সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্ষা মৌসুম এলেই চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা প্রকট হয়ে ওঠে, যা বর্তমানে অন্যতম প্রধান নাগরিক দুর্ভোগ ও জনঅসন্তোষের কারণ। অতীতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) বারবার নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো গুণগত পরিবর্তন হয়নি। মূলত নগর উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত এই দুই সংস্থার মধ্যকার বিরোধ, সমন্বয়হীনতা এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থে নেওয়া অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্পের কারণেই এই অচলাবস্থা। এর ফলে প্রকল্পগুলোর সময় ও ব্যয় বারবার বাড়লেও সাধারণ মানুষ সুফলের বদলে কেবল ভোগান্তিই পেয়েছে।
সিডিএ কর্তৃক গৃহীত ‘খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি অপরিকল্পিত পরিকল্পনার একটি বড় উদাহরণ। ২০১৭ সালে যখন প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়, তখন এর প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা এবং ২০২০ সালের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে বাস্তবতা হলো, ৯ বছর পার হলেও কাজ শেষ হয়নি। এখন প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়িয়ে ১১ বছর করা হচ্ছে এবং ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৮ হাজার ৫৯২ কোটি টাকায়।
উদ্বেগের বিষয় হলো, জলাবদ্ধতা নিরসনের মতো একটি কারিগরি ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল অত্যন্ত তাড়াহুড়া করে। যথাযথ সমীক্ষা না থাকায় কাজ শুরু করতেই প্রায় দুই বছর সময় নষ্ট হয় এবং পরবর্তীতে একের পর এক জটিলতা দৃশ্যমান হতে থাকে। প্রশ্ন উঠেছে, জলাবদ্ধতা নিরসনে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও কেন সিডিএকে এই দায়িত্ব দেওয়া হলো। এ ধরনের খামখেয়ালিপনা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নেওয়া প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।
কেবল এই একটি প্রকল্পই নয়, সিডিএ, সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আরও বেশ কিছু প্রকল্প চলমান রয়েছে। গত ৮-১০ বছরে এসব খাতে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও গত ২৮ এপ্রিলের ভয়াবহ জলাবদ্ধতা প্রমাণ করেছে যে, বিপুল অর্থ ব্যয়েও সমস্যার সমাধান হয়নি। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না; ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা, খাল দখল ও দূষণ রোধ, জলাধার সংরক্ষণ এবং সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।
চট্টগ্রামের এই পরিস্থিতি থেকে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। যথাযথ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া প্রকল্পগুলো শেষ পর্যন্ত জনগণের কোনো কাজে আসে না। নাগরিকদের দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পগুলোকে একই ছাতার নিচে এনে সমন্বয় করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে বাস্তবায়িত কাজের ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, নগরবাসী আর কোনো আশ্বাস নয়, বরং জলাবদ্ধতার একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধান চায়।






