বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্রের জন্য বড় এক অর্জনের খবর এল। আলোচিত চলচ্চিত্র ‘দেলুপি’–এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ভারতের প্রখ্যাত নির্মাতা অনুরাগ কশ্যপ। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন থেকে ছবিটি ‘অনুরাগ কশ্যপ প্রেজেন্টস: দেলুপি’ নামে উপস্থাপিত হবে। নির্মাতাদের আশা, অনুরাগ কশ্যপের এই সম্পৃক্ততা চলচ্চিত্রটির আন্তর্জাতিক পরিবেশনা, বিভিন্ন উৎসবে অংশগ্রহণ এবং বিশ্বজুড়ে দর্শকের কাছে পৌঁছানোর পথ আরও প্রশস্ত করবে।
.বাংলাদেশের একটি স্বাধীন চলচ্চিত্রের সঙ্গে অনুরাগ কশ্যপের মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একজন নির্মাতার নাম যুক্ত হওয়াকে চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার স্বাধীন চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে অনুরাগ কশ্যপের ভূমিকা দীর্ঘদিনের। তাঁর সমর্থন নতুন নির্মাতাদের জন্যও ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
.ওয়েব সিরিজ ‘শাটিকাপ’ ও ‘সিনপাট’–এর মাধ্যমে আলোচনায় আসা নির্মাতা মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দেলুপি’ গত বছরের ৭ নভেম্বর দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। মুক্তির পর সমালোচক ও দর্শকের প্রশংসা কুড়ানোর পাশাপাশি ছবিটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শিত হয়েছে।
.সিনেমা দেখে মুগ্ধ অনুরাগ
পরিচালক মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম জানান, ‘দেলুপি’ দেখার পর অনুরাগ কশ্যপ নিজেই ছবিটি নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। গল্প বলার ধরন, নির্মাণশৈলী এবং ভিজ্যুয়াল–এর ভাষা তাঁকে মুগ্ধ করে। এরপরই আন্তর্জাতিকভাবে ছবিটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
তাওকীর ইসলাম বলেন, ‘আমরা খুবই আনন্দিত ও অভিভূত। অনুরাগ কশ্যপের মতো একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার আমাদের সঙ্গে এই যাত্রায় যুক্ত হচ্ছেন, এটি শুধু “দেলুপি”–এর জন্য নয়, বাংলাদেশের সিনেমার জন্যও বড় একটি সুখবর। তাঁর প্রতি আমরা আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।’
মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম আরও জানান, আন্তর্জাতিক পরিবেশক ও উৎসব আয়োজকদের কাছে ছবিটি নতুনভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও অনুরাগ কশ্যপের সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তাঁদের বিশ্বাস।
লেটারবক্সডে প্রশংসা, তারপর নতুন ঘোষণা
এর আগে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম লেটারবক্সড–তে ‘দেলুপি’ দেখে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন অনুরাগ কশ্যপ। গত রোববার তাওকীর ইসলাম নিজের ফেসবুক পেজে সেই রিভিউয়ের স্ক্রিনশট প্রকাশ করে নতুন এই সহযোগিতার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। রিভিউতে অনুরাগ কশ্যপ লেখেন, ‘ক্ষমতার রাজনীতি যে কত ক্ষুদ্র স্তরেও কাজ করে, সেটাই দেখা যায় “দেলুপি” গ্রামের গল্পে। শাসনব্যবস্থা বদলের পর বন্যায় দেশের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ছোট্ট এই গ্রাম। গল্পটা এতটাই মানবিক যে মনে হয় যেন আমাদের নিজেরই পাশের গ্রামের কথা দেখছি। ভীষণ ভালো লেগেছে।’
এ মন্তব্য প্রকাশের পর থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘দেলুপি’ নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
খুলনার দেলুটি থেকে বিশ্বের পর্দায়
‘দেলুপি’–এর জন্ম বাস্তব ঘটনা থেকে। ২০২৪ সালে খুলনার দেলুটি ইউনিয়নে ভয়াবহ বন্যার পর সেখানে যান নির্মাতা মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম। শুরুতে উদ্দেশ্য ছিল একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য গল্প খোঁজা। স্থানীয় মানুষের জীবন, সংকট ও প্রতিদিনের সংগ্রামের ভেতর থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় ‘দেলুপি’–এর চিত্রনাট্য। ছবিটিতে উঠে এসেছে খুলনার দক্ষিণাঞ্চলের নদীভাঙন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, স্থানীয় রাজনীতিতে জাতীয় রাজনীতির ছায়া, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং প্রান্তিক মানুষের টিকে থাকার লড়াই। একই সঙ্গে মানবিক সম্পর্ক, ভালোবাসা এবং আশার গল্পও জায়গা পেয়েছে এতে।
স্থানীয় মানুষ, স্থানীয় ভাষা
ফুটপ্রিন্ট ফিল্ম প্রোডাকশনের ব্যানারে নির্মিত ছবিটিতে অভিনয় করেছেন চিরঞ্জিৎ বিশ্বাস, অদিতি রায়, রুদ্র রায়, জাকির হোসেনসহ আরও অনেকে। ছবির বেশির ভাগ শিল্পীই খুলনা অঞ্চলের স্থানীয় মানুষ। ফলে সংলাপ, ভাষা, উচ্চারণ এবং জীবনযাপনের বাস্তবতা পর্দায় স্বাভাবিকভাবেই উঠে এসেছে।
নির্মাতারা ছবিটির শুটিংও করেছেন বাস্তব লোকেশনে। আন্তর্জাতিক প্রিমিয়ারের আগে দেলুটি ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য খোলা আকাশের নিচে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন তাঁরা। যাঁদের জীবন থেকে ছবির অনুপ্রেরণা, তাঁদের হাতেই ছবিটি প্রথম তুলে দেওয়ার চেষ্টা ছিল সেটি।
.রটারডামে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব
‘দেলুপি’ ইতিমধ্যে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব–এর ‘ব্রাইট ফিউচার’ বিভাগে প্রদর্শিত হয়েছে। নতুন নির্মাতা ও ব্যতিক্রমধর্মী চলচ্চিত্রের জন্য এই বিভাগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে পরিচিত। সেখানে ‘দেলুপি’–এর নির্বাচন বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্রের জন্য উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। এবার সেই যাত্রায় নতুন অধ্যায় যোগ করলেন অনুরাগ কশ্যপ। তাঁর নাম যুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিবেশক, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবং চলচ্চিত্র উৎসবগুলোর আগ্রহ আরও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বাংলাদেশের একটি স্বাধীন চলচ্চিত্রের জন্য এটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নয়; বরং বৈশ্বিক চলচ্চিত্র মানচিত্রে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।






