টাউনশিপ

গভীর আদিবাসী ছায়াবন
সবুজ ছিঁড়ে উপড়ে ফেলেছে
অনেক অভিবাসী মুঠি।
পাহাড়ের কঙ্কাল পড়ে আছে
বুকে লক্ষ দাঁতের দাগ–আঁচড়
গাছে গাছে কুঠার ও কষ
অদূরেই নয়া টাউনশিপ—
মাটিতে ভরাট পথ রিসোর্ট
বাজার নতুন কালভার্টে
ঝিরি বুজে গেছে।

আগুন জ্বেলে চারপাশে
গোল হয়ে বসেছে সভ্যতা
ঘন জঙ্গলের বুক কেটে
একটুকরো সমতলে ক্যাম্প;
সেদ্ধ ভাজা ঝলসানো পাখিমাংস
চিবিয়ে নিচ্ছে টুকরো
কুড়মুড়িয়ে ভাঙছে হাড়গোড়
কবজির নিচে গড়াচ্ছে
স্বাদু রস আশ্লেষে
গানে হাসিতে খানখান নির্জন আঁধার।

তখন, শীত নামার আগেই
শুকনো থমধরা আকাশ
নীলচে হিমের জাদুতে স্থির
সন্ধ্যার মৃত চাঁদ অই আবছায়া—
দলছুট সাদা পেট ধূসর ডানা
পাহাড় টপকে অভ্যাসে
চেনা পথে একা উড়ে গিয়ে
আবার ফিরে আসে, নিঃস্ব।
তার মাতম বেদনার স্বর
পালকের নিচে উত্তুঙ্গ কম্প
চুপচাপ মেনে নিতে হয়
যা যা দেখা ও শোনা
আসর থেকে আর ব্যাখ্যা করা যায় না
কোনো জিজ্ঞাসাই নয়—
আলোর রেণু ধুলো সরিয়ে
বাতাসের খোসা ছড়িয়ে রাখছে রাত
মনোযোগী, ঠান্ডা ছুরির ফলায়।

বৃষ্টি

মহাজাগতিক ইশারায় দেখছিলে শহর
সাবধানে দূর হতে মেপে নিলে চাকা ও চলাচল
ভ্যাপসা রেণুর ওড়াউড়ি, এখানে অস্বস্তি
কোথাও স্লোগান নেই তোমার জন্য
আগুন মুছে দিতে পারে এমন কালো মেঘ
অথবা ছায়াহটানো কেঁপে ওঠা রোদ
ঠিকানা নেই, গলিতে ফুটপাতে আহত রাস্তায়।
ভিড় ঠেলে হাঁটছি ক্ষুধাতপ্ত
বেড়িবাঁধে তুচ্ছ গা-রিরি হাওয়া
পিঠ ঝলসে দেয় মেরিনড্রাইভ বৈভব
নোংরা বালিয়াড়ি বোতলে প্যাকেটে
জড়িয়ে পড়ছে গতি; ডাকছি মনে মনে
ডাকছি গলা ছেড়ে: বেহাত সমুদ্র, আয় আয়।
কিন্তু নেমে এলে নীলিমা ছিঁড়ে চকিত বৃষ্টিবিন্দু
ভিখারির বুকে অনেক ফোঁটা অচল পয়সা
ছড়াতে হারাতে-অতলে নিয়ে যেতে চিহ্নসন্ধানে
ঘামে নোনতা বাঁচা ধুয়ে ক্লিন্ন মাছ
যেথায় ধুকপুক; মরে পড়ে থাকে যন্ত্রণায়
আর ইতিহাস লেখে জেলেনৌকা, নিম্নবর্গীয়।

.

হ্যাপেনিং

গান ভেবে তুমি যা লিখছ
রূপকল্প একগোছা
বসাচ্ছ শব্দের পর শব্দ
লাইনের ওপরে কথার কামরা
ছন্দ ঠিক করে নিলেই ঝিকঝিক
তুরুকসওয়ার মেলোডি—
ভাবছ তোফা, তবে তো হয়েই গেল
চাপাও উদ্যম খাপখোলা
যন্ত্র টেনে তোলা সুর
তারে গলায় সাধো
রেওয়াজে আওয়াজে
রাত পোহালেই স্টুডিও
বাজার বলছে, হ্যাপেনিং!

লাখো লাখো ভিউ
কাটতি ঠোঁট চেটে
গর্ব থরথর তুমি যা ভাবছ
দরকারি সফল ফটোগ্রাফ—
ঘরে ঘরে তাই
হাতুড়ি লাগাচ্ছে ঘা
পেরেক ঢুকছে গর্তে
তালে তালে শব্দ বাজছে
প্রতিধ্বনি ভরপুর ধুলায়
আর দেয়ালের কষ্ট হচ্ছে জেনে
গানটা ভুলে যাচ্ছে সবাই।

দেশ

চমৎকার এক দেশ ফেলে এসেছে
ফসলের খেত আলপথ পাশে নদী
মাটিলেপা উঠান পুকুর লাউমাচা
পেছনে ফেলেছে সে—আলো হাসি কান্না
নরম সকাল সোনাচাঁপা ঘ্রাণ
কলরব, বিজনে পানপাতা মুখ
আর ঘোরলাগা অশ্রুময়ী চর—
এসব মিলেই তার দেশ
সে ছেড়ে এসেছিল তোমার শহরে।

হেঁটে যাচ্ছে অবিকল ভঙ্গিমা
ঝাঁকা মাথায় রাস্তার ফেরিওয়ালা
‘বুজ্ঞাদা! কই যাবে?’ আনমনে ফিসফিস
মায়ের অস্পষ্ট গলা আটতলায়
দুপুরের রোদ রক্তজবায় ঝরে
জানালায় চিবুক বিমর্ষ বাবা
শিরা ওঠা অস্থির দুহাত
‘বিশ্বাস কর, ধলাকাকার মুখ!
অন্ধকারে হেমসেন লেনের গভীরে
গ্যাসবেলুন গাড়ি ঠেলে নেয়’—
আদতে কে কাকে ছেড়ে আসে, যায়
ফুল ও বেলুন, মানুষ বা দেশ তাই
মায়ায় মীমাংসায় যেন ফেরার সকলেই।

এমনই আফসোস রেখে গেছে
রোদ–বৃষ্টি–ঝড়ে শীতের ফুটপাতে
ইটের নগরে আগন্তুক পায়ে
পথে পথে দিনে বহু রাতে
আরও কত মানুষের চোখে
তুলে রাখা অব্যর্থ স্মরণ
একেকটা দেশের গল্প নিভে আছে।
ক্ষুধা মারি রিকশায় ভ্যানে সওয়ারি
খাটুনির ঘাম রক্ত হাহাকার
স্টেশনে বস্তিতে ঘাটে ঘুমহীন
শ্রান্ত, পড়ে থাকে তন্দ্রালু ভোরে—
আজও শিসে শিসে
এক দোয়েল তাকে ছিন্নভিন্ন করে
বিহ্বল দূরের শহরে।

আলস্য

বাহার ভেসে গেলে
টুকরো আকাশ নীল
শুয়ে দেখে মেঘ

বিশ্রাম ভরশূন্য জানে
আটপৌরে অলস—
পাপড়ির কাছে পাতা
পিঁপড়ের পায়ে দ্রুতি
কাগজ, ছিন্ন রঙিন

ভ্রমণ উড়ে গেলে
ধুলো খেলে একা—
এক উদাসী পালক।