রাজধানীর বাসাবো বালুর মাঠে গেলে এখন উন্নয়নকাজের চিহ্ন দেখা যায়। মাঠটি ব্যবহার উপযোগী হলে আশপাশের শিশু-কিশোর-তরুণেরা খেলাধুলার সুযোগ পাবে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা হাঁটা, বসা বা খোলা জায়গায় সময় কাটাতে পারবেন।

কাজটি ‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট’ নামের প্রকল্পের আওতায়। মূল প্রকল্পের অধীনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অন্যান্য এলাকায় নানা কাজ হওয়ার কথা থাকলেও সব কাজ এখনো শেষ হয়নি। পাশাপাশি দুটি বড় কাজ প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়ার কথাও সংশ্লিষ্টরা বলেছেন।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, দুর্বল প্রস্তুতি, ভুল নকশা, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং বারবার সিদ্ধান্ত বদলের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সাত বছরের বেশি সময়েও প্রকল্পটি শেষ করা যায়নি।

নগরবাসীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, প্রবেশাধিকার ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি, পথচারী চলাচল ও গণপরিবহনসুবিধা উন্নয়ন এবং পরিবেশগত উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১৯ সালের মার্চে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। বাস্তবায়নকারী সংস্থা ডিএসসিসি। সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রকল্পের মূল প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৮৮০ কোটি টাকা। পরে সংশোধিত প্রাক্কলিত ব্যয় দাঁড়ায় ৫০৪ কোটি টাকা।

প্রকল্পের আওতায় শুরুতে কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, সূত্রাপুর ও খিলগাঁও এলাকায় ২০টি পার্ক, ৩টি খেলার মাঠ, বুড়িগঙ্গা নদীর সাড়ে ৪ কিলোমিটার তীর, ৩৯ কিলোমিটার নর্দমা, ৪ কিলোমিটার সরু রাস্তা উন্নয়ন, ৯টি বর্জ্য স্থানান্তরকেন্দ্র ও ৮টি গণশৌচাগার নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। এছাড়া কামরাঙ্গীরচরে লোহারপুল পুনর্নির্মাণ এবং শাহজাহানপুর ঝিল দৃষ্টিনন্দন করার কথাও ছিল। এই দুটি কাজে ২৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল।

প্রকল্প সূত্র বলছে, প্রথমে প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের জুন। এরপর মোট তিন দফা মেয়াদ বাড়ানো হয় এবং প্রকল্পের সবশেষ বর্ধিত মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বর। গত জুন পর্যন্ত মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৩৫৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট জনবল, পরামর্শক, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সহায়ক খাতে ব্যয় হয়েছে ৬৮ কোটি টাকা।

ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত কয়েকটি কমিউনিটি সেন্টারের উন্নয়নকাজ হয়েছে। চারটি বর্জ্য স্থানান্তরকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। দুটি খেলার মাঠের উন্নয়নকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কিছু সড়ক ও নর্দমার কাজও সম্পন্ন হয়েছে। পুরান ঢাকার সদরঘাট এলাকার ঐতিহাসিক স্থাপনা লালকুঠি সংস্কার করা হয়েছে। বর্তমানে বাসাবো বালুর মাঠ, লালকুঠি হেরিটেজ ভবন, ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চ এবং আটটি কমিউনিটি সেন্টারের উন্নয়ন-নির্মাণকাজ চলমান।

সূত্র আরও বলছে, প্রকল্পের দ্বিতীয় দফার বর্ধিত মেয়াদ ছিল ২০২৬ সালের ৩১ মে। মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়ার পর বিশ্বব্যাংক নতুন করে সময় বাড়াতে আগ্রহী নয়। ফলে মূল প্রকল্পের অর্থ আর চলমান কাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

ডিএসসিসি সূত্র জানায়, চলমান কাজের বিল পরিশোধ করা হবে সরকারের তহবিল এবং বিশ্বব্যাংকের আরেকটি প্রকল্প থেকে। প্রকল্পটির নাম রেজিলিয়েন্ট আরবান অ্যান্ড টেরিটোরিয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (আরইউটিডিপি)। এটি বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে নেওয়া জলবায়ু-সহনশীল ও টেকসই নগর উন্নয়ন প্রকল্প।

‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট’ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি শুরুই হয়েছিল দুর্বল প্রস্তুতি নিয়ে। পূর্ণাঙ্গ কারিগরি সমীক্ষা বা বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই অনেক কাজের প্রস্তাব করা হয়েছিল। অনুমোদনের পর মাঠপর্যায়ে গিয়ে নকশা ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ফারাক ধরা পড়ে। কোথাও জমি নিয়ে জটিলতা, কোথাও ব্যবহারকারীর প্রয়োজনের সঙ্গে পরিকল্পনার মিল না থাকা এবং কোথাও কাজের ধরন বদলাতে হওয়ার ঘটনা ছিল। এসব ভুল সংশোধন করে নতুন নকশা চূড়ান্ত করতে দীর্ঘ সময় লাগে। সার্বিকভাবে অদক্ষতার কারণে একাধিকবার সময় বাড়িয়েও প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি।

শুরুতে প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন মো. সিরাজুল ইসলাম। তিনি বর্তমানে ডিএসসিসির প্রধান নগর–পরিকল্পনাবিদের অতিরিক্ত দায়িত্বে আছেন। ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রকল্প পরিচালকের ক্রয়প্রক্রিয়া, মাঠপর্যায়ের কাজ, ঠিকাদার ব্যবস্থাপনা, নকশা যাচাই ও সময়সীমা মেনে কাজ শেষ করার অভিজ্ঞতা থাকা জরুরি। তবে শুরুতে দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তার এ ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। ফলে প্রকল্পের জটিলতা বুঝতেই সময় লেগেছে।

এ বিষয়ে সিরাজুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, করোনা মহামারির কারণে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হতে দেরি হয়েছিল। তিনি যখন দায়িত্ব ছাড়েন, তখন প্রকল্পের কাজ সন্তোষজনক অবস্থায় ছিল। বাকি কাজ দুই বছরের মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কেন হয়নি, তা তিনি জানেন না।

তবে বিশ্বব্যাংকের নথিতে প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরির কারণ হিসেবে শুধু করোনা নয়, ডিএসসিসির নানা দুর্বলতার কথাও বলা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের এক নথিতে বলা হয়, প্রকল্প অনুমোদনের প্রায় ৫ বছর পর ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ঋণের মাত্র ১৯ দশমিক ৯১ শতাংশ ছাড় হয়েছিল। ক্রয়প্রক্রিয়া, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, মান নিয়ন্ত্রণ, কাজের তদারকি ও বাস্তবায়নের প্রস্তুতিতে ডিএসসিসির পদ্ধতিগত দুর্বলতার কারণে প্রকল্পটি বারবার দেরির মুখে পড়ে। তখন প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা ও বাস্তবায়ন অগ্রগতি ‘অসন্তোষজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশ্বব্যাংক।

২০২৫ সালের এপ্রিলে বিশ্বব্যাংকের আরেক নথিতে প্রকল্পের ক্রয়প্রক্রিয়া ও আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে ‘মধ্যম মাত্রায় অসন্তোষজনক’ বলা হয়। একই নথিতে উল্লেখ করা হয়, কামরাঙ্গীরচরের লোহারপুল ও শাহজাহানপুর ঝিল—এই দুটি বড় কাজের ঠিকাদার নিয়োগই শুরু হয়নি। ফলে যুক্তিসংগত সময় বাড়িয়েও কাজ দুটি শেষ করা সম্ভব নয়। এ কারণে প্রকল্প থেকে কাজ দুটি বাদ দেওয়া হয়।

বর্তমান প্রকল্প পরিচালক রাজীব খাদেম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই মাস আগে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকল্পের ব্যয় কমিয়ে আনা হয়েছিল। চলমান কাজগুলো শেষ করতে তাঁরা যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছিলেন। পরে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। এ পর্যন্ত প্রকল্পের ৮৩ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে দাবি তাঁর।

নগর–পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, এ ধরনের প্রকল্প ব্যর্থ হলে তার মাশুল শেষ পর্যন্ত জনগণই দেয়। কারণ, প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণের দায় রাষ্ট্রের, তথা জনগণের। প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হলেও প্রস্তুতি, পরামর্শ, বেতন-ভাতা, দাপ্তরিক ব্যয় ও আংশিক কাজের খরচ চলে যায়। আবার অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে নতুন প্রকল্প বা সরকারি তহবিল থেকে অর্থ দিতে হয়। এতে একই কাজের জন্য জনগণের অর্থ একাধিকবার ব্যয় হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সঠিক সমীক্ষা ছাড়া অনুমানের ওপর ভিত্তি করে প্রকল্প নেওয়াটাই ছিল বড় ভুল। এটি কেবল অদক্ষতা নয়, জনগণের টাকার অপচয়ও। প্রকল্প ব্যর্থ হলেও সাধারণত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ করা হয় না। এ সংস্কৃতি না বদলালে একই ভুল বারবার হবে। বড় প্রকল্পে ভুল প্রস্তুতি, অদক্ষ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ কিংবা দীর্ঘসূত্রতার কারণে অর্থ ফেরত গেলে দায় নিরূপণ করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।