ড্রামটা প্রথমে আস্তে বাজল। তারপর জোরে। তারপর আরও জোরে।

নকআউটের ম্যাচে শেষ বাঁশির পর জয়ী দল কী করে? উল্লাসে-উচ্ছ্বাসে একে অপরকে আলিঙ্গন, করমর্দন, দর্শকদের দিকে হাত নাড়া...। নরওয়ে দল করেছে এর সবই। তবু সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটা তখনো বাকি।

কাঁধে করে ড্রাম নিয়ে এলেন অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড। ডাক দিলেন সবাইকে। আর্লিং হলান্ডই এগিয়ে এলেন প্রথম, পেছন পেছন আন্তনিও নুসা, আলেক্সান্দার সরলথরা। এরপর সারিবদ্ধ হয়ে সবাই বসে পড়লেন মাটিতে—বৈঠা বাওয়ার শেষ প্রস্তুতি। এবার নৌকায় তুলতে হবে গ্যালারিকেও।

ওডেগার্ড বসে পড়ার ইশারা করলেন। কিন্তু শুধু সামনের দর্শক চুপ হলে চলবে? উঠে দাঁড়ালেন হলান্ড। দুই হাত নেড়ে চারপাশের দর্শকদেরও প্রস্তুত হতে বললেন।

তারপর শুরু হলো সেই পরিচিত দৃশ্য।

ড্রামে প্রথম আঘাত করলেন ওডেগার্ড। সামনে-পেছনে দুলে উঠল খেলোয়াড়দের শরীর। মুহূর্তেই সেই ছন্দ ছড়িয়ে পড়ল গ্যালারিতেও। হাত দিয়ে বৈঠা বাইতে লাগলেন হলান্ড-সরলথরা। একবার, দুবার...তারপর আরও দ্রুত। ড্রামের আওয়াজ বাড়ল, বাড়ল নৌকা বাওয়ার গতিও। যেন কোনো নৌকা সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছে। ভাইকিং রো।

এই বিশ্বকাপে নরওয়ের আগের দুই জয়েও দেখা গেছে এমন উদ্‌যাপন। তবে আজকের ভাইকিং রো আলাদা। কারণ, এবার সেই নৌকা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউটের ঢেউ পেরিয়েছে।

আইভরিকোস্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় পেয়েছে নরওয়ে। আর সেই জয় তাদের তুলে দিয়েছে শেষ ষোলোয়, যেখানে অপেক্ষা করছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ৫ জুলাইয়ের সেই ম্যাচে কী হবে, তা আপাতত অজানা, তবে এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত নরওয়ের নৌকা চলছে ভাইকিং রোর তালে তালেই।

গ্রুপ পর্বে ইরাকের বিপক্ষে ৪-১ আর সেনেগালের বিপক্ষে ৩-২ গোলের জয় আগেভাগেই শেষ বত্রিশের টিকিট এনে দিয়েছিল নরওয়েকে। শেষ ম্যাচে ফ্রান্সের কাছে ৪-১ গোলে হারলেও তাতে যে গতি কমে যায়নি, তা প্রমাণের মঞ্চ ছিল আজ আইভরিকোস্টের বিপক্ষে। হলান্ড, ওডেগার্ড, নুসারা সেটিই করে গেলেন ডালাস স্টেডিয়ামে।

ম্যাচের ৩৯তম মিনিটে প্রথম গোলটি করেছেন ২১ বছর ৭৪ দিন বয়সী আন্তনিও নুসা। বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে বড় কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে নরওয়ের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা এখন তিনি।

এই গোলের পেছনে ছিল মার্টিন ওডেগার্ডের রক্ষণচেরা দুর্দান্ত পাস। আর তাতেই নরওয়ে অধিনায়কও একটি রেকর্ডে ঢুকে পড়েছেন। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের পর নিজের প্রথম তিন ম্যাচের প্রতিটিতেই অ্যাসিস্ট করা মাত্র তৃতীয় ফুটবলার তিনি। এর আগে এই কীর্তি ছিল শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের ইগর বেলানভ (১৯৮৬) এবং জার্মানির মাইকেল বালাকের (২০০২)।

ওডেগার্ড অবশ্য এমনই, বেশির ভাগ সময়ই থাকেন সহযোগীর ভূমিকায়। গোলমুখে থেকে ম্যাচের আলোর বেশির ভাগই টানেন হলান্ড। ২৫ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড আজও সেটিই করেছেন। প্রথমার্ধে মাত্র আটবার বলের দেখা পেয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে সুযোগ আসার পর আর ভুল করেননি। ৮৬ মিনিটে গোল করে তিনিই নিশ্চিত করেন নরওয়ের জয়। এবারের আসরে যা তার পঞ্চম গোল।

তবে গোলটা যতটা না হলান্ডের, তার চেয়ে বেশি প্যাট্রিক বার্গের গোলমুখে বাড়িয়ে দেওয়া পাসের।

দুটি গোলের এই খণ্ড খণ্ড চিত্রই হয়তো নরওয়ের এই দলের প্রতীকী ছবিও। কখনো নুসা, কখনো ওডেগার্ড, কখনো বার্গ, আবার প্রয়োজন হলে হলান্ড। একজন থেমে গেলে আরেকজন বৈঠা ধরছেন। তাই বৈঠা থামে না। নৌকাও নয়।

হলান্ডদের পূর্বপুরুষ ভাইকিংদের সমুদ্রযাত্রার বড় কারণ ছিল অজানাকে জয় করা। শতাব্দী পেরিয়ে সেই ভাইকিং ঐতিহ্যের প্রতীকই এখন নরওয়ে ফুটবল দলের ‘ভাইকিং রো’। ড্রামের তালে তালে খেলোয়াড় আর দর্শকদের একসঙ্গে গর্জে ওঠা যেন মনে করিয়ে দেয়, সামনে যত ঢেউই থাকুক, বৈঠা থামানো যাবে না। ব্রাজিল এখন সেই যাত্রার পরের গন্তব্য।

নৌকাটি সেখানে ভিড়বে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত এটুকু নিশ্চিত, নরওয়ের নৌকা এখনো বয়ে চলেছে।