দিন কয়েক আগের কথা। আমার গবেষণা দলের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। আলোচনার বিষয় ছিল সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর জন-আস্থা কীভাবে গড়ে ওঠে কিংবা ভেঙে পড়ে। আলোচনা শেষে সবাই চলে গেলেও এক শিক্ষার্থী চুপচাপ বসে ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী ভাবছ?’ সে একটু ইতস্তত করে বলল, ‘স্যার, একটা প্রশ্ন মাথা থেকে যাচ্ছে না। আমরা আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন পড়ি? জ্ঞান অর্জনের জন্য, গবেষণার জন্য, নাকি শুধু একটা ডিগ্রির জন্য?’
আমি পাল্টা জানতে চাইলাম, ‘এমন প্রশ্ন কেন?’ সে বলল, ‘কয়েক দিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে পাবলিক আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যে তর্ক দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় আর জ্ঞানচর্চার জায়গা নয়। বরং পরিচয় আর শ্রেণিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দান।
কেউ বলছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় “কোচিং সেন্টার”। কেউ বলছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শুধু “সার্টিফিকেটের দোকান”। আবার কেউ বলছে “পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক সংগঠনের ঘাঁটি”। অন্যদিকে কেউ বলছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কেউ গবেষণার কথা বলছে না। জ্ঞানচর্চার কথা বলছে না। এসব দেখে মনে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়কে কেউ আর বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেখছে না। অথচ আমরা যারা শিক্ষার্থী, তারা বুঝতে পারছি না কাকে বিশ্বাস করব।’
.আমার সেই শিক্ষার্থীর প্রশ্ন ও সংশয়ের উৎস আসলে সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে দেওয়া মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে বিকর্কের জেরে। একটি পডকাস্টে ববি হাজ্জাজ বলেন যে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘একটি কোচিং সেন্টার’ হিসেবে দেখেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো মানের গবেষণা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশিত গবেষণাপত্র সম্পূর্ণ ‘প্লাগিয়ারাইজড’।
তাঁর এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারকদের আলোচনার টেবিলে একটি কৃত্রিম ও ক্ষতিকর বিতর্ক নতুন করে ডালপালা মেলেছে। এই বাহাস দ্রুতই ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে একটি কুৎসিত ‘মিম যুদ্ধে’ রূপ নিয়েছে। সেই যুদ্ধের বিষয়বস্তু হলো উচ্চশিক্ষায় ‘পাবলিক ভালো নাকি প্রাইভেট ভালো?’ একদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাঁদের গৌরবময় ইতিহাস ও ভর্তি পরীক্ষার মেধার দেয়াল তুলে ধরছেন। অন্যদিকে শীর্ষ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পাল্টা বৈশ্বিক র্যাঙ্কিং ও গবেষণার পরিসংখ্যান নিয়ে হাজির হচ্ছেন।
আমার সেই শিক্ষার্থীর প্রশ্নগুলো আমাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। কারণ, এটি কেবল একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সংশয় নয়। অন্যদিকে ববি হাজ্জাজের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্ক কেবল বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া নয়। বরং এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে সমাজের ক্রমবর্ধমান আস্থাহীনতার প্রতিফলন। আর আমাদের উচ্চশিক্ষা নিয়ে জমে থাকা অসন্তোষ, বিভাজন, হতাশা ও অবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ।
.সামাজিক মাধ্যমে লক্ষ করলে দেখা যায়, মানুষ আর বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞান উৎপাদনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে আলোচনা করছে না। বরং তারা বিশ্ববিদ্যালয়কে সামাজিক মর্যাদা, রাজনৈতিক পরিচয়, চাকরির সুযোগ এবং শ্রেণিগত প্রতিযোগিতার মানদণ্ড বিচার করছে। এটি একটি উদ্বেগজনক পরিবর্তন। কারণ, আধুনিক সমাজে বিশ্ববিদ্যালয় কেবল দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কারখানা নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হলো এমন একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে সত্য অনুসন্ধান, সমালোচনামূলক চিন্তা, জ্ঞান উৎপাদন এবং নাগরিক বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা হয়। যখন মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আস্থা হারাতে শুরু করে, তখন তারা ধীরে ধীরে বিশেষজ্ঞ, গবেষণা, বিজ্ঞান এবং প্রমাণভিত্তিক জ্ঞানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করে। ফলাফল হিসেবে সমাজে গুজব, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, মেরুকরণ এবং জ্ঞানবিরোধী প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
এই বাস্তবতা শুধু বাংলাদেশের নয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের অনেক দেশেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি জন–আস্থা কমে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি ইয়েল ইউনিভার্সিটির ‘কমিটি অন ট্রাস্ট ইন হায়ার এডুকেশন’-এর একটি বিশদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক কঠোর বাস্তবতা। আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তরে। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার প্রতি জনগণের আস্থা ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৫৭ শতাংশ থেকে নেমে রেকর্ড সর্বনিম্ন ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালেও, ৭০ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন তাঁদের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা ভুল পথে হাঁটছে।
.ইয়েলের কমিটি জনগণের এই আস্থাহীনতার পেছনে তিনটি বাহ্যিক কারণ এবং তিনটি অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাকে চিহ্নিত করেছে। আর সেই কারণগুলো হলো পড়াশোনার জন্য ব্যয় ও মূল্যের বিভ্রান্তি, ভর্তির গোপন ‘ব্ল্যাক বক্স, মতপ্রকাশের একমুখী সংস্কৃতি এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষয়। কমিটি স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে ১৯টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো: ভর্তিপ্রক্রিয়া সহজ করা, একাডেমিক কঠোরতা ফিরিয়ে আনা, বহুমাত্রিক মতামতের চর্চা নিশ্চিত করা, আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা কমানো ও জ্ঞানের উন্মুক্তকরণ।
অনেকে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকট হিসেবে দেখতে পারেন। কিন্তু আসলে এই প্রতিবেদন শুধু আমেরিকার নয়। এটি আজকের বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। আর সে কারণেই বাংলাদেশের জন্য এই প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এখানে একটা বড় সত্য লুকিয়ে আছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর শিক্ষা ও রাজনীতির জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা।
প্রথমেই ধরা যাক মেধা এবং ভর্তিপ্রক্রিয়ার কথা। ইয়েলের রিপোর্টে বলা হয়েছে, তাদের সামগ্রিক ভর্তিপ্রক্রিয়াটি আসলে একটি রহস্যময় ‘ব্ল্যাক বক্স’ বা অন্ধকার কুঠুরিতে পরিণত হয়েছে, যা প্রকারান্তরে ধনী ও প্রভাবশালীদের সুবিধা দেয়। আমাদের বাংলাদেশে সমস্যাটি একদম বিপরীত মেরুর। কিন্তু এর ফল একই। আস্থাহীনতা। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা সম্পূর্ণভাবে একটি কঠোর ও মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার ওপর নির্ভরশীল। কাগজে-কলমে এটিকে নিরপেক্ষ মনে হলেও, এটি আসলে একটি বিশাল ও অন্যায্য কোচিং ব্যবসার জন্ম দিয়েছে। এখানে প্রকৃত মেধার চেয়ে কার পরিবার কত টাকা দিয়ে প্রাইভেট টিউটর বা কোচিংয়ের খরচ চালাতে পারছে, সেটাই মূল ভূমিকা রাখছে। পশ্চিমা ‘ব্ল্যাক বক্স’ হোক কিংবা আমাদের দেশের ‘কোচিংনির্ভর পরীক্ষা’ উভয় পদ্ধতিই সাধারণ মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে।
.বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার দিকে তাকালে এই মিল আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইয়েলের কমিটি সতর্ক করেছে যে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সবার কাছে সবকিছু হতে গিয়ে এবং নির্দিষ্ট মতাদর্শের কাছে আত্মসমর্পণ করে তাদের মূল একাডেমিক চরিত্র হারিয়েছে। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পতন কোনো সূক্ষ্ম আদর্শিক বিতর্ক নয়; এটি একেবারে প্রকাশ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিকীকরণ। কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে উপাচার্য নিয়োগ, শিক্ষক নিয়োগ এবং ছাত্রাবাসের সিট বণ্টন নির্ধারিত হয় রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলো মুক্তচিন্তার অভিভাবক না হয়ে, অনেক সময়ই ক্ষমতাসীনদের লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করেছে। লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি যখন ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করে, তখন ক্লাসরুম আর জ্ঞানচর্চার পবিত্র স্থান থাকে না।
ইয়েলের রিপোর্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের মানদণ্ডের অবক্ষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। যেখানে ঢালাওভাবে সবাইকে ‘এ’ গ্রেড দেওয়ার কারণে মূল্যায়নের কোনো মূল্যই থাকছে না। ইয়েলে এখন প্রায় সব শিক্ষার্থীর গ্রেডই ‘এ’। বাংলাদেশে আমাদের সংকটটি হলো ‘ডিগ্রি ইনফ্লেশন’ বা ডিগ্রির সংখ্যার অতিবৃদ্ধি। গত ২০ বছরে আমাদের দেশে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অভাবনীয়ভাবে বেড়েছে। কিন্তু এই সংখ্যার সঙ্গে শিক্ষার মানের কোনো সম্পর্ক নেই। শিক্ষার্থীরা সার্টিফিকেট ঠিকই পাচ্ছেন, কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির বাজারে লড়াই করার মতো সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, যোগাযোগ দক্ষতা বা কারিগরি জ্ঞান তাঁদের নেই। একটা ডিগ্রি যখন যোগ্যতা বা পরিশ্রমের প্রতীক হতে পারে না, তখন সমাজের কাছে তার মূল্য শূন্য হয়ে যায়।
.বিশ্ববিদ্যালয় এখন ক্রমেই মধ্যবিত্ত স্বপ্নের একটি অর্থনৈতিক যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে। পরিবারগুলো বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখছে চাকরি পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে। শিক্ষার্থীরা ডিগ্রিকে দেখছে শ্রমবাজারে প্রবেশের টিকিট হিসেবে। রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখছে উন্নয়ন সূচকের অংশ হিসেবে। কিন্তু এই পুরো কাঠামোর মধ্যে জ্ঞানচর্চা, সমালোচনামূলক চিন্তা, গবেষণা ও বৌদ্ধিক স্বাধীনতা প্রায়ই পিছিয়ে পড়ছে। এর ফলাফল স্পষ্ট। অসংখ্য শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হচ্ছেন, কিন্তু তাঁদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা, গবেষণা দক্ষতা, ভাষাগত সামর্থ্য কিংবা সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা দুর্বল রয়ে যাচ্ছে। নিয়োগদাতারা অভিযোগ করছেন যে অনেক গ্র্যাজুয়েট বাস্তব কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত নন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা হতাশ, কারণ ডিগ্রি থাকলেও কর্মসংস্থান নিশ্চিত নয়। এই সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়। এটি বিশ্বাসের সংকট।
ইয়েলের প্রতিবেদন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছে: মানুষ তখনই প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করে, যখন প্রতিষ্ঠানের কাজ তার ঘোষিত উদ্দেশ্যের সঙ্গে মিলে যায়। গত দুই দশকে দেশে অনেক নতুন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে আমরা দেখছি, দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতা দুর্বল হয়েছে। গবেষণা সংস্কৃতি তৈরি হয়নি। অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকেরা অতিরিক্ত ক্লাসের চাপে গবেষণার সুযোগ পান না। পাঠদান মুখস্থভিত্তিক। প্রশ্ন করার সংস্কৃতি দুর্বল। প্রশাসনিক কাঠামো একাডেমিক কাঠামোর চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
.ইয়েলের প্রতিবেদন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সতর্ক করেছে: বৌদ্ধিক স্বাধীনতা। প্রতিবেদনটি বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা নিজেদের মত প্রকাশ করতে ভয় পান, তাহলে প্রকৃত জ্ঞান উৎপাদন সম্ভব নয়। আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মনির্বাচিত নীরবতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিপজ্জনক। বাংলাদেশেও এই প্রশ্ন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠ্যসূচির জায়গা নয়; এটি এমন একটি স্থান, যেখানে সমাজের কঠিন প্রশ্নগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। কিন্তু যদি রাজনৈতিক চাপ, সামাজিক চাপ, দলীয় আনুগত্য কিংবা প্রশাসনিক ভয়ের কারণে মানুষ কথা বলতে সংকোচ বোধ করে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় তার মৌলিক চরিত্র হারাতে শুরু করে।
প্রতিবেদনটি বলছে, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমেই শ্রেণিকক্ষকে গুরুত্বহীন করে তুলছে। প্রযুক্তি মনোযোগ নষ্ট করছে। সামাজিক মাধ্যম শিক্ষার্থীদের মনঃসংযোগ দুর্বল করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রচলিত শেখার প্রক্রিয়াকে বদলে দিচ্ছে। গ্রেড ইনফ্লেশন বা অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার সংস্কৃতি শিক্ষার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বাংলাদেশেও আমরা এর ভিন্ন সংস্করণ দেখি। অনেক শিক্ষার্থী গভীর পাঠাভ্যাস থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা চিন্তাশক্তির চেয়ে তথ্য পুনরুৎপাদনকে উৎসাহিত করছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষ আর বৌদ্ধিক বিনিময়ের জায়গা নয়; বরং সিলেবাস শেষ করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘ মেয়াদে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নয়, সমাজের বৌদ্ধিক সক্ষমতাকেও দুর্বল করে।
.আমাদের প্রয়োজন এমন বিশ্ববিদ্যালয়, যারা নিজেদের সম্পর্কে কঠিন প্রশ্ন করতে সাহসী হবে: শিক্ষার মান কি সত্যিই উন্নত হচ্ছে? গবেষণা কেন দুর্বল? কেন শিক্ষার্থীরা ক্রমেই হতাশ? কেন সমাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আস্থা হারাচ্ছে? কেন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো একাডেমিক প্রশ্নকে ছাপিয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গেলে সংকট আরও গভীর হবে। তাহলে ইয়েলের এই আত্মমূল্যায়ন থেকে বাংলাদেশের মতো একটি নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানো দেশের কী শেখার আছে?
প্রথমত, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি সম্পূর্ণ দূর করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং শিক্ষকদের দ্বারা পরিচালিত বোর্ড গঠন করা দরকার। পদায়ন হতে হবে কেবলই একাডেমিক যোগ্যতা ও গবেষণার ওপর ভিত্তি করে, রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে নয়।
দ্বিতীয়ত, উচ্চশিক্ষার সঙ্গে বাস্তব জীবনের ও পাবলিক কল্যাণের সংযোগ ঘটাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ বা রাজনৈতিক দলগুলোর খেলার মাঠ হতে পারে না। কৃষি উদ্ভাবন, জনস্বাস্থ্য বা অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধান করেই বিশ্ববিদ্যালয়কে তার উপযোগিতা প্রমাণ করতে হবে।
ইয়েলের মতো পৃথিবীর অন্যতম ধনী বিশ্ববিদ্যালয় আজ বুঝতে পেরেছে যে ট্রিলিয়ন ডলারের ফান্ড বা জমকালো ইতিহাস দিয়েও মানুষের ‘হারানো আস্থা’ সহজে কেনা যায় না। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই শিক্ষা আরও বেশি সত্য। আমরা যদি আজই আমাদের উচ্চশিক্ষার মান, স্বচ্ছতা এবং মেরুদণ্ড ফিরিয়ে আনতে না পারি, তবে সার্টিফিকেটধারী এক বিরাট কিন্তু অদক্ষ প্রজন্ম নিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ উন্নতির স্বপ্ন মাঝপথেই থমকে যাবে। আস্থা ফেরানোর এই লড়াইয়ে আমাদের আর এক মুহূর্তও নষ্ট করার সুযোগ নেই।
মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম সিনিয়র লেকচারার, মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)
মতামত লেখকের নিজস্ব






