দেশে কিডনির রোগ এখন নীরব মহামারি হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার মানুষ শেষ ধাপের কিডনি বিকলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। কিডনির রোগের চিকিৎসাপ্রক্রিয়া জটিল। শুধু ডায়ালাইসিস বা চিকিৎসা বাড়িয়ে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন আইনি, কারিগরি ও চিকিৎসাপ্রক্রিয়ার আমূল সংস্কার।
আজ শনিবার রাজধানীর মিরপুরে কিডনি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন বক্তারা।
কিডনি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, রাফায়েল ইন্টারন্যাশনাল, কোরিয়ার ভাইটালিংক, ডানভিট ফাউন্ডেশনসহ কয়েকটি দেশি-বিদেশি সংস্থা যৌথভাবে ‘লাইভ অ্যান্ড ডিসিজড ডোনার কিডনি ট্রান্সপ্ল্যানটেশন’ (জীবিত ও মৃত দাতার কিডনি প্রতিস্থাপন) শীর্ষক এই সম্মেলনের আয়োজন করেছে।
সম্মেলনে মৃত ব্যক্তির অঙ্গদান এবং প্রতিস্থাপনব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে একটি বিশেষ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
.সমন্বিত লড়াই দরকার
শ্রীলঙ্কা থেকে কর্নিয়া এনে দেশে প্রতিস্থাপন করা যতটা সহজ, কিডনি কিংবা লিভারের ক্ষেত্রে বিষয়টি ততটা সহজ নয় বলে উল্লেখ করেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে জীবিত ও মৃত উভয় দাতার কাছ থেকেই অঙ্গ নেওয়ার নিয়মে কিছু পরিবর্তন এসেছে। তাই এই বিষয়ে আমাদের এখন অনেক দূর যেতে হবে। মানুষকে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করতে হবে।’
১৮ কোটি মানুষের দেশে এই রোগ কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে বলে মনে করেন এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, শুধু আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা বা প্রতিস্থাপন করে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়; পাশাপাশি সামগ্রিক রোগপ্রতিরোধ প্রক্রিয়ায় জোর দেওয়া চিকিৎসার চেয়ে অনেক বেশি সাশ্রয়ী।
কিডনির রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সমন্বিত কর্মসূচি, সামাজিক সচেতনতা এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমেই আমরা শেষ ধাপের কিডনির বিকলতা এবং প্রতিস্থাপনের হার কমিয়ে আনতে পারব।’
.নীরব মহামারি চলছে
বাংলাদেশে কিডনির রোগ একটি নীরব মহামারি হিসেবে দেখা দিয়েছে বলে বক্তব্যে উল্লেখ করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। তিনি বলেন, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার শেষ ধাপের কিডনির রোগী হাসপাতালে আসছেন। এটি বড় চ্যালেঞ্জ।
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে দেশে ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপন অত্যন্ত কঠিন উল্লেখ করে স্বাস্থ্যের ডিজি বলেন, শুধু চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও সচেতনতার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ করা জরুরি। সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ এবং উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করলেই এই নীরব মহামারি মোকাবিলা করা যাবে।
.ডায়ালাইসিসের সুযোগ সীমিত
অনুষ্ঠানে কিডনি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হারুন-অর-রশীদ বলেন, বাংলাদেশে ২৩ থেকে ২৪ শতাংশ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি কিডনির রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর নতুন করে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষের কিডনি বিকল হলেও ডায়ালাইসিসের সুযোগ পাচ্ছেন মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার।
সংকট দূর করতে ডায়ালাইসিস যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক-ভ্যাটে ছাড় দেওয়াকে সাধুবাদ জানান হারুন-অর-রশীদ। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে মরদেহ থেকে অঙ্গদান প্রসারে কিডনি ফাউন্ডেশন দেশে প্রথমবারের মতো ‘ট্রান্সপ্ল্যান্ট কো-অর্ডিনেটর’ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু করেছে। এটা কিডনি চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
.দরকার সমন্বিত উদ্যোগ
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তায় ধন্যবাদ জানান দক্ষিণ কোরিয়ার অলাভজনক ও দাতব্য সংস্থা ডানভিট ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান হি ইয়ং শিন।
অঙ্গদানের মতো বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন অস্ট্রেলিয়ার ট্রান্সপ্ল্যানটেশন জার্নালসের প্রধান সম্পাদক জেরেমি চ্যাপম্যান। তিনি বলেন, একই সঙ্গে সমাজ, ধর্ম, স্বাস্থ্যসেবা খাত ও সরকারকে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
জেরেমি চ্যাপম্যান আরও বলেন, ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সমাজ কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করেছে, তা বোঝা এবং আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করলে সংকট সমাধান সম্ভব হবে।
.সরকার চিকিৎসক সমাজ, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই একটি টেকসই অঙ্গদান ও প্রতিস্থাপনব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব বলে উল্লেখ করেন দ্য ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব কোরিয়ার ইমেরিটাস অধ্যাপক ইন সুং মুন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন রাফায়েল নানুম ফাউন্ডেশন ও রাফায়েল ইন্টারন্যাশনালের সভাপতি ক্যুরি আন, কিডনি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের মহাসচিব রুহুল আমিন প্রমুখ।
দুই দিনের কর্মশালায় মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ স্থায়ী মৃত্যু নির্ধারণ, অঙ্গ সংগ্রহ, দাতা সমন্বয়, অঙ্গদানের নৈতিক আর আইনগত বিষয়াবলি এবং হাসপাতালভিত্তিক অঙ্গদানব্যবস্থা উন্নয়ন বিষয়ে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা তাঁদের অভিজ্ঞতা, মতামত ও সুপারিশ উপস্থাপন করবেন।






