জানা গেছে, আগ্রা আদালত অতীতে তাজমহল জরিপের উদ্দেশ্যে স্থিরচিত্র এবং ভিডিওগ্রাফির জন্য অ্যাডভোকেট-কমিশনার নিয়োগের অনুমতি দেয়নি। অর্থাৎ তাজমহল জরিপ করার আবেদন ২০১৫ সালে একজন আইনজীবী করলেও সেই আবেদন অতীতে খারিজ করে দিয়েছিল আগ্রা আদালত।

সোমবার এলাহাবাদ হাইকোর্ট সেই মামলার শুনানি করে জানতে চায়, তাজমহলের নিচে মন্দিরের অস্তিত্ব খুঁজতে জরিপ করা হবে কেন না। শুনানিতে আবেদনকারীপক্ষের আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈনের বক্তব্য শোনার পর আদালতের বিচারপতি রোহিতরঞ্জন আগরওয়ালের বেঞ্চও জানতে চান, কেন সৌধের জরিপ করা যাবে না। আইনজীবী জৈন বলেন, বিশ্বখ্যাত এই স্মৃতিসৌধটি একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির; যার নাম ‘তেজো মহালয়া’। এটি ভগবান মহাদেবের উদ্দেশে উৎসর্গী করা হয়েছিল।

মামলাটির মূল পক্ষ হিসেবে হিন্দু দেবতা মহাদেবকে যুক্ত করা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে যেভাবে মামলায় পক্ষ করা হয়, সেইভাবেই মহাদেবকে মূল পক্ষ করা হয়েছে বলে বলা হয়েছে। মহাদেবকে মূল পক্ষ করে তাঁর ‘পরম বন্ধু’ আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈন এবং আরও বেশ কয়েকজন ভক্তের মাধ্যমে এই পিটিশন করা হয়েছে।

বিতর্কিত রামমন্দির-বাবরি মসজিদ নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায় আসার পর বছর কয়েক আগে হিন্দুত্ববাদী হরিশঙ্কর জৈনের ছেলে আইনজীবী বিষ্ণুশঙ্কর জৈন এক সাক্ষাৎকারে মুক্তকণ্ঠকে বলেছিলেন, যেসব সৌধের নিচে হিন্দুদের কথিত পবিত্র স্থান রয়েছে, একটি দীর্ঘ তালিকা প্রস্তুত করেছেন তাঁরা। এই তালিকা দীর্ঘ। বিষ্ণুশঙ্কর বলেছিলেন, এসব স্থান বেছে বেছে বের করে মামলা করা হবে। বর্তমানে সেই কাজই করছেন পিতা–পুত্রের এই দল। বিষ্ণুশঙ্কর জৈন এই প্রতিবেদককে জানিয়েছিলেন, তারা হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দু মহাসভার সঙ্গে যুক্ত।

কেন তাজমহলকে হিন্দু মন্দির বলা হচ্ছে

এলাহাবাদ হাইকোর্টে দায়ের হওয়া মামলায় বাদীপক্ষ (আবেদনকারী) একটি ঘোষণামূলক ডিক্রি ও নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়েছে। মূল বক্তব্য হলো—এই স্মৃতিসৌধটি একটি হিন্দু মন্দির। সে কারণে বাদীপক্ষ তথা হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের তাজমহল প্রাঙ্গণের ভেতরে পূজা করার অনুমতি দেওয়া প্রয়োজন বলে তাঁরা দাবি করেছেন। ওই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আদালত সরকার এবং এএসআইকে প্রশ্ন করেছে, বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য কেন জরিপ করা হবে না।

এদিকে, বিতর্কিত রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ ভূমির মালিকানাসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে এলাহাবাদ হাইকোর্টই অন্যতম কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিল। ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের লখনৌ বেঞ্চ ২:১ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রায় দেয়—অযোধ্যার বিবদমান ২ দশমিক ৭৭ একর জমি হিন্দু দেবতা রাম লালা, রক্ষণাবেক্ষণকারী নির্মোহী আখড়া এবং সুন্নি ওয়াক্‌ফ বোর্ডের মধ্যে সমান তিন ভাগে ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে।

তাজমহলের ক্ষেত্রে আবেদনকারীরা দাবি করেছেন, ভারতের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে সৌধের ভেতরে ‘দর্শন’ ও ‘পূজা’ করার মৌলিক অধিকার হিন্দুদের রয়েছে। সে ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে তাজমহলে জরিপ করতে একজন অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগের আবেদন করা হয়। তবে ওই সময় আগ্রার অতিরিক্ত দেওয়ানি বিচারক (সিনিয়র ডিভিশন) ওই আবেদন খারিজ করেন। আদালত যুক্তি দিয়েছিল, বাদীপক্ষ তাজমহলে সুনির্দিষ্ট জায়গা (দাগ নম্বর) নিশ্চিত করার জন্য কোনো রাজস্ব নথি (যেমন খতিয়ান বা খসড়া) দাখিল করতে ব্যর্থ হয়েছে। সম্পত্তির বর্ণিত সীমানা ও আয়তন (৭৭ বিঘা) বিবাদীপক্ষের নথির সঙ্গে মেলেনি।

এই আদেশের বিরুদ্ধে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে একটি রিভিশন পিটিশন (সংশোধনী আবেদন) রক্ষণাবেক্ষণের অযোগ্য বলে গণ্য করেন আগ্রার অতিরিক্ত জেলা জজ। উভয় আদেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বাদীপক্ষ হাইকোর্টে আবেদন করেছে।

আবেদনে বাদীপক্ষ মূল মামলায় করা নিম্নলিখিত সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যসংক্রান্ত দাবিগুলো উল্লেখ করে বলেছে, কথিত প্রাচীন তেজো মহালয় মন্দিরটি (তাজমহল), যেখানে দেবতা আগ্রেশ্বর মহাদেব বিরাজ করছেন, সেটি ১১৫৫-৫৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজা পরমর্দি দেব নির্মাণ করেছিলেন।

ইউনেস্কো তাজমহলকে একটি ‘হেরিটেজ সাইট’ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং বিষয়টি ভারত সরকারের পর্যটনবিষয়ক ওয়েবসাইটে লেখা হয়েছে। ওই ওয়েবসাইটেই বলা হয়েছে, এটি তৈরি করেছিলেন মোগল সম্রাট শাহজাহান, তাঁর পত্নী মমতাজ মহলের স্মৃতিতে। ওয়েবসাইটে মমতাজ মহল ও শাহজাহানের ছবিও (হাতে বা কম্পিউটারে করা পেন্টিং) রয়েছে। ইতিহাসবিদদের বক্তব্য, তাজমহল বানানোর কাজ শুরু হয় ১৬৩১ খ্রিষ্টাব্দে এবং শেষ হয় ১৬৫৩ সালে বা তার আশপাশে। বছর দশেক আগে হিসাব করে দেখা যায়, এই স্মৃতিসৌধটির বাজার মূল্য ৫০ বিলিয়ন বা ৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি। এটি ভারতের মুখ্য পর্যটনকেন্দ্র।

হিন্দুত্ববাদীরা ইতিহাস মানতে নারাজ

আবেদনকারী হিন্দুত্ববাদী আইনজীবীরা অবশ্য এই বক্তব্য মানতে নারাজ। তাঁদের বক্তব্য, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই স্মৃতিসৌধটি রাজা মানসিংহের নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানায় আসে এবং পরবর্তী সময়ে ১৭ শতকে জয়পুরের রাজা জয়সিংহ এই স্থানে অর্থাৎ তাজমহলে অভিষিক্ত হন। এরপর মোগল শাসক শাহজাহান রাজা জয়সিংহের কাছ থেকে কথিত ‘তেজো মহালয়া’ প্রাসাদটি জোরপূর্বক দখল করেন এবং তাঁর মৃত রানির স্মৃতিসৌধে পরিণত করেন। এই রূপান্তরের জন্য বিতর্কিত সৌধটির কিছু অংশ পরিবর্তন করে ইসলামিক বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা হয়েছিল। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা আরও দাবি করেন, অন্তত ১০৯টি প্রত্নতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে যা প্রমাণ করে, এই সম্পত্তিটি একটি হিন্দু মন্দির।

আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, এএসআই ‘বেআইনিভাবে’ মুসলিমদেরকে গত শুক্রবারে তেজো মহালয়া বা তাজমহলে ‘নামাজ’ পড়ার অনুমতি দিয়েছে। এ কারণে দর্শনার্থীদের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং ভবন চত্বরের বেশ কয়েকটি তলা তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে। বাদীপক্ষের দাবি, হিন্দু ‘পূজা’ ও দেবতার আরাধনা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এই সম্পত্তির ব্যবহার বেআইনি।

আবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিতর্কিত সম্পত্তির পরিচয় নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। আবেদনকারীদের মতে, এটি একটি সর্বজনবিদিত প্রাচীন স্মৃতিসৌধ। তাঁরা যুক্তি দেন, সৌধটির শারীরিক বৈশিষ্ট্য, কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য এবং তালাবদ্ধ অংশগুলো ‘কেবল মৌখিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে কার্যকরভাবে প্রমাণ করা সম্ভব নয়’।

বাদীপক্ষের দাবি, এএসআই-নিয়ন্ত্রিত এই সৌধটিতে তাদের অবাধ প্রবেশের অধিকার নেই। ফলে কার্যকর নিরপেক্ষ সিদ্ধান্তের জন্য আদালতের নিযুক্ত একজন ফটোগ্রাফার ও ভিডিওগ্রাফার নিয়োগ দেওয়া অপরিহার্য। এই প্রেক্ষাপটে আবেদনকারীরা চান, হাইকোর্ট যেন আগ্রা আদালতের আদেশ বাতিল করে এবং ট্রায়াল কোর্টকে গুণাগুণের ভিত্তিতে অ্যাডভোকেট-কমিশনার নিয়োগের আবেদনটি নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেয়।

এ ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন একটি স্থগিতাদেশের আবেদনে বলা হয়েছে, হাইকোর্ট যেন এএসআইয়ের পরিচালককে নির্দেশ দেন—আবেদনকারীদের উপস্থিতিতে ভবনের ভেতর ও বাইরের ছবি তোলা হয় এবং তা বর্তমান বিচারিক প্রক্রিয়ায় দাখিল করা হয়।

আইনজীবীদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তাজমহল নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছিল এবং যা ৬ জুলাই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল, তা একটি নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। একইভাবে ভারতে নতুন এক বিতর্কের সূচনা হয়েছিল তিন দশক আগে বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে, যা ২০১৯ সালে ভারতে রামমন্দির বলে আদালত চিহ্নিত করেছিলেন। তাজমহলের কপালে কী লেখা আছে, তা বোঝা যাবে আর কয়েক বছরের মধ্যেই।