বিমানে ভ্রমণের সময় আকাশে হঠাৎ ঝাঁকুনি বা টার্বুলেন্সে বিমান যখন কেঁপে ওঠে তখন অনেক যাত্রীই ভীত হয়ে পড়েন। চিন্তিত হয়ে পড়েন এই ভেবে যে কোনো বিপজ্জনক কিছু কি ঘটতে যাচ্ছে? বিমানটি কি দুর্ঘটনার কবলে পড়তে যাচ্ছে?

.

টার্বুলেন্স হলো বায়ুমণ্ডলের এমন একটি অবস্থা, যেখানে বাতাস হঠাৎ দিক ও গতি পরিবর্তন করে অস্থির ও এলোমেলোভাবে প্রবাহিত হয়। সহজভাবে বললে, টার্বুলেন্স হলো আকাশে-বাতাসের অস্থিরতা। বাতাস হঠাৎ দিক ও গতি বদলে ফেললে তার মধ্য দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় বিমান কেঁপে ওঠে। অনেকটা শান্ত ও স্থির নদীতে হঠাৎ ঢেউ ওঠার মতো। পানির মতোই আকাশেও এমন অস্থির প্রবাহ তৈরি হতে পারে। বিমান যখন এই অস্থির বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে যায়, তখন সেটি কিছুটা কাঁপতে বা দুলতে থাকে। কখনো কখনো বিমানের আরোহীরা তীব্রভাবে এই ঝাঁকুনি অনুভব করতে পারেন। অভিজ্ঞতা না থাকলে অনেকেই বিপদ কিংবা দুর্ঘটনার শঙ্কায় ভীত হয়ে পড়েন।  

.ছুটির দিনে ঘুরে আসুন পুরান ঢাকার এই ১০ ঐতিহাসিক স্থান থেকে.

বেশির ভাগ টার্বুলেন্স তৈরি হয় মেঘের ভেতরে, বিশেষ করে শক্তিশালী বজ্রগর্ভ মেঘে। সেখানে ঊর্ধ্বমুখী ও নিম্নমুখী বায়ুপ্রবাহ অত্যন্ত দ্রুত ও বিশৃঙ্খল থাকে। বিমানের পাইলটরা প্রায়ই এ ধরনের মেঘের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় যাত্রীদের টার্বুলেন্সের বিষয়ে আগে থেকেই সতর্কসংকেত দেন। এতে যাত্রীরাও নিজেদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করার সুযোগ পান। অবশ্য সব টার্বুলেন্স বৈরী আবহাওয়ায় ঘটে না, সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও শান্ত আকাশে কিছু ঘটে। একে বলা হয় ‘ক্লিয়ার এয়ার টার্বুলেন্স’।

.

এ ধরনের ঝাঁকুনি তেমন বিপজ্জনক না হলেও সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত, কারণ এটি চোখে দেখা যায় না এবং আগে থেকে বোঝা কঠিন। টার্বুলেন্সের আরেকটি বড় উৎস হলো জেট স্ট্রিম বা উচ্চ আকাশে দ্রুতগতির বাতাস। ঘণ্টায় শত মাইল গতিতে প্রবাহিত এই বাতাস যখন আকাশের স্থির বাতাসের সঙ্গে ঘর্ষণ তৈরি করে, তখন টার্বুলেন্সের কবলে পড়ে বিমান। আবার সুউচ্চ পর্বতের সঙ্গে বাতাসের সংঘর্ষ থেকেও ঢেউয়ের মতো বায়ুপ্রবাহ তৈরি হতে পারে, যা অনেক দূর পর্যন্ত টার্বুলেন্স ছড়িয়ে দেয়।

.

এত সব বর্ণনা পড়ে টার্বুলেন্সকে ভয়াবহ মনে হলেও আধুনিক বিমানগুলো এ পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানের কাঠামো এমনভাবে নকশা করা হয় যে এটি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি চাপ সহ্য করতে পারে। তাই টার্বুলেন্সে বিমান ভেঙে পড়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। পাইলটরা সাধারণত ফ্লাইটের আগে আবহাওয়ার বিস্তারিত পূর্বাভাস পান এবং সম্ভাব্য ঝাঁকুনির এলাকা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, একই আকাশপথে বিমান চলাচলের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে চাইলেও অনেক সময় পাইলটের পক্ষে টার্বুলেন্স এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে একই পথে এগিয়ে থাকা অন্য বিমান থেকে পাওয়া তথ্য তাদের টার্বুলেন্সে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

.বদলে গেছে ডেঙ্গুর ধরন, বিপদগুলো জানুন.

বিমানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও এখন টার্বুলেন্সের পূর্বাভাসকে আরও উন্নত করছে। কিছু নতুন ব্যবস্থা বিমানের সেন্সর ব্যবহারের মাধ্যমে বাতাসের অস্থিরতা শনাক্ত করে রিয়েল টাইম তথ্য পাঠাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ফ্লাইটকে আরও নিরাপদ ও আরামদায়ক করতে সাহায্য করবে। অবশ্য ঝুঁকি যে একেবারেই নেই, তা বলা যায় না। বিশেষ করে আকস্মিক ও তীব্র টার্বুলেন্সে সিটবেল্ট বাঁধা না থাকলে বিমানের ভেতরে থাকা যাত্রীরা আঘাত পেতে পারেন। তাই টার্বুলেন্সের ঝুঁকি থাকলে পাইলটরা প্রায়ই সিটবেল্ট সাইন জ্বালিয়ে দেন এবং যাত্রীদের নিজ নিজ আসনে বসে থাকার নির্দেশ দেন।

.

যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই সুরক্ষা অভ্যাস। অপ্রয়োজনীয় ও ভারী জিনিস হাতের কাছে না রাখা এবং কেবিন ক্রুর নির্দেশ মেনে চলা টার্বুলেন্সের ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনের শেষ ভাগে টার্বুলেন্স তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। তাই সকালে ফ্লাইট নেওয়া এবং বিমানের সামনের অংশে আসন নেওয়া তুলনামূলক ভালো বলে মনে করা হয়। ২১ বছরের অভিজ্ঞ ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট এবং ‘ক্রুজিং অ্যাটিটিউড’ বইয়ের লেখক হিদার পুলের মতে, বিমানের পেছনের অংশে টার্বুলেন্সের প্রভাব বেশি অনুভূত হয়। অনেক সময় পেছনের যাত্রীরা এমনভাবে ঝাঁকুনি অনুভব করেন যেন তারা কোনো রোডিওতে (দুরন্ত ষাঁড়ের পিঠে বসে থাকার খেলা) আছেন। যেকোনো টার্বুলেন্স সবচেয়ে কম অনুভূত হয় ককপিটে। তিনি পরামর্শ দেন, টার্বুলেন্সের সময় সব সময় সিটবেল্ট বাঁধা থাকা উচিত, এমনকি যখন সিটবেল্ট সাইন বন্ধ থাকে, তখনো। ঢিলেঢালা করে বাঁধা হলেও এটি আরোহীর মাথাকে ওভারহেড বক্সে আঘাত লাগা থেকে রক্ষা করে।

.বিয়ে-জন্মদিনে ১০০ জনের বেশি অতিথি হলেই গুনতে হবে জনপ্রতি ২৫ টাকা.

এ ছাড়া ঝাঁকুনির সময় শিশুদের একজনের কাছে থেকে অন্যজনের কাছে বা এক সিট থেকে অন্য সিটে স্থানান্তর বা কেবিন ক্রু যখন জিনিসপত্র সামলাচ্ছেন তখন তাঁদের কাছে গরম কফি বা অন্য বস্তু ফেরত দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত বলে জানান হিদার। যাত্রীদের যদি উড়োজাহাজ ভ্রমণ নিয়ে ভয় বা উদ্বেগ থাকে, তাহলে আগে থেকেই কেবিন ক্রুকে জানানোর পরামর্শ দেন তিনি। এতে তাঁরা প্রয়োজন হলে বাড়তি খেয়াল রাখবেন এবং প্যানিক অ্যাটাকে সহায়তা করবেন। বিমান ভ্রমণের আগেই মোবাইলে ‘মাই রাডার’ বা ‘সোয়ার’–এর মতো মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড করে নেওয়ার পরামর্শ দেন হিদার। এসব অ্যাপ আকাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে, যা যাত্রীদের মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে সাহায্য করে।

.

তাঁর মতে, যাত্রীরা যদি আবহাওয়া এবং টার্বুলেন্স কীভাবে তৈরি হয়, তা ভালোভাবে বুঝতে পারেন, তাহলে তাঁদের মধ্যে ভয় অনেকটাই কমে যায়, তাঁরা আশ্বস্ত থাকতে পারেন—এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব।


সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ও বিবিসি

.৪২ বছর বয়সে মা হতে চলেছেন কারিশমা