এ মুহূর্তে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকটা ‘ফিল গুড’ ধরনের আবহ চলছে। একধরনের আত্মতুষ্টিতে চারদিক সয়লাব হয়ে আছে। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকের মতো একটি পরীক্ষায় ৩৬ শতাংশ ছাত্রছাত্রী পরীক্ষা দেবে না—এর চেয়ে বড় ধরনের মানসিক ধাক্কা আর হয় না।
বিপুল সংখ্যায় শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার এ তথ্যের মানেটা কী? আমার মনে হয়, এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক উত্তর দেওয়া উচিত নয়। তবে একটা কথা তাৎক্ষণিকভাবেই বলা যায় যে আমাদের সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থার যে বেহাল, তার একটি প্রতিফলন এটি। আর এই শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি রূঢ়ভাবে আমাদের জাগিয়ে তোলার একটা ধাক্কা দিচ্ছে। এর অর্থ খুঁজতে হবে।
.৩৬% শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছেন না.কেন তারা পরীক্ষা দিচ্ছে না। ছাত্রছাত্রীরা, বাবা–মা বা অভিভাবকেরা কি পুরোপুরি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর থেকে মুখ সরিয়ে নিচ্ছেন? নাকি তাঁদের কোনো ভিন্ন ধরনের অসুবিধা আছে? তাৎক্ষণিকভাবে উত্তরগুলো দেওয়ারও একটা সমস্যা দাঁড়িয়ে গেছে। আমার মনে হয়, এখানে গভীর অনুসন্ধানের বিষয়টা অনুপস্থিত হয়ে আছে। আমাদের গবেষক বলি বা নীতিনির্ধারক বলি বা যারা কমেন্ট করছে, আমরা কেউই বাস্তব পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পারছি না।
যে মাসে এই পরীক্ষা হচ্ছে, সেই জুলাই মাসে দুই বছর আগে বিরাট গণ–আন্দোলন হয়েছিল। সেই জুলাইয়ের আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীরাই তো সবচেয়ে বড় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল। একদম শেষ মুহূর্তে সেই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের জন্য তাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু আমার মনে হয়, জুলাই পরিবর্তনের পরে আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার, সার্বিকভাবে আমরা সামাজিক এলিট বলি নতুন সরকার বলি—তারা কেউই ছাত্রছাত্রী তথা যুবসমাজের কথা শুনিনি। সত্যি কথা বলতে তাদের বোঝারও চেষ্টা করিনি। তাদের বেদনা, তাদের আকাঙ্ক্ষা, তাদের যেটা বলা যায় যে কনফিউশন, বিভ্রান্তি—সবগুলো নিয়ে আমরা গভীরভাবে বোঝার চেষ্টাটা করিনি। সেটা অন্তর্বর্তী সরকার, বর্তমান সরকার বা আমরা যারা এসব নিয়ে কথা বলি, তাদেরও বিশ্বাসযোগ্যভাবে অনুসন্ধানের চেষ্টা নেই।
.শোনার জায়গাটাকে বাদ দিয়ে নানা ধরনের সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু যাদের নিয়ে সমাধান, তাদের বিষয়টা আমরা শুনছি না। ৩৬ শতাংশ ছাত্রছাত্রী পরীক্ষা দিচ্ছে না, তাহলে কি শিক্ষাব্যবস্থার ওপর একধরনের নো–কনফিডেন্সের (আস্থাহীনতা) বিষয় একটা দাঁড়িয়ে গেছে? এরা কোথায় যাবে? বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে এসব ভাবা।
এ মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় এবং সমাজের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে তিনটা বিষয় আছে। অর্থনীতি, ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক ও শিক্ষা। এই শিক্ষা হচ্ছে নতুন প্রজন্মের উন্নতির বাহন। কিন্তু সেই শিক্ষা নিয়ে এ মুহূর্তে আমরা সেই মনোযোগটা দিচ্ছি না এবং দেওয়ার লক্ষ্যটাও জোরালোভাবে অনুভব করছি না। এখানে আমরা সার্বিকভাবে অন্য যেসব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি—ট্রিলিয়ন ডলার আয় বা এ ধরনের নানা পরিকল্পনা, সেগুলো কিন্তু কাগজের বিষয় হয়ে যাবে। যদি না এই প্রজন্মকে, এই মানুষগুলোকে আমরা চিন্তার বা মনোযোগ দিয়ে শোনার সংস্কৃতির বাইরে রাখি। এরা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় রাষ্ট্র থেকে, শিক্ষা থেকে—তাহলে আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না। রাষ্ট্র নির্মাণে তাদের আবেগঘন সম্পৃক্ততা যদি আলগা হয়ে যায়, তাহলে সমাজে অস্থিরতার বিষয়টা অনেক বেড়ে যাবে। এর কিছু কিছু নিদর্শন আমরা ইতিমধ্যে দেখতে পাচ্ছি।
.অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির আলোচনা চলুক। কিন্তু শিক্ষা নিয়ে চর্বিত চর্বণ নয়। নিজেরা যা মনে করি, তা সমাধান নয়। এখন দরকার হলো শোনার ব্যাপারটা। শিক্ষকদের শুনতে হবে, ছাত্রছাত্রীদের শুনতে হবে এবং তাদের বাবা–মায়েদেরও শুনতে হবে।
জুলাই আন্দোলনের পর অনেক অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষকদের অপমান ও অপদস্থ করা হয়েছে। মব সৃষ্টি করা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগের মতো দলীয় পদায়ন চলছে। জুলাই আন্দোলনের প্রতিনিধিত্বকারী দাবিদারদের মাধ্যমেই অনেক ঘটনা ঘটেছে। এভাবে পুরো আন্দোলনের অনেক কিছুই এক অর্থে গৌণ করে ফেলা হয়েছে। শিক্ষার প্রতি, শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি বর্তমান অনীহা সৃষ্টিতে এর একটি ভূমিকা থাকতে পারে। এখন আমাদের সততার সঙ্গে আত্মমূল্যায়নের পথে যেতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
*হোসেন জিল্লুর রহমান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা






