বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জরিপ বলছে, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ২ দশমিক ৮ শতাংশ প্রতিবন্ধী। দুঃখজনক হলেও সত্যি, ৪৬ লাখের বেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে সমাজের মূল স্রোতে নিয়ে আসার সমন্বিত ও কার্যকর কোনো রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতি ও উদ্যোগ নেই। আমাদের জনপরিসর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গণপরিবহন, সরকারি–বেসরকারি সেবা সংস্থা—এখন পর্যন্ত তাঁদের স্বাগত জানাতে মোটেই তৈরি নয়। ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিদের নিয়ে পরিবারগুলোর লড়াই চলে একেবারে নিঃসঙ্গ।
বাংলাদেশের সংবিধানে শিক্ষাকে সর্বজনীন করা হলেও বাস্তব পরিসংখ্যান বলছে, ৫–১৭ বছর বয়সী প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রায় ৬০ শতাংশই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হলো অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব, সামাজিক বৈষম্য ও সহায়ক সেবার ঘাটতি। ফলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজ ও অর্থনীতির মূল স্রোতে আনতে হলে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই প্রথম মনোযোগ দিতে হবে শৈশবেই যেন তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়। এ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য অন্তর্ভুক্তি মডেলের শিক্ষা ও জীবিকা উন্নয়ন কর্মসূচি একটি কার্যকর মডেল হতে পারে।
মুক্তকণ্ঠের খবর জানাচ্ছে, প্রতিবন্ধী শিশুদের মূলধারার শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা সাইটসেভার্স বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘শিখব সবাই’ নামে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এই কর্মসূচির আওতায় দেশের বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পাঠদান করা হচ্ছে। এই কর্মসূচির ওপর যৌথভাবে গবেষণা করেছে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা অনুষদ। গত মঙ্গলবার এই গবেষণার যে ফলাফল প্রকাশ হয়েছে, সেটা এককথায় আশাব্যঞ্জক। কেননা গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় বিদ্যালয়ে হতদরিদ্র প্রতিবন্ধী শিশুদের অংশগ্রহণ বেড়েছে ১৫ শতাংশ। প্রতিবন্ধী শিশুদের বুলিং বা হয়রানির শিকার হওয়ার হার আগের চেয়ে কমেছে ৮ শতাংশ।
গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানাচ্ছেন, প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সার্বিক অবকাঠামোর উন্নয়ন, বাড়িতে শিশুদের বাড়তি যত্ন নেওয়া এবং সামাজিক সহায়তা বাড়ানো গেলে তাদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। প্রতিবন্ধী ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব বেশি দেখা গেছে। ছাত্রীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের হার এবং বাড়িতে পড়াশোনার সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এ গবেষণা থেকে এটা স্পষ্ট যে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষায়িত বিদ্যালয়ের চেয়ে সাধারণ বিদ্যালয়ে একসঙ্গে পাঠদান বা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা হচ্ছে সবচেয়ে উপযোগী পদ্ধতি। এটি একদিকে যেমন প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতি অন্য শিশুদের সমাজপ্রদত্ত ধারণা পাল্টাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে, অন্যদিকে প্রতিবন্ধী শিশুদের মানসিক বিকাশেও সহায়তা করে। আমরা মনে করি, প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য ‘শিখব সবাই’ কর্মসূচির যে অন্তর্ভুক্তিমূলক মডেল, সেটিকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করার সময় এসেছে। সে ক্ষেত্রে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণের সঙ্গে অভিভাবকদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা প্রয়োজন।
তবে শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত আর অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাই এখানে শেষ কথা নয়। অর্থনৈতিক কারণেও অনেক পরিবার প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহী হয় না। কেননা, দারিদ্র্য ও প্রতিবন্ধিতা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। দরিদ্র পরিবারে প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকি বেশি, আবার প্রতিবন্ধী ব্যক্তি থাকলে সেই পরিবারের পক্ষে দারিদ্র্য জয় করাও কঠিন। গবেষণায় উঠে এসেছে, পরিবারগুলোর মাসিক আয় বাড়ানো গেলে ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়। একই সঙ্গে শিক্ষা শেষ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে পারেন, তার জন্যও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। শুধু ভাতা, উপবৃত্তি কিংবা বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি তাঁদের ভাগ্য উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে না। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টিতে একটি সামগ্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মডেল এখন সময়ের দাবি।






