কিওকো নিওয়া জাপানের প্রখ্যাত বাংলা সাহিত্য-গবেষক ও অনুবাদক। তিনি টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজের সাবেক অধ্যাপক। এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি স্নাতকোত্তর (১৯৮৩) এবং ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি (১৯৮৮) অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় আধুনিক ও সমকালীন বাংলা সাহিত্য, বাংলা কবিতা ও তুলনামূলক সাহিত্য। দীর্ঘ শিক্ষকজীবনে তিনি টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

কিওকো নিওয়ার অনুবাদের তালিকায় রয়েছে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালু (২০০৪), রবীন্দ্রনাথের জাপানযাত্রী (২০১৬), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জলসাঘর (১৯৯৩) এবং বাংলাদেশের ছোটগল্পের সংকলন (২০১৯)। এ ছাড়া তিনি জাপানি পাঠকদের জন্য বাংলা ভাষা শেখার বহুল ব্যবহৃত পাঠ্যবই নিউ এক্সপ্রেস বেঙ্গলিরবীন্দ্রনাথের জীবনী রচনা করেছেন। তাঁর সম্পাদিত ও সহলেখিত গ্রন্থের মধ্যে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব গ্লোবাল রিসেপশন (২০১৪) এবং রবীন্দ্রনাথ অ্যান্ড টেগোর: কালেক্টেড এসেস (২০২২)।

তিন দশকের বেশি সময় ধরে কিওকো নিওয়া বাংলা সাহিত্যকে জাপানি পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিরলস কাজ করছেন। তাঁর কর্মকাণ্ড জাপান-বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। ১৫ জুন ২০২৬ ই–মেইলযোগে তাঁর সাক্ষাৎকার নেন লেখক ও গবেষক মুহাম্মদ ফরিদ হাসান

.

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান: আপনার জন্ম ও শৈশব কোথায় কেটেছে? সে সময়কার কোনো বিশেষ স্মৃতি বা পরিবেশ কি আপনাকে পরবর্তী জীবনে সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী করে তুলেছিল?

কিওকো নিওয়া: আমার জন্ম সাইতামা শহরে আর এখনো একই শহরে থাকি। সাইতামা টোকিও শহরের ঠিক পাশে। ছোটবেলা থেকেই আমি বই পড়তে ভালোবাসি। আমার কোনো ভাইবোন নেই আর বাইরে খেলাধুলা করাটা তেমন একটা পছন্দ করতাম না বলে ছুটির দিনে নিজের বাড়িতে বই পড়ে সময় কাটাতাম।

হাসান: আপনার প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা আর জাপানের শিক্ষা–সংস্কৃতি নিয়ে যদি সংক্ষেপে বলতেন! বিশেষ করে, ভারত বা বাংলাদেশের মতো ভিন্ন সংস্কৃতির একটি ভাষা নিয়ে কাজ করার মানসিক প্রস্তুতি কীভাবে হয়েছিল?

নিওয়া: জাপানে তখন মাধ্যমিক বিদ্যালয় (সপ্তম শ্রেণি) থেকে ইংরেজি শেখা বাধ্যতামূলক ছিল। এ ছাড়া অন্য কোনো বিদেশি ভাষা শেখার তেমন সুযোগ ছিল না। তবে হাইস্কুলে পড়ার সময় আমি এক বছরের জন্য এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে অস্ট্রেলিয়ায় ছিলাম, তাই স্বাভাবিকভাবে ইংরেজিটা ভালো শিখতে পেরেছি। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিলাম, কারণ যেভাবেই হোক আমি একবার বিদেশে যেতে চেয়েছিলাম। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও জাপানি সাহিত্যের চেয়ে বিদেশি সাহিত্যই আমার বেশি ভালো লাগত, আর অজানা পৃথিবীর প্রতি আমার অন্যদের চেয়ে কৌতূহল বেশি ছিল।

হাসান: আপনি ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। সে সময়কার অভিজ্ঞতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার জীবনযাত্রা আপনার দৃষ্টিভঙ্গিতে কী ধরনের পরিবর্তন এনেছিল?

নিওয়া: কলকাতা ও জাপানের জীবনযাত্রার মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকায় আবহাওয়া, খাবার ও অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে আমার প্রায় এক বছর লেগেছিল। তবে দ্বিতীয় বছর থেকে সবকিছু সহজ হয়ে গেছিল।

শুরুতে বাংলা ভাষাও তেমন জানতাম না বলে খুব কষ্টে ছিলাম, তবে ধীরে ধীরে তা রপ্ত করে ফেলেছি। আসলে আমি জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দি ভাষা নিয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু পড়তে পারলেও হিন্দি বলাটা আমার জন্য বেশ কঠিন ছিল। আমার কাছে বাংলা বলাটাই বেশি সহজ মনে হতো।

হাসান: বিশ্বসাহিত্যের এত বিশাল ভান্ডার থাকতে বাংলা সাহিত্যের প্রতিই আপনার এ বিশেষ টান বা আগ্রহ ঠিক কীভাবে তৈরি হলো? এর পেছনে বিশেষ কোনো ঘটনা বা কোনো নির্দিষ্ট বইয়ের ভূমিকা ছিল কি?

নিওয়া: বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই আমি বিদেশি সাহিত্য নিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ইংরেজি বা ফরাসির মতো জনপ্রিয় কোনো ভাষা নয়, বরং যেসব ভাষা জাপানে খুব একটা পরিচিত নয়, সেগুলোই শিখতে চেয়েছিলাম। এ–ও মনে হলো, ইংরেজি বা ফরাসি সাহিত্যের অনেক অনুবাদ জাপানে রয়েছে, যা আমি অনায়াসই পড়তে পারতাম। আমি এমন কিছু নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলাম, যার অনুবাদ নেই এবং যা পড়ার জন্য মূল ভাষায় দক্ষতা অর্জন করা অপরিহার্য।

সে যা–ই হোক, খুব বেশি পরিচিত নয় এমন ভাষা বা সাহিত্যের মধ্যে ভারতকে বেছে নিয়েছিলাম, কারণ মনে হয়েছিল, ভারতের একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে এবং সেখানে নিশ্চয়ই নতুন কিছু পাওয়ার থাকবে (যদিও শুরুতে আমার মাথায় বাংলা নয়, বরং পুরো ভারতই ছিল, কারণ তখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু হিন্দিই শেখার সুযোগ ছিল)।

শুরুতে আমি হিন্দি সাহিত্য নিয়েই কাজ করার পরিকল্পনা করেছিলাম এবং ছায়াবাদী কবি যেমন মহাদেবী বর্মা, নিরালা প্রমুখের ওপর গবেষণাপত্র লিখেছিলাম।

সে সময় জানতে পারলাম যে ছায়াবাদী কবিরা রবীন্দ্রনাথের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, আর তাই আমি রবীন্দ্রনাথকেও পড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। রবীন্দ্রনাথের নাম অবশ্য আগে থেকেই জানতাম, তবে তিনি আমার পছন্দের সেই ছায়াবাদী কবিদের ওপরও প্রভাব ফেলেছেন বলেই তাঁকে পড়ার আগ্রহ জন্মেছিল। সেবারই প্রথম আমি নিজে নিজে চেষ্টা করে মূল বাংলা ভাষায় ‘গীতাঞ্জলি’ পড়েছিলাম। প্রসঙ্গত, অধিকাংশ বিদেশি মানুষ ‘গীতাঞ্জলি’র ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথকে চেনেন, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে উল্টোটা হয়েছিল। আমি শুরুতেই বাংলাটা পড়েছিলাম এবং অনেক পরে ইংরেজি অনুবাদ হাতে নিয়েছিলাম।

.
একই প্রজন্মের লেখকদের রচনার সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করাটা অনেক সহজ। আমার মতে, এটিই সবচেয়ে বড় সুবিধা। যদিও ইদানীংকালের লেখকদের বই খুব একটা পড়া হয়ে ওঠেনি, তবে ভালো কিছু পেলে নিশ্চয়ই অনুবাদ করার ইচ্ছা আছে।
.

হাসান: আপনার প্রিয় লেখক কারা? কাজের বাইরে অবসরে আপনি কাদের লেখা পড়তে পছন্দ করেন (বাংলা ও জাপানি উভয় ভাষায়)?

নিওয়া: আমি সাধারণত সব ধরনের বই-ই পড়ি, তবে খুব দুর্লভ কোনো ভাষা থেকে অনূদিত সাহিত্য পড়তে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। ওরহান পামুক বা সারামাগোর মতো অনেক লেখকের লেখা আমার প্রিয়। দক্ষিণ আমেরিকার লেখকদের কাজও আমার খুব ভালো লাগে। তবে সত্যি বলতে, গদ্যের চেয়ে কবিতাই আমার বেশি পছন্দের। আমি নিজেও কবিতা ও হাইকু লিখি।

হাসান: আপনি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের অনেক লেখকের কাজ অনুবাদ করেছেন। এ পর্যন্ত আপনার অনুবাদ করা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর একটি তালিকা যদি আমাদের পাঠকদের জন্য দিতেন...

নিওয়া: এ পর্যন্ত আমি মোট আটটি অনূদিত বই প্রকাশ করেছি। এর মধ্যে নজরুল ইসলামের কবিতা সংগ্রহ, বাংলাদেশের কবি ও পশ্চিমবঙ্গের কবিদের নিয়ে করা কাব্য সংকলন রয়েছে। এ ছাড়া সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’ এবং রবীন্দ্রনাথের ‘জাপানযাত্রী’ও অনুবাদ করেছি।

হাসান: আপনার অনুবাদ করা গ্রন্থগুলোর মধ্যে কোনগুলো জাপানি পাঠকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছে বা সমাদৃত হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

নিওয়া: জাপানি পাঠকেরা কবিতার চেয়ে গল্প-উপন্যাস বেশি পছন্দ করেন। আর এশীয় সাহিত্যের কথা বললে, যদিও আমি মনে করি না এটি খুব একটা ভালো প্রবণতা, পাঠকেরা খুব বেশি লিরিক বা আবেগপূর্ণ লেখার চেয়ে রাজনীতি ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে লেখা কঠোর দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন সাহিত্য বেশি পছন্দ করেন মনে হয়। সে প্রবণতার কারণেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’ জাপানে বেশ সাড়া ফেলেছিল।

হাসান: ১৯৯৩ সালে তারাশঙ্করের গল্পের মাধ্যমে আপনার অনুবাদযাত্রা শুরু। দীর্ঘ এই তিন দশকে জাপানি পাঠকদের রুচি বা বাংলা সাহিত্যের প্রতি আগ্রহে কী ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করছেন?

নিওয়া: আমার ছোটবেলায় বিদেশ বলতে কেবলই ইউরোপ-আমেরিকা বোঝাত। যখন আমি হিন্দি ভাষা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি, তখন অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করতেন, কেন সে রকম ভাষা আমি শিখছি। এমনকি আমার সহপাঠীদেরও চাকরি খুঁজতে কষ্ট হয়েছে। কিন্তু গত কয়েক দশকে পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে, এখন লোকেরা বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করছেন আর বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। বর্তমানের হিন্দি বা বাংলা ভাষার শিক্ষার্থীদের চাকরির বাজারে তেমন কোনো সমস্যা নেই। ইউটিউব বা অন্যান্য মিডিয়ার কল্যাণে এখন ঘরে বসেই যেকোনো দেশের বাস্তব চিত্র রিয়েলটাইমে দেখা যায়। এটা একটা বড় পরিবর্তন এবং আমি মনে করি, এর ফলে গতানুগতিক (স্টেরিওটাইপ) ধ্যানধারণাও পরিবর্তিত হচ্ছে।

হাসান: বাংলাদেশের সমকালীন তরুণ লেখকদের কাজ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? তাঁদের কাজ কি জাপানি ভাষায় অনুবাদের উপযোগী বা সেখানে জনপ্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা আছে?

নিওয়া: একই প্রজন্মের লেখকদের রচনার সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করাটা অনেক সহজ। আমার মতে, এটিই সবচেয়ে বড় সুবিধা। যদিও ইদানীংকালের লেখকদের বই খুব একটা পড়া হয়ে ওঠেনি, তবে ভালো কিছু পেলে নিশ্চয়ই অনুবাদ করার ইচ্ছা আছে।

.
বাংলার মানুষ, সে পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশ যেখানেই হোক, খুবই আন্তরিক। বিশেষ করে যখন জানতে পারেন যে আমি সাহিত্য নিয়ে কাজ করি, তখন আমাদের আলোচনার আর শেষ থাকে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব বেশি কথা বলি না, কিন্তু লেখক বা কবিদের সঙ্গে দেখা করার কথা বললেই তাঁরা তৎক্ষণাৎ সময় দেন এবং তাঁদের কাছ থেকে আমি অনেক শিখেছি।
.

হাসান: বিদেশি হিসেবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চায় আপনার অভিজ্ঞতায় প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো কী কী?

নিওয়া: শুরুতে বাংলা ভাষার কোনো পাঠ্যবই বা অভিধান ছিল না, এমনকি ইন্টারনেটও ছিল না, তাই ভারতে যাওয়ার আগে সবকিছুই আমার কাছে অস্পষ্ট ছিল। তবে যেহেতু শুরু থেকেই আমি এমন একটি ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে কাজ করার সংকল্প করেছিলাম, যা খুব একটা পরিচিত নয়, তাই এটিকে আমি কখনোই তেমন বড় কোনো কষ্ট বা সমস্যা বলে মনে করিনি। এখন মনে হয়, সেই সব অভিজ্ঞতার দিন বেশ আনন্দদায়ক ছিল।

হাসান: জাপানে বাংলা ভাষার প্রসারে আপনার এই দীর্ঘ লড়াই ও অবদানকে জাপান সরকার ও বাংলাদেশ সরকার কীভাবে মূল্যায়ন করছে? আপনি কি বিশেষ কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বা স্বীকৃতিতে ভূষিত হয়েছেন?

নিওয়া: কোনো সরকারি পুরস্কার বা অন্য কিছু পাইনি, কিন্তু এ পর্যন্ত এত সুন্দরভাবে কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছি, তাতেই আমি সন্তুষ্ট। ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে সে দেশে পড়তে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল, আবার অনুবাদ করার সময়ও নানা জায়গা থেকে অনুদান পেয়েছি। তা ছাড়া আমার নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বাংলা বিভাগ খোলা হবে এবং আমিই তার প্রথম শিক্ষক হব, তা কখনো কল্পনাও করিনি। এর আগে পেশাদারভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শেখানোর এমন কোনো জায়গা ছিল না, তাই পৃথিবীর এই বিরল সুযোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে আমার সব শ্রম যেন সার্থক হয়েছে বলে মনে হয়।

হাসান: টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজে বাংলা বিভাগ খোলার পর জাপানি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলার প্রতি আগ্রহ কেমন দেখছেন?

নিওয়া: অধিকাংশ শিক্ষার্থীই ভাষা বা সাহিত্যের চেয়ে সামাজিক কর্মকাণ্ডে বেশি আগ্রহী। স্নাতক শেষ করার পর তাঁরা প্রায় সবাই জাইকা (JICA), এনজিও বা বিভিন্ন কোম্পানিতে (বিশেষ করে যেসব কোম্পানি বাংলাদেশে কাজ করছে) যোগ দেন। তবে বাংলা ভাষা জানা থাকার ফলে কাজের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সুযোগও তৈরি হয়। আবার বাংলা সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকে শিক্ষার্থী পরে সাহিত্যের প্রতিও আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

হাসান: গবেষণার কাজে বা ব্যক্তিগত টানে আপনি এ পর্যন্ত কতবার বাংলাদেশে এসেছেন? এ দেশের মানুষের আতিথেয়তা বা সংস্কৃতি নিয়ে আপনার বিশেষ কোনো স্মৃতি আছে কি?

নিওয়া: আমি ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। এর পর থেকে নিজের ছেলের ছোটবেলা বাদ দিয়ে প্রায় প্রতিবছরই আমি কলকাতায় গেছি। সাধারণত আমার গন্তব্য কলকাতাকেন্দ্রিক হয়ে থাকলেও সময় পেলে আমি বাংলাদেশেও যাই।

বাংলার মানুষ, সে পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশ যেখানেই হোক, খুবই আন্তরিক। বিশেষ করে যখন জানতে পারেন যে আমি সাহিত্য নিয়ে কাজ করি, তখন আমাদের আলোচনার আর শেষ থাকে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব বেশি কথা বলি না, কিন্তু লেখক বা কবিদের সঙ্গে দেখা করার কথা বললেই তাঁরা তৎক্ষণাৎ সময় দেন এবং তাঁদের কাছ থেকে আমি অনেক শিখেছি।

.
বাংলা সাহিত্যে এমন অনেক কিছু রয়ে গেছে, যা এখনো অনাবিষ্কৃত বা যা পাঠকের কাছে তুলে ধরার অপেক্ষায় আছে। আমি এ পর্যন্ত যা অনুবাদ বা পরিচিত করেছি, তা সমুদ্রের একটি বিন্দুর সমান এবং একা এই বিপুল সাহিত্যভান্ডার শেষ করা অসম্ভব। ইন্টারনেট ও এআইয়ের কল্যাণে এখন অনেক কিছু জানা সহজ হয়েছে এবং অনুবাদের ক্ষেত্রেও তা আগের চেয়ে অনেক বেশি সহায়ক হয়েছে। তবে সাহিত্যের মতো বিষয়ের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত কাজটুকু মানুষের সংবেদনশীলতা দিয়েই সম্পন্ন করতে হয়, আর সেখানেই এর আসল সার্থকতা।
.

হাসান: জাপানে বাংলা সাহিত্যের প্রসারে আপনার বর্তমান কাজ বা ভবিষ্যৎ কোনো বিশেষ পরিকল্পনা সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন...

নিওয়া: এইমাত্র আমি রবীন্দ্রনাথের কবিতার একটি সংকলনের অনুবাদ ও সম্পাদনার কাজ শেষ করলাম। বইটা এ মাসেই প্রকাশিত হবে। কবির যৌবন থেকে শেষ জীবন পর্যন্ত লেখা বিভিন্ন কবিতা থেকে বাছাই করে মোট ৭৭টি কবিতা অনুবাদ করেছি। যদিও রবীন্দ্রনাথের কবিতার অনুবাদ অনেক রয়েছে, কিন্তু সেগুলোর বেশির ভাগই ইংরেজি থেকে করা এবং ‘গীতাঞ্জলি’র ধারার কবিতার ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই আমি চেয়েছিলাম, এখানকার পাঠকেরা যেন রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের আরও বিস্তৃত দিক সম্পর্কে জানতে পারেন।

এরপরের কাজ হিসেবে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ অনুবাদের পরিকল্পনা রয়েছে। অনুবাদটি শুরু করেছি মাত্র।

হাসান: যাঁরা বর্তমানে বিদেশি হিসেবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করতে আগ্রহী, তাঁদের জন্য আপনার বিশেষ কোনো পরামর্শ বা বার্তা আছে কি?

নিওয়া: বাংলা সাহিত্যে এমন অনেক কিছু রয়ে গেছে, যা এখনো অনাবিষ্কৃত বা যা পাঠকের কাছে তুলে ধরার অপেক্ষায় আছে। আমি এ পর্যন্ত যা অনুবাদ বা পরিচিত করেছি, তা সমুদ্রের একটি বিন্দুর সমান এবং একা এই বিপুল সাহিত্যভান্ডার শেষ করা অসম্ভব। ইন্টারনেট ও এআইয়ের কল্যাণে এখন অনেক কিছু জানা সহজ হয়েছে এবং অনুবাদের ক্ষেত্রেও তা আগের চেয়ে অনেক বেশি সহায়ক হয়েছে। তবে সাহিত্যের মতো বিষয়ের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত কাজটুকু মানুষের সংবেদনশীলতা দিয়েই সম্পন্ন করতে হয়, আর সেখানেই এর আসল সার্থকতা। এর মাধ্যমে আমি বাংলা সংস্কৃতির গভীরে প্রবেশ করার সুযোগ পেয়েছি, যা সত্যিই আনন্দের। আমি আশা করি, কেবল বাংলা সাহিত্য নয়, বরং বিদেশি সাহিত্যের যেকোনো শাখায় আরও বেশি মানুষ আগ্রহী হয়ে উঠবেন।