অতীতের ঐতিহাসিক ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি একটি হিংসামুক্ত সমাজ গঠন করতে চাই, তবে জেনোসাইড অধ্যয়নের প্রতিরোধমূলক তত্ত্ব ও আলাপকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহাবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে, সামাজিক মেরুকরণ হ্রাস করতে এবং ভবিষ্যতের যেকোনো বড় ধরনের সহিংসতা এড়াতে বাংলাদেশের জন্যও একটি কার্যকর পথনির্দেশক প্রয়োজন। লিখেছেন উম্মে ওয়ারা।
জেনোসাইড কনভেনশনে উল্লেখিত মানদণ্ডে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত জেনোসাইড উত্তীর্ণ হলেও, জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এখনো মেলেনি। শুধু বাংলাদেশই নয়, আর্মেনিয়া, সুদান বা ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় বড় জেনোসাইডকেও জাতিসংঘ আজ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। বিদ্যায়তনিক জগতে এসব ঘটনার স্বীকৃতি থাকলেও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদেশগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ও বৈশ্বিক রাজনীতির প্রভাবে এই স্বীকৃতি অধরা রয়ে যায়।
তবে আইনি ও রাজনৈতিক স্বীকৃতির লড়াইর পাশাপাশি বৈশ্বিক বিদ্যায়তনিক পরিমণ্ডলে এখন জেনোসাইড প্রতিরোধের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত সমাজবিজ্ঞানী হেলেন ফেইনের ‘অ্যাকাউন্টিং ফর জেনোসাইড’ এবং ১৯৮১ সালে প্রকাশিত লিও কুপারের ‘জেনোসাইড: ইটস পলিটিক্যাল ইউজ ইন দ্য টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি’ বই দুটো এই ক্ষেত্রটিকে একটি স্বতন্ত্র ডিসিপ্লিন হিসেবে স্বীকৃতি পেতে সহায়তা করে। বর্তমান বিদ্যায়তনিক জগৎ জেনোসাইড প্রতিরোধের আলোচনা শুধু ‘বিচার’ বা ‘শাস্তি’র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না; বরং জেনোসাইডের পূর্বাভাস কীভাবে পাওয়া যায় এবং প্রাথমিক পর্যায়েই তা কীভাবে রোধ করা যায়, সে বিষয়ে বেশি মনোযোগী হচ্ছে।
এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে আট বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কানেটিকাটে ‘শায়িট ফ্যামিলি সেমিনার অন জেনোসাইড স্টাডিজ অ্যান্ড প্রিভেনশন’ শিরোনামে সপ্তাহব্যাপী এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এ বছরের জুনে আমার সেই সেমিনারে যোগ দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। পুরো সপ্তাহে অন্যান্য অধ্যাপকের বিভিন্ন সেশনের পাশাপাশি সেমিনারের পরিচালক ড. জেমস ওয়ালার জেনোসাইড প্রতিরোধের বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর এই আলোচনা ‘কনফ্রন্টিং এভিল: এনগেজিং আওয়ার রেসপনসিবিলিটি টু প্রিভেন্ট জেনোসাইড’ শীর্ষক গ্রন্থেও তিনি বিস্তারিতভাবে করেছেন।
জেমস ওয়ালার তার বইয়ে জেনোসাইড প্রতিরোধমূলক এই বৈশ্বিক তত্ত্ব ও কাঠামোকে মূলত তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। এগুলো হচ্ছে: জেনোসাইড সংঘটনের পূর্ববর্তী প্রাথমিক প্রতিরোধ, জেনোসাইড চলাকালীন মধ্যবর্তী প্রতিরোধ এবং জেনোসাইড-পরবর্তী চূড়ান্ত বা টারশিয়ারি প্রতিরোধ। তাঁর এই আলোচনা আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক হতে পারে, কেননা ১৯৭১ সালের জেনোসাইড এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সহিংসতার ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রতিরোধকৌশল দেখা যায়নি। অন্যদিকে সহিংসতা-উত্তর সমাজে শান্তি ও সহাবস্থান নিশ্চিত করতেও আমরা আদৌ সফল হয়েছি কি না, তা নিয়েও আমাদের রাষ্ট্রীয় ও নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে গভীর জিজ্ঞাসার অভাব রয়েছে।
জেমস ওয়ালারের মডেলের প্রথম কাঠামো হচ্ছে ‘প্রাথমিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ’। অর্থাৎ কোনো একটি সমাজে জেনোসাইড যাতে কখনোই না ঘটে, তার আগাম সতর্কতামূলক সংকেত দেখে ব্যবস্থা নেওয়া। দ্বিতীয় কাঠামোটি হলো ‘মধ্যবর্তী পর্যায়ের প্রতিরোধ’, জেনোসাইড শুরু হয়ে গেলে, তাৎক্ষণিক ও সরাসরি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে নৃশংসতা ও ক্ষতির পরিমাণ প্রতিরোধ করা। তৃতীয় কাঠামোটি হলো ‘পরবর্তী পর্যায়ের প্রতিরোধ’, সহিংসতা-পরবর্তী সমাজ পুনর্গঠনের মাধ্যমে ধ্বংসাবশেষ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা বা সহনশীলতা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা করা যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা থেকে সমাজটিকে রক্ষা করা যায়।
“বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে মূলত বিচারপ্রক্রিয়ার ওপরই জোর দিতে দেখা গেছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের প্রাথমিক আলোচনার কথা শোনা গেলেও পরে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি লক্ষ করা যায়নি।”
একটু বিশদে তিনটি ধাপই উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। প্রথম কাঠামো, অর্থাৎ ‘প্রাথমিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ’-এর ক্ষেত্রে বলা যায়, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর যে তালিকা প্রতিবছর প্রকাশ করে, তার মূল সূচকগুলো মূলত গভীরভাবে বিভক্ত সমাজের বৈশিষ্ট্যকেই ইঙ্গিত করে। একটি গভীরভাবে বিভক্ত সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো দ্বিমুখী মেরুকরণ। শ্রেণি, ধর্ম, ভাষা বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে যখন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এমন দুটি বিপরীতমুখী অংশ তৈরি হয়, যাদের মধ্যকার বিভেদ অত্যন্ত গভীর, তখন সমাজে পারস্পরিক আস্থা ও সংলাপের সুযোগ কমে যায়। ক্ষমতার অধিকারী পক্ষগুলো তখন নিজেদের দলীয় স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে এই বিভাজনকে আরও তীব্র করে তোলে। বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এমন বিভাজিত সমাজের চিত্র লক্ষ করা যায়, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অসহিষ্ণুতা ও সাংঘর্ষিক মনোভাব ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে কোনো সমাজে জেনোসাইড সংঘটনে বিভাজিত সমাজের আলোচনা কেন প্রাসঙ্গিক? কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আদ্রিয়ান গেলকের ব্যাখ্যা এ প্রসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। তিনি বলেছেন, যে সমাজ চরমভাবে বিভাজিত, সেখানে এমন এক সুপ্রতিষ্ঠিত বিভাজনরেখা কার্যকর থাকে যা দীর্ঘস্থায়ী ও অব্যাহতভাবে চলতে থাকে এবং যার ফলে সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সহিংসতার আশঙ্কা বজায় থাকে।
তবে আগাম সতর্কবার্তা পেলেও অনেক সময় রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক রাজনীতির কারণে সহিংসতা প্রতিরোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের হলোকাস্ট জাদুঘরের ঝুঁকি মূল্যায়নের তালিকায় টানা তিন বছর মিয়ানমার শীর্ষে অবস্থান করা সত্ত্বেও ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা জেনোসাইড ঠেকানো যায়নি। এমনকি জেনোসাইডের প্রায় এক দশক পরও ভারত বা চীনের মতো শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কার্যকর কোনো ভূমিকা মিলছে না। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সদিচ্ছা ছাড়া শুধু পূর্বাভাস দিয়ে জেনোসাইড থামানো কঠিন।
যখন প্রাথমিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়, তখন আসে দ্বিতীয় ধাপ বা ‘মধ্যবর্তী পর্যায়ের প্রতিরোধ’: জেনোসাইড বা সহিংসতা শুরু হয়ে গেলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের মাধ্যমে নৃশংসতা ও ক্ষতির পরিমাণ কমানো। এটি দুইভাবে হতে পারে—সহযোগিতামূলক আলোচনা (যেমন ১৯৯৫ সালের বসনিয়ার ডেয়টন শান্তিচুক্তি, যা আলোচনার মাধ্যমে জেনোসাইডের অবসান ঘটিয়েছিল) অথবা শাস্তিমূলক অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ। তবে এই মধ্যবর্তী পদক্ষেপগুলোও প্রায়শই পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কৌশলের অংশ হয়ে থাকে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে জেনোসাইড চলাকালে পাকিস্তান সরকারের ওপর যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা সৌদি আরবের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর কোনো চাপ সৃষ্টি না করা ছিল তাদের নিজস্ব কূটনীতিরই বহিঃপ্রকাশ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হলো তৃতীয় ধাপ। সহিংসতা শেষ হয়ে যাওয়ার পর সমাজে শান্তি, সহাবস্থান ও ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া সামাজিক সম্পর্ক মেরামত করার প্রচেষ্টা করা, যাতে ভবিষ্যতে এই প্রাণঘাতী চক্রের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। (যেমন দারফুরে সংঘটিত জাতিগত সহিংসতার প্রতিক্রিয়ায়, জাতিসংঘ ২০০৪ সালে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ও নির্দিষ্ট নেতাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার পদক্ষেপ নেয়) ওয়ালারের মতে, বিচার, সত্য উন্মোচন এবং স্মৃতি সংরক্ষণ হলো এই চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রতিরোধের মূল ভিত্তি।
এই ক্রান্তিকালীন সময়ে বিভিন্ন দেশ নিজস্ব ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে নানা পদ্ধতি অবলম্বন করে। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ কিংবা রুয়ান্ডার গ্রামভিত্তিক প্রথাগত বিরোধ নিষ্পত্তিমূলক ব্যবস্থা ‘গাচাচা ট্রায়াল’-এর উল্লেখ করা যায়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে মূলত বিচারপ্রক্রিয়ার ওপরই জোর দিতে দেখা গেছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের প্রাথমিক আলোচনার কথা শোনা গেলেও পরে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি লক্ষ করা যায়নি। তবে বাংলাদেশের চরমভাবে মেরুকৃত ও বিভাজিত রাজনৈতিক সমাজে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও সহাবস্থান পুনরুদ্ধারে এই পুনঃসমঝোতা বা রিকনসিলিয়েশনের কোনো বিকল্প নেই।
মূল বিষয় হলো, প্রাথমিক প্রতিরোধ কৌশলগুলো যখন ব্যর্থ হয় এবং মাধ্যমিক কৌশলগুলোও জেনোসাইডাল অপরাধ থামাতে অকার্যকর প্রমাণিত হয়, তখন দিন শেষে কেবল ছিন্নভিন্ন এক সমাজই অবশিষ্ট থাকে। সহিংসতার এই প্রাণঘাতী চক্রের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে তখন সমাজের আমূল রূপান্তর প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের জেনোসাইড এবং পরবর্তী বিভিন্ন সময়ের ব্যাপক সহিংসতার পর, বিভাজিত সমাজে দীর্ঘমেয়াদি ঐক্য ও সহাবস্থান প্রতিষ্ঠার এমন সমন্বিত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টা দুর্ভাগ্যবশত দেখা যায়নি। যদিও এ ধরনের চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রতিরোধের মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়, তবু এই প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহায়তারও অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজন রয়েছে। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সদিচ্ছা ছাড়া শুধু পূর্বাভাস দিয়ে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত জেনোসাইড থামানো কঠিন।
অতীতের ঐতিহাসিক ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি একটি হিংসামুক্ত সমাজ গঠন করতে চাই, তবে জেনোসাইড অধ্যয়নের এই প্রতিরোধমূলক তত্ত্ব ও আলাপকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহাবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে, সামাজিক মেরুকরণ হ্রাস করতে এবং ভবিষ্যতের যেকোনো বড় ধরনের সহিংসতা এড়াতে জেমস ওয়ালারের এই ত্রিমাত্রিক প্রতিরোধ মডেলটি বাংলাদেশের জন্যও একটি কার্যকর পথনির্দেশক হতে পারে।






