পাটের চটে সুই-সুতার ফোঁড়ে ফুটে উঠছে ফুল, পাখি, লতাপাতা। গ্রামবাংলার দৃশ্যপট থেকে শুরু করে মোনালিসার মুখও তৈরি হচ্ছে নিপুণ হাতে। পরে এসব রঙিন ছবি ফ্রেমে বাঁধিয়ে বানানো হচ্ছে ওয়ালম্যাট। পাশাপাশি কাপড়ে আঁকা রঙিন ছবিতে তৈরি হচ্ছে কুশন কভার, কাপ ম্যাট, গ্লাস ম্যাটসহ নানা পণ্য। যা বিক্রি হচ্ছে দেশ-বিদেশে।

কাপড় ও পাটের চটে শৈল্পিক ছবি আঁকার কাজটি করছেন পাবনা জেলা শহরের মণ্ডলপাড়া মহল্লার তানিয়া আফরোজ। নিজের করার পাশাপাশি তিনি এখন কাজটি ছড়িয়ে দিয়েছেন গ্রামের নারীদের মধ্যে। প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করছেন শতাধিক দক্ষ নারী কারিগর। এই নারীরাও এখন সংসারের কাজের পাশাপাশি ছবি তৈরির কাজ করছেন। এতে তাঁদের বাড়তি আয় হচ্ছে।

.

ব্যর্থতা থেকে শেখা

প্রায় ৪২ বছর আগের কথা। তানিয়া আফরোজের বয়স তখন ১০ বছর। গ্রামে তখন কাঁথা সেলাই হতো। নারীরা দল বেঁধে কাঁথা সেলাই করতেন। সেখান থেকেই সেলাইয়ের প্রতি আগ্রহ তাঁর। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় স্কুলে একদিন মেয়েদের সেলাই প্রতিযোগিতা হয়। প্রতিযোগিতায় তিনি হেরে যান। এর পর থেকেই সেলাই শেখার শখ আরও তীব্র হয় এবং একপ্রকার জেদ চাপে তানিয়ার। এর পর থেকেই মায়ের কাছে সেলাই শেখা শুরু হয় তানিয়ার। বাড়িতে থাকা কাপড়, চটের ব্যাগে নকশা তৈরি করা শুরু করেন তিনি। দিনে দিনে কাজটি তাঁর আয়ত্তে চলে আসে। যেখানেই কোনো নকশা দেখেন, সেটা সংগ্রহ করে চটের ওপর এবং কাপড়ের ওপর সেলাই করে ছবি তৈরি করতে থাকেন।

এরপর বিভিন্ন ছবি দেখে সেলাই শুরু করেন। এর মধ্যে তিনি স্নাতক পাস করেন। বিয়ে হয়, সংসার হয়। সংসারজীবনে দুই কন্যাসন্তানের মা হন। শিক্ষকতা করেছেন, একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেছেন। দুই সন্তানকে বড় করেছেন। এত কিছুর মধ্যেও রঙিন সুতায় ছবি আঁকা ছাড়েননি কোনো দিন। দিন দিন কাজটিকে ভালোবেসে ফেলেছেন। অবসর পেলেই সুই-সুতা নিয়ে বসতেন। তিনি যেকোনো ছবি দেখে সুই-সুতার ফোঁড়ে হুবহু ছবি তৈরি করতে পারেন।

.

শখের কাজকে ব্যবসায় রূপদান

শখ থেকেই সেলাইয়ের কাজ করতেন তানিয়া আফরোজ। করোনাকালে চাকরি ছেড়ে দেন। এর মধ্যে দুই সন্তানও বড় হয়ে যায়। তখন সময় কাটছিল না। চিন্তা আসে শখের কাজটিকে ব্যবসায় রূপ দেবেন।

করোনা সংক্রমণ শুরুর আগে ২০১৮ সালে তানিয়া একটি ছবি তৈরি করেছিলেন। ছবিটি তাঁর এক আত্মীয় ১০ হাজার টাকায় কিনে নেন। এটাই ছিল তানিয়ার ব্যবসায়িক পুঁজি। পুরো ১০ হাজার টাকার সুতা কিনে কাজ শুরু করেন। ছবি তৈরি করে ফেসবুকে পোস্ট দিতে থাকেন। মুহূর্তেই বিক্রি হতে থাকে ছবিগুলো। যুক্ত হন একটি ফেসবুক পেজে। সেখানেও ছবি পোস্ট করেন। প্রচুর ফরমাশ আসতে থাকে।

তানিয়া আফরোজ জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫০টি ছবির অর্ডার আসে। এতে তিনি আরও উৎসাহিত হন। একা কাজ করে পারছিলেন না। তখন চিন্তা করেন গ্রামের নারীদের কাজটি শেখাবেন। দাদাবাড়ির এলাকা জেলা সদরের দাপুনিয়া, বাঁশের বাদা ও আওতাপাড়া গ্রামের নারীদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ দেন প্রতিবেশী সাধুপাড়া মহল্লার বেশ কিছু নারীকে। প্রস্তুত করেন শতাধিক নারী কর্মী। শুরু হয় পুরোদমে ব্যবসায়িক যাত্রা। এর মধ্যে ২০২০ সালে তিনি রাজধানীতে নিজের তৈরি ছবি নিয়ে একটি প্রদর্শনী করেন। এতে পণ্যের চাহিদাও বাড়তে থাকে।

তানিয়া আফরোজের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন থেকে তিনি প্রতি মাসে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার ছবি বিক্রি করেছেন। তবে ছবির দাম নির্ধারণ করতে পারছিলেন না। প্রতিটি ছবিতে যা খরচ হতো, তা থেকে কিছু বেশি হলেই দিয়ে দিতেন। এখন প্রতি মাসে গড়ে এক লাখ টাকা আয় করেন।

.

সেলাইঘরে একবেলা

২০২৪ সাল পর্যন্ত পুরোদমে ছবি তৈরি ও বিক্রি করেছেন তানিয়া। এরপর পারিবারিক কারণে কিছুদিন কাজটি বন্ধ রেখেছিলেন। নতুন করে আবার শুরু করেছেন। ছবি তৈরি করে অনলাইনে পোস্ট দিতেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

জেলা সদরে হলেও সাধুপাড়া এলাকা গ্রামের মতো। কাঁচা রাস্তায় হেঁটে যেতে হয় তানিয়া আফরোজের বাড়িতে। একতলা বাড়ির নিচতলার একটি কক্ষে তানিয়ার সেলাইঘর। সম্প্রতি এক দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, তানিয়াসহ কয়েকজন নারী সেখানে সেলাই করছিলেন। চটের ক্যানভাসে সুইয়ের ফোঁড় দিচ্ছিলেন গুনে গুনে।

ঘরটিতে সুইয়ের ফোঁড় দিচ্ছিলেন কানিজ ফাতেমা নামের এক নারী। তিনি জানান, নবম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তিনি কাজ শিখেছেন। এরপর এসএসসি, এইচএসসি পাস করে বিয়ে হয়েছে। পড়ালেখার সব খরচ এই কাজ করেই জুটেছে। কাজটির প্রতি তাঁরও ভালোবাসা তৈরি হয়েছে। প্রতিটি ছবি যখন ফুটে ওঠে, তখন খুব ভালো লাগে তাঁর।

কাজের আকার ও মানভেদে টাকা পান নারীরা। ২০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত হাজিরা দেওয়া হয় তাঁদের। কিছু ছবির ক্ষেত্রে এর বেশিও হয়। সীমা খাতুন নামে আরেক নারী বলেন, ‘সুংসারের কাজ শেষ করে মেলা সুময় থাকত। শুয়েবসে কাটত। এহন আপার হেনে সিলাই করি। যা পাই নিজির হাত খরচ ও সুংসারেও কিছু দিতি পারি।’

.

‘এটাকে শুধু পণ্য ভাবলে চলবে না’

তানিয়া আফরোজের এই শিল্পকর্ম তৈরির মূল উপকরণ পাটের তৈরি চট, কাপড় ও রঙিন সুতা। প্রায় ৭৫ রঙের সুতা সংগ্রহ করেছেন তিনি। ঢাকার বিভিন্ন বাজার ঘুরে সুতা ও চট সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর চটের ওপর সুই-সুতার ফোঁড়ে তৈরি হয় ছবি। প্রতিটি ছবির আলাদা নাম দেন তিনি। গ্রামবাংলা, পদ্ম বিল, শাপলা বিল, বৃষ্টিসন্ধ্যা, মোনালিসা, পাখিদের গল্প—এমন হরেক বিষয় ফুটে ওঠে তাঁর ছবিতে। প্রতিটি ছবি তৈরিতে সময় লাগে আকারভেদে তিন থেকে সাত দিন। বড় ছবি হলে এক মাস পর্যন্ত সময় লাগে।

তানিয়া আফরোজ বলেন, ‘সুইয়ের ফোঁড়ে ছবি তৈরি অনেক ধৈর্যের কাজ। সময়ও লাগে অনেক। একটি ফোঁড় ভুল হলেই নষ্ট হয় পুরো ছবি। তাই এটাকে শুধু পণ্য হিসেবে ভাবলে চলবে না। আর্ট (শিল্পকর্ম) হিসেবে দেখতে হবে। তবেই আমরা যারা ছবি তৈরি করছি, তারা মূল্যায়িত হব।’

.

পাশে আছে পরিবার

তানিয়া আফরোজের শৈল্পিক সৃষ্টি নিয়ে সন্তুষ্ট চাকরিজীবী স্বামী মো. কামরুজ্জামান। এই দম্পতির শিক্ষক মেয়ে ফারিহা জামান বলেন, ‘মায়ের প্রতিটি কাজ পরিবারের সবাইকে মুগ্ধ করে। মা একসময় আমাদের ভুলে সেলাইয়ে মেতে থাকতেন। তখন বাবা রাগ করতেন। পরবর্তী সময়ে কাজ দেখে বাবাও মুগ্ধ। তিনি মাকে অনেক সহযোগিতা করেন। মোটরসাইকেলে গ্রামে গ্রামে গিয়ে চট-সুতা দিয়ে আসেন। তৈরি কাজ নিয়ে আসেন। এটা ভালো লাগে।’

তানিয়া আফরোজ শিগগিরই দেশে আরেকটি প্রদর্শনী করতে চান। বিদেশেও প্রদর্শনী করতে চান। তিনি চান শিল্পমূল্য পেতে। এতে গ্রামের যে নারীরা কাজ করছেন তাঁরাও ভালো মজুরি পাবেন। আরও অনেক নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনি এই কাজের সঙ্গে যুক্ত করবেন।

পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক এ বি এম ফজলুর রহমান বলেন, ‘তানিয়া আফরোজ একজন শিল্পমনা ও উদ্যমী নারী। তাঁর তৈরি ছবি আমি দেখেছি। তিনি যে কাজ করছেন তা অনেক শৈল্পিক। তাঁর কাজকে সবাই শৈল্পিক দৃষ্টিতে দেখবেন, এটাই প্রত্যাশা করি।’