ঢাকা শহরের দুই চেনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—নটর ডেম কলেজ আর হলিক্রস কলেজ। এরপর দুজনেরই গন্তব্য বুয়েটের ইইই বিভাগ। আলাদা পরিবারে বড় হলেও  জাকারিয়া রিভার এবং আফসানা ইসলাম কেয়ার জীবনের গল্পগুলো শুরু থেকেই যেন এক ছন্দে চলেছে। সেই মেলবন্ধন এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল ৪৭তম বিসিএসের ফলাফল প্রকাশের পর। প্রশাসন ক্যাডারের তালিকায় পাশাপাশি এসেছে এই দম্পতির নাম। ক্যাম্পাস থেকে সিভিল সার্ভিস—তাঁদের এই দারুণ যাত্রার গল্প শুনতে মুখোমুখি হয়েছিল মুক্তকণ্ঠ চাকরি-বাকরি অনলাইন। কথা বলেছেন গোলাম রব্বানী ও ফাইজার মো. শাওলীন।

.

আপনাদের দুজনের বেড়ে ওঠার গল্পে নাকি দারুণ কিছু মিল আছে? একই শহরে থেকেও সেই মিলগুলো কেমন ছিল?

জাকারিয়া: হ্যাঁ, আমাদের ছোটবেলাটা কেটেছে একদম একই রকম যাপন দিয়ে। আমার বাবা বাংলাদেশ পুলিশে আছেন আর কেয়ার বাবা জেলা সিভিল সার্জন অফিসে। সরকারি চাকরির কারণে আমাদের দুজনের বাবাকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বদলি হতে হয়েছে।

আফসানা: তবে আমাদের নোঙর ছিল ঢাকা শহর। মা আর ভাইবোনদের সঙ্গে নিয়ে আমরা এখানেই স্থায়ীভাবে পড়াশোনা করেছি। আমাদের দুজনেরই মায়েরা ছিলেন পড়াশোনার মূল চালিকা শক্তি। জাকারিয়া পড়েছে রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল ও নটর ডেম কলেজে। আর আমি নৌবাহিনীর স্কুল ও হলিক্রস কলেজে। ঢাকার দুই নামকরা কলেজে পড়ার পর আমাদের গন্তব্য গিয়ে মিলে গেল একই জায়গায়—বুয়েটের ইইই বিভাগে।

.

বুয়েটের একই ক্লাসরুমে যখন প্রথম দেখা হলো, তখন থেকেই কি বোঝাপড়াটা তৈরি হয়েছিল?

আফসানা: আমরা বুয়েটে একই ক্লাসে বসতাম। প্রথমে ক্লাসমেট, তারপর বন্ধু। আমাদের একটা অদ্ভুত ব্যাপার ছিল—মনে হতো আমরা একে অপরকে কত আগে থেকে চিনি। আমাদের ভালো লাগা, মন্দ লাগা বা যেকোনো বিষয়ে চিন্তা করার ধরনটা এত মিলে যেত যে অনেক কিছু মুখে বলতে হতো না। একজন কী ভাবছে বা কোন পরিস্থিতিতে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে, অন্যজন খুব সহজেই বুঝে যেত। এই নীরব বোঝাপড়া থেকেই আসলে আমাদের সম্পর্কটা তৈরি হয়।

জাকারিয়া: তবে মনের কথাটা প্রথম মুখে বলার দায়িত্বটা আমিই নিয়েছিলাম। প্রপোজালটা আমার দিক থেকেই প্রথম যায়। এরপর জমাট প্রেম। দুই পরিবারের পূর্ণ সম্মতিতে আমরা বিয়ে করি।

.

বুয়েটের ইইই বিভাগ মানেই তো গ্লোবাল ক্যারিয়ারের বড় সুযোগ। আপনারা দেশেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন?

জাকারিয়া: আমরা থার্ড বা ফোর্থ ইয়ারেই মনে মনে ঠিক করে ফেলেছিলাম যে বাইরে যাব না। নিজের দেশের মাটিতেই ক্যারিয়ার গড়ব। দেশের মানুষের জন্য সরাসরি কাজ করার অনুভূতিটাই আমাদের কাছে বড় ছিল। আসলে আমাদের ক্যারিয়ারের সিদ্ধান্তগুলো শুধু ঘরসংসার সামলানোর স্তরে ছিল না, আমরা একে অপরের প্রফেশনাল স্বপ্নটাকেও খুব কাছ থেকে দেখছিলাম।

আফসানা: বাইরে হয়তো আরও অনেক সুযোগ আছে। কিন্তু আমাদের মনে হয়েছে, নিজের জায়গায় থেকেও দারুণ কিছু করা সম্ভব। সেই যৌথ ভাবনা থেকেই সিভিল সার্ভিসকে লক্ষ্য বানানো।

.

একই সঙ্গে বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া কতটা সহজ, আর কতটা কঠিন?

জাকারিয়া: শুরুতে আমরা একটা বই কিনেই পড়তাম। আমি আগে পড়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো দাগিয়ে রাখতাম। পরে কেয়ার পড়তে একটু অসুবিধা হতো। তখন বুঝলাম, এভাবে হবে না। এরপর থেকে একই বইয়ের দুটি কপি কিনতে শুরু করি। (হাসি)

আফসানা: (হেসে) এটুকু স্বীকার করতেই হবে। আসলে আমাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল, আমরা একে অপরকে বিশ্বাস করতাম। তাই পড়াশোনা নিয়ে অকারণ তর্ক হয়নি।

.বিসিএসে কেন প্রফেশনাল বা টেকনিক্যাল ক্যাডারে আগ্রহ হারাচ্ছেন মেধাবীরা.

পড়াশোনার রুটিনটা কেমন ছিল?

আফসানা: আমাদের বেশির ভাগ পড়াশোনা হতো রাতে। দিনে টিউশনি ছিল। কখনো একসঙ্গে বসে পড়তাম, কখনো আলাদা। একজন পড়ে আরেকজনকে বুঝিয়ে দিলে বিষয়টা অনেক সহজ হয়ে যেত। একটা অধ্যায় শেষ হলে বা কোনো পরীক্ষা ভালো হলে নিজেদের ছোট্ট একটা পুরস্কার দিতাম—প্রিয় কোনো সিরিজের একটি পর্ব দেখতাম।

জাকারিয়া: দুজনেরই ব্রেকিং ব্যাড সিরিজ খুব পছন্দ। বিকেলে আমি নিয়মিত ফুটবলের সময় ফুটবল, ক্রিকেটের সময় ক্রিকেট খেলতাম। তারপর টিউশনি। রাতে ফিরে আবার পড়তে বসতাম। আর পড়াশোনার চাপ যখন বেশি লাগত, সুযোগ পেলেই দুজনে বাইক নিয়ে ঢাকার আশপাশ ঘুরতে বেরিয়ে পড়তাম।

.

এবারের বিসিএসের প্রশ্ন নিয়ে তো বেশ আলোচনা হচ্ছে। আপনাদের কাছে প্রশ্নপত্রের মান কেমন লেগেছে?

জাকারিয়া: এবারের প্রশ্ন বেশ ভিন্নধর্মী এবং বিশ্লেষণমূলক ছিল। শুধু গাইড বই মুখস্থ করে পার পাওয়ার দিন যে শেষ, সেটা প্রশ্ন দেখলেই বোঝা যায়।

আফসানা: আমাদের যেহেতু ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাকগ্রাউন্ড, তাই লজিক্যাল থিঙ্কিং বা যুক্তি দিয়ে চিন্তা করার একটা অভ্যাস ছিল। আন্তর্জাতিক বিষয় বা সুশাসনের মতো বড় উত্তরগুলো নিজস্ব বিশ্লেষণে গুছিয়ে লিখতে এই ব্যাকগ্রাউন্ড আমাদের বেশ সাহায্য করেছে।

.

ফল প্রকাশের মুহূর্তটা কেমন ছিল? স্ক্রিনে নাম দেখার পর আপনাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

জাকারিয়া: পিডিএফ প্রকাশের পর আমিই প্রথমে রেজাল্ট চেক করি। প্রশাসন ক্যাডারের তালিকায় নিজের রোল নম্বর দেখে একটা বড় স্বস্তি কাজ করছিল।

আফসানা: ও যখন আমাকে জানাল ও প্রশাসন ক্যাডারে সুযোগ পেয়েছে, আমি খুশিতে এতটাই আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম যে নিজের ফল দেখার কথা মাথাতেই ছিল না! ওর সাফল্যে আমি নিজের রেজাল্ট দেখার কথাই পুরোপুরি ভুলে গিয়েছিলাম। এরপর জাকারিয়াই তালিকায় আমার রোল নম্বর খুঁজে দেয়।

.ক্যাডেট কলেজের আদলে হবে ৬০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান.

বর্তমান যুগে যখন দুজন মানুষই হাই-ফ্লাইং বা বড় ক্যারিয়ার গড়তে চান, সেখানে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা কতটা সম্ভব?

জাকারিয়া: বিশ্বজুড়েই এখন এটা প্রমাণিত যে যখন দম্পতিরা সমানভাবে ক্যারিয়ারে অবদান রাখে এবং কাছাকাছি উপার্জন বা স্ট্যাটাস হোল্ড করে, তখন তাদের মধ্যে ইমপ্যাথি বা সহানুভূতি অনেক বেশি থাকে। কারণ, আমরা দুজনেই জানি কাজের চাপটা কেমন।

আফসানা: ঠিক তাই। আমরা দুজনেই যেহেতু এখন একই ক্যাডারে, তাই আমাদের কাজের পরিবেশ এবং মানসিক চাপটা আমরা খুব ভালো বুঝব। একে অপরের কাজকে সম্মান করা এবং পাশে থাকাটাই সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী ও মজবুত করে।

.

প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে নিজেদের কীভাবে দেখতে চান?

জাকারিয়া: সরকারি অফিস নিয়ে মানুষের অভিযোগ অনেক। সেবা পেতে দেরি হয়, ফাইল আটকে থাকে। অন্তত আমার দায়িত্বের জায়গায় যেন মানুষ এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি না হয়, সেটাই চেষ্টা করব।

আফসানা: আমি চাই, আমার দায়িত্বের জায়গাটা অন্তত দুর্নীতিমুক্ত থাকুক। কেউ যেন অন্যায়ভাবে তার ন্যায্য সেবা থেকে বঞ্চিত না হন।

.

একসঙ্গে বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া অন্য দম্পতিদের জন্য কোনো অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চান?

আফসানা: সঙ্গীকে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে সহযাত্রী ভাবা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কখনো একজন এগিয়ে থাকবে, কখনো অন্যজন। তখন হীনম্মন্যতায় না ভুগে পাশে থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি। যখন একজন পিছিয়ে পড়ে, অন্যজনকে টেনে তোলাটাই আসল কাজ।

জাকারিয়া: আমরা একজন পড়ে আরেকজনকে বুঝিয়ে দিতাম। অনেক সময় কাছের মানুষ যেভাবে বোঝাতে পারে, সেটা অন্য কেউ পারে না। তাই একসঙ্গে প্রস্তুতি নিলে সহযোগিতাই সবচেয়ে বড় শক্তি।

মাঠ প্রশাসনে আপনাদের ভবিষ্যৎ পথচলার জন্য শুভকামনা।

জাকারিয়া ও আফসানা: আপনাদের এবং মুক্তকণ্ঠ চাকরি-বাকরি অনলাইনের পাঠকদেরও অনেক ধন্যবাদ।

.‘কেপ ভার্দে-নরওয়ে’ আতঙ্ক মাড়িয়ে সকালে পাঞ্চিং মেশিন: বিপাকে ফুটবলপ্রেমী চাকরিজীবীরা