ট্রান্সকম গ্রুপের প্রয়াত চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান ও তাঁর নাতি ফারাজ আইয়াজ হোসেনের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিনা মূল্যে মেডিক্যাল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফারাজ হোসেন ফাউন্ডেশন ও এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস আজ বুধবার দিনব্যাপী দেশের ৩৫টি স্থানে এই আয়োজনে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পেয়েছেন প্রায় ১৬ হাজার মানুষ।

বিনা মূল্যে মেডিক্যাল ক্যাম্পে আসা চিকিৎসাপ্রার্থীদের অধিকাংশই নিম্ন আয়ের এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষজন। চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পেয়ে তাঁদের মুখে হাসি ফুটেছে।

ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান ২০২০ সালের ১ জুলাই কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন। তিনি ছিলেন দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পপতি। তাঁর নাতি ফারাজ আইয়াজ হোসেন ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে ঢাকার গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে উগ্রপন্থীদের এক হামলায় নিহত হন। তিনি ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমানের ছেলে।

তাঁদের মৃত্যুবার্ষিকীতে আয়োজিত বিনা মূল্যে মেডিক্যাল ক্যাম্পের খবর পাঠিয়েছেন মুক্তকণ্ঠের বিভিন্ন জেলার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা।

.

কুমিল্লা নগরের উনাইসার চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকায় আজ সকাল ৯টায় মেডিক্যাল ক্যাম্প শুরু হয়। এটি চলে বিকেল চারটা পর্যন্ত। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা এতে চিকিৎসা দেন।

বেলা ১১টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, মেডিক্যাল ক্যাম্পটিতে সেবাপ্রত্যাশী মানুষের ভিড়। চিকিৎসকেরা একের পর এক রোগীদের সেবা দিচ্ছিলেন। চিকিৎসা পেয়ে ফেরার পথে বিনা মূল্যে ওষুধ পেয়ে খুশি ছিলেন রোগীরা।

মৌসুমি আক্তার নামের এক নারী কাজ করেন কুমিল্লা ইপিজেডে। তাঁর গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরে। তিনি এসেছেন ডায়াবেটিস এবং জ্বরের সমস্যা নিয়ে। মৌসুমি বলেন, ‘অনেকে দিন ডাক্তার দেখাব দেখাব বলে টাকার সমস্যার কারণে ডাক্তার দেখাতে পারছিলাম না। আজকে বিনা টাকায় সেবা পেয়ে আমি খুশি। আমি লতিফুর রহমান ও ফারাজ হোসেনের জন্য দোয়া করব।’

.

খুলনায় চিকিৎসাশিবিরের আয়োজন করা হয় নগরের জলিল সরণির বয়রা ক্লিনিকে। সকাল ১০টার দিকে সেখানে দেখা যায়, চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের ব্যাপক ভিড়। তাঁদের কেউ বুকে ব্যথা, কেউ উচ্চ রক্তচাপ, কেউ ডায়াবেটিস, কেউ জ্বর আবার কেউ অ্যালার্জিজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। তাঁদের চিকিৎসাসেবা দেন এম হারুন-অর-রশিদ।

.লতিফুর রহমানের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ .

দুর্বলতা ও বমি ভাবের চিকিৎসা নিতে আসা মেহেদী হাসান (৫৫) বলেন, ‘শরীর চলতে চায় না। বুকে ও মাথায় ব্যথা হয়। প্রায়ই বমি বমি ভাব হয়। এখানে বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হচ্ছে জেনে এসেছিলাম। ডাক্তার দেখিয়েছি, ওষুধ পেয়েছি।’

এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ ডেপুটি সেলস ম্যানেজার মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘প্রয়াত লতিফুর রহমান ও ফারাজ আইয়াজ হোসেনের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আমরা দিনব্যাপী ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্পের আয়োজন করেছি। আগে থেকেই এলাকায় মাইকিং করা হয়েছিল। সকাল ৯টায় চিকিৎসাসেবা শুরু হয়েছে। দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২৫০ জন রোগী নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে শতাধিক রোগীকে বিনা মূল্যে ওষুধ ও ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হয়েছে।’

.

বগুড়ায় দিনব্যাপী আয়োজিত দুটি আলাদা চিকিৎসাশিবিরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে বিনা মূল্যে সেবা পেয়েছেন ১ হাজার ২০০ জন মানুষ। সকাল ৯টা থেকে বগুড়ার ধুনট উপজেলার যমুনা নদীর ভাঙনকবলিত গোসাইবাড়ি ইউনিয়নের চুনিয়াপাড়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা এবং বগুড়া সদর উপজেলার পলাশবাড়ী গ্রামে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নবজাগরণ যুবসংঘ কার্যালয়ে একযোগে চিকিৎসাসেবা প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়। পাশাপাশি রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধও বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়।

যমুনা নদীর ভাঙনকবলিত বিভিন্ন এলাকা থেকে হতদরিদ্র ৬ শতাধিক মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসেন। তাঁদের একজন গোসাইবাড়ি ইউনিয়নের চুনিয়াপাড়া গ্রামের ডালিম খাতুন (৪৫)। তিনি বলেন, ‘যমুনা হামাকেরে বসতভিটা সব গিলে খাচে। মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও নেই। গরিব মানুষ। অসুখের চিকিৎসা করামো ক্যাংকা করে? নানা অসুখত ভুগিচ্চি। টেকার জন্যি এত দিন ডাক্তার দেকাপার পারিনি। এটি আসে মাগনা ডাক্তার দেকাপার পারিচি, ওষুধডাও মাগনা পাচি। হামার খুবই উপকার হচে।’

.

ফরিদপুর শহরের দক্ষিণ চর কমলাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত বিনা মূল্যে চিকিৎসাশিবিরের আয়োজন করা হয়। সেখানে সাত শতাধিক রোগীকে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ প্রদান করা হয়। সেখানে রোগীদের দেখে ব্যবস্থাপত্র দেন হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস ও মেডিসিন চিকিৎসক সৌরভ দাস এবং ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানজিন রহমান।

.ছোটুর চলে যাওয়ার এক দশক, নানাভাই নেই ৬ বছর.

দুপুর ১২টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, দূরদূরান্ত থেকে নারী, পুরুষ, শিশুসহ সব বয়সের রোগীরা ক্যাম্পে ভিড় করছেন। তাঁরা চিকিৎসকদের কাছ থেকে ব্যবস্থাপত্র নিচ্ছেন এবং আসার সময় এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ওষুধ বিনা মূল্যে নিয়ে খুশি মনে ফিরে যাচ্ছেন।

চরকমলাপুর এলাকার শেখ মোসলেমের স্ত্রী মিনু বেগম (৪৫) জানান, তিনি ডায়াবেটিক, থাইরয়েড, উচ্চ রক্তচাপ, বাতব্যথাসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। তিনি বলেন, ‘গতকাল মঙ্গলবার মাইকিং শুনে এসেছি। ডাক্তার পাঁচ ধরনের ওষুধ লিখে দিয়েছেন। এখান থেকে আমাকে চার ধরনের ওষুধ ফ্রি দিয়েছে। আমি খুব খুশি।’ দক্ষিণ চরকমলাপুর এলাকার বাসিন্দা মো. সাইফুল্লাহ (৪২) বলেন, ‘পেট বড় হয়ে যায়, ফ্যাটি লিভার সমস্যা। বউ জানায়, বিনা মূল্যে চিকিৎসা দিচ্ছে। তাই ডাক্তার দেখাতে চলে এসেছি।’

.

নোয়াখালীর সীমান্তবর্তী লক্ষ্মীপুরের আজাদনগর চর আবদুল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনা মূল্যে মেডিক্যাল ক্যাম্প হয়েছে। সেখানে দুই জেলার সীমান্তবর্তী চরাঞ্চলের তিন শতাধিক অসহায়, দুস্থ ও সাধারণ মানুষকে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রদান করা হয়।

দিনব্যাপী এই ক্যাম্পে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ছিলেন মেডিসিন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৌহিদুল ইসলাম এবং গাইনি বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নুসরাত জাহান অনু। তাঁরা আগত রোগীদের আন্তরিকতার সঙ্গে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন।

ক্যাম্পে উপস্থিত থেকে সার্বিক কার্যক্রম তদারকি ও পরিচালনা করেন এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক খায়রুল বাশার। তিনি বলেন, ‘ফারাজ হোসেন ফাউন্ডেশন ও এসকেএফ সব সময়ই মানবতার কল্যাণে কাজ করে আসছে। চরাঞ্চলের মানুষ ভৌগোলিক ও যাতায়াত ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় সঠিক সময়ে উন্নত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হন। তাঁদের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতেই আমাদের এই আয়োজন এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’

.

সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বরিশালের উজিরপুর উপজেলার প্রত্যন্ত ডাবেরকূল ইউনিয়নে এই মেডিক্যাল ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে আয়োজিত ক্যাম্পে অন্তত ৩০০ দরিদ্র রোগীকে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধও দেওয়া হয়। এতে চিকিৎসাসেবা দেন ইসতিয়াক আহমেদ ইমন ও সাইদুর রহমান।

স্থানীয় গাজীরপাড় গ্রামের বৃদ্ধ আবদুস সত্তার (৮৫) দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে ঠিকমতো চিকিৎসক দেখাতে পারেননি। মেডিক্যাল ক্যাম্পের মাইকিং শুনে তিনি এই ক্যাম্পে আসেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ও ওষুধ পেয়ে খুশি আবদুস সত্তার বলেন, ‘মোগো গরিব মাইনসের লইগ্যা য্যারা এই আয়োজন করছে, হ্যাগো আল্লায় রহমত করুণ, প্রাণখুইল্লা দোয়া হরি।’

মালিকান্দা গ্রামের মমতাজ বেগম (৪৫) দীর্ঘদিন ধরে অ্যালার্জি, শারীরিক ব্যথাসহ নানা সমস্যায় ভুগছেন। শহরে গিয়ে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই। এখানে এসে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পেয়ে খুশি মমতাজ বেগম বললেন, ‘এহন যদি আল্লায় একটু আছান দেয়।’

.

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার কোলাহা শহীদ স্মৃতি উচ্চবিদ্যালয়ে এই চিকিৎসাশিবিরের আয়োজন করা হয়। এতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি অ্যান্ড অবস, নাক–কান–গলা, দন্ত, হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস, বক্ষব্যাধি, শিশুরোগের চিকিৎসা প্রদান করেন। রোগীদের মধ্যে বিনা মূল্যে ওষুধও বিতরণ করা হয়।

চিকিৎসাশিবিরে উপস্থিত ছিলেন এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসের সিনিয়র রিজিওনাল সেলস ম্যানেজার শেখ মো. রবিউল ইসলাম ও অন্য কর্মকর্তারা। এই ক্যাম্পে প্রায় ৪০০ জন রোগীকে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ প্রদান করা হয়।

.ফারাজ হোসেনের জন্মদিনে বিনা মূল্যে চিকিৎসা পেলেন দরিদ্র মানুষেরা