বিশ্বকাপে নকআউট পর্ব শুরু হচ্ছে আজ রাত থেকে। শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে আজ বাংলাদেশ সময় রাত একটায় কানাডার মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকা। এবং নকআউট পর্বের সঙ্গে ফিরছে স্নায়ুক্ষয়ী টাইব্রেকারের উত্তেজনাও।

সর্বশেষ বিশ্বকাপে রেকর্ড পাঁচটি ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়িয়েছিল। এবার বিশ্বকাপে যোগ হয়েছে বাড়তি একটি রাউন্ড—‘লাস্ট ৩২’। ফলে সর্বশেষ আসরের রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে এবার।

.

১৯৮২ বিশ্বকাপ থেকে এ পর্যন্ত ৩৫টি টাইব্রেকারে ৩২০টি শট নেওয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এবারের বিশ্বকাপে পেনাল্টি শুটআউটে কী দেখা যেতে পারে, সেটা বিশ্লেষণ করেছে বিবিসি স্পোর্ট ও অপ্টা।

বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত টাইব্রেকারে সবচেয়ে বেশি জয় আর্জেন্টিনার। ছয়টি পেনাল্টি শুটআউট জয়ের বিপরীতে মাত্র একটি হেরেছে। ক্রোয়েশিয়া ও জার্মানি সমান চারটি করে পেনাল্টি শুটআউট জিতেছে। এ দুটি দল কোনো টাইব্রেকারে হারেনি। তবে ব্রাজিল তিনটি শুটআউট জয়ের বিপরীতে দুটিতে হেরেছে। ফ্রান্স টাইব্রেকার জিতেছে দুবার, হেরেছে তিনবার। ইংল্যান্ড ও স্পেন একবার করে টাইব্রেকার জিতেছে।

.

বিশ্বকাপের টাইব্রেকারে সবচেয়ে বেশি শট মিসের রেকর্ডটি ছিল ইংল্যান্ডের (৮টি) দখলে। সর্বশেষ বিশ্বকাপে তাদের সেই রেকর্ড পেরিয়ে যায় স্পেন। কাতার বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় মরক্কোর বিপক্ষে তিনটি শটের একটিতেও গোল করতে পারেনি স্পেন। তাতে বিশ্বকাপে স্পেনের পেনাল্টি শট মিসের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯টি।

টাইব্রেকারে সব কটি শট থেকেই গোল করেছে বেলজিয়াম, দক্ষিণ কোরিয়া ও প্যারাগুয়ে (প্রত্যেকেই পাঁচটি করে)। আর তিনটি শটের একটিতেও গোল করতে পারেনি সুইজারল্যান্ড। জার্মানি টাইব্রেকারে ১৮টি শটের ১৭টিতে লক্ষ্যভেদ করেছে।

.

বিশ্বকাপে তিনটি ভিন্ন টাইব্রেকারে গোল করার কীর্তি কেবল দুজনের—আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি ও ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদরিচ। টাইব্রেকারে শতভাগ সফল দুই কিংবদন্তি।

বিশ্বকাপে দুটি শট নিয়ে দুটিতেই গোল করা খেলোয়াড় ২৩ জন। ইতালির কিংবদন্তি রবার্তো বাজ্জিও ৩টি শটের ২টি জালে জড়ালেও মিস একটি। ১৯৯৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে তাঁর সেই মিস এই টুর্নামেন্টের ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক মুহূর্ত।

ক্রোয়েশিয়ার পঞ্চম বৃহত্তম শহর জাদারের পানিতে বোধ হয় বিশেষ কিছু আছে! কারণ, মদরিচ তো বটেই, বিশ্বকাপে টাইব্রেকারে সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি ঠেকানো চার গোলরক্ষকের দুজনের জন্ম এ শহরে।

.

দানিয়েল সুবাসিচ (২০১৮ বিশ্বকাপে) এবং দমিনিক লিভাকোভিচ (২০২২ বিশ্বকাপে)—দুজনই বিশ্বকাপের টাইব্রেকারে চারটি করে স্পট-কিক ঠেকান। সুবাসিচকে মুখোমুখি হতে হয় ১০টি শটের, আর লিভাকোভিচ মুখোমুখি হন আটটি শটের।

তাঁদের পাশাপাশি চারটি করে পেনাল্টি শট সেভ করার রেকর্ড জার্মানির সাবেক গোলকিপার হ্যারল্ড শুমাখার (মুখোমুখি ৯ শট) ও আর্জেন্টিনার সের্হিও গয়কোচিয়ার (মুখোমুখি ১০ শট)।

তবে এক টাইব্রেকারে তিনটি শট ঠেকানোর অনন্য কীর্তি আছে শুধু সুবাসিচ, লিভাকোভিচ ও পর্তুগালের রিকার্দোর। এর মধ্যে শতকরা হিসাবে সবচেয়ে সফল রিকার্দো। মাত্র চারটি স্পট-কিকের মুখোমুখি হয়ে তিনটিই ঠেকিয়ে তাঁর সেভের হার ৭৫ শতাংশ।

.

অবশ্য টাইব্রেকারে সবকিছু শুধু পেনাল্টি ঠেকানোর ওপরই নির্ভর করে না। যেমন ২০২২ সালের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ সরাসরি ঠেকিয়েছিলেন কেবল একটি পেনাল্টি। তবে তাঁর মনস্তাত্ত্বিক লড়াই বা ‘মাইন্ড গেম’ ফরাসি খেলোয়াড়দের ভড়কে দিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

.

টাইব্রেকারে আগে নাকি পরে শট নেওয়া সুবিধা—এমন কোনো স্পষ্ট ব্যবধান পরিসংখ্যানে নেই। আগে শট নেওয়া দল জিতেছে ১৭ টাইব্রেকারে, আর পরে শট নেওয়া দলের জয় ১৮টিতে।

দুই দলের হয়ে যাঁরা প্রথম শটটি নেন, তাঁদের গোল করার হার সবচেয়ে বেশি—৭২.৯ শতাংশ।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় শট নেওয়া খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে এই সাফল্যের হার সামান্য কমে দাঁড়ায় ৭১.৫ শতাংশে। চতুর্থ শটে গোল করার হার ৬৪.২ শতাংশ হলেও পঞ্চম শটে তা আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬.৭ শতাংশে।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে মাত্র দুটি টাইব্রেকার ‘সাডেন ডেথ’ বা মূল পাঁচটি শটের পরেও গড়িয়েছে। সেখানে ষষ্ঠ পেনাল্টি শট নেওয়া চার খেলোয়াড়ের গোল করার হার ছিল ৫০ শতাংশ। অবশ্য সাডেন ডেথে এর চেয়ে বেশি শট নেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি কখনো।

.

সাডেন ডেথ বাদ দিলে টাইব্রেকারে সবচেয়ে কম সফল হন সামগ্রিকভাবে অষ্টম শট নিতে আসা খেলোয়াড়টি। তাঁদের গোল করার হার মাত্র ৫৯.৪ শতাংশ।
মাঝে শট নেওয়ার ঝুঁকি বেশি

পেনাল্টি শটে মাঝ বরাবর বল মারার চেয়ে যেকোনো একদিকে নেওয়া শটে গোল পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

পরিসংখ্যান বলছে, যাঁরা ডান দিক বেছে নেন, তাঁদের শটের ৭২.৪ শতাংশ গোল হয়েছে। বাঁ দিকে নেওয়া শটের ক্ষেত্রে সাফল্যের হার ৭১.১ শতাংশ। মাঝ বরাবর নেওয়া শটের মাত্র ৬১.৬ শতাংশ জালে জড়ায়।

.গোল্ডেন বুটের লড়াই: মেসিকে ধরার দৌড়ে আছেন যাঁরা.

মজার ব্যাপার হলো, গোলকিপাররা মাঝ বরাবর শট ঠেকিয়েছেন তুলনামূলক কম (১৯.২ শতাংশ)। যেখানে কোনাকুনি নেওয়া শটগুলোর ২২.৬ শতাংশ ঠেকানো হয়েছে।

মাঝ বরাবরের শটে সাফল্যের হার এত কম কেন? কারণ, মাঝ বরাবর নেওয়া শটের ১৯.২ শতাংশই পোস্টের বাইরে যায় কিংবা পোস্টে লেগে প্রতিহত হয়। যেকোনো এক কোণ দিয়ে নেওয়া শটের ক্ষেত্রে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার এই হার মাত্র ৫.৭ শতাংশ।

.

বিশ্বকাপে টাইব্রেকারে ফরোয়ার্ড বা স্ট্রাইকারদের গোল করার হার সবচেয়ে বেশি—৭৫ শতাংশ (১০০টি শটের মধ্যে)। এর বিপরীতে মিডফিল্ডারদের শটের ৬৭.৯ শতাংশ (১৪০টি শটের মধ্যে) এবং ডিফেন্ডারদের নেওয়া শটের ৬৫ শতাংশ (৮০টি শটের মধ্যে) জালে জড়িয়েছে।

বিশ্বকাপের টাইব্রেকারে এখন পর্যন্ত কোনো গোলরক্ষককে শট নিতে দেখা যায়নি। এর বড় কারণ হোসে লুইস চিলাভার্ট, রোজারিও চেনির মতো পেনাল্টি বিশেষজ্ঞ কিপারদের কেউ কখনো বিশ্বকাপে টাইব্রেকারের মুখোমুখি হননি।

ডান পায়ের খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে টাইব্রেকারে সাফল্যের হার যেখানে ৬৯.৫ শতাংশ, বাঁ পায়ের খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে ৬৮.৮ শতাংশ। তবে বিশ্বকাপে নেওয়া পেনাল্টিগুলোর ৮০ শতাংশ শটই এসেছে ডান পায়ের খেলোয়াড়দের কাছ থেকে।

.গ্রুপসেরা হয়েও কেউ পায় তৃতীয় দল, কেউ রানার্সআপ—এ কেমন বিচার