পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগে পার্বত্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মনে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন ৩২ বিশিষ্ট নাগরিক। এ অবস্থা নিরসনে দ্রুত এই মন্ত্রণালয়ে পার্বত্য অঞ্চলের আস্থাভাজন এবং ওই অঞ্চলের একজন আদিবাসীকে মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। আজ বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানান তাঁরা।

বিবৃতিদাতারা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন নির্বাচিত সরকার গঠন এবং তাদের শপথ গ্রহণের দিনই পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একজন পূর্ণ মন্ত্রীর ওপর দেওয়ায় পার্বত্য জনগোষ্ঠীর মনে এই সরকারের প্রতি আস্থা আরও দৃঢ় হয়েছিল। যাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তিনি ও অঞ্চল থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সর্বোচ্চ ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। এতে জনমনে বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী গোষ্ঠীসহ সাধারণ মানুষের মনে এমন সন্দেহ দানা বাঁধে যে তাঁকে তাঁর দায়িত্ব পালনে কোনো বিশেষ মহল অযৌক্তিকভাবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বাধা সৃষ্টি করেছে।

বিবৃতিদাতারা মনে করেন, এই সরকার দায়িত্ব গ্রহনের পর থেকে পাহাড়ি মানুষের মনে উচ্চ আশাবাদ গড়ে উঠেছিল যে তাঁদের প্রতি ঐতিহাসিকভাবে যে অবহেলা এবং বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে, এবার তার অবসান হবে। কিন্তু মন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনায় সেই আশাবাদ এখন অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

আজ দেওয়া বিবৃতি বলা হয়, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো পার্বত্য জেলাগুলোর পাহাড়ি আদিবাসীদের প্রতি বহুযুগ ধরে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় নানা ধরনের বৈরী ও বৈষম্যমূলক আচরণ করে তাঁদের স্বতন্ত্র জীবন ধারা ও সংস্কৃতিচর্চার অধিকারকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তার প্রতিকার হিসেবে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির শাসন আমলে তাঁদের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ–আলোচনার পর ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটা কোনো একক দলের কৃতিত্ব নয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারের সঙ্গে পাহাড় এবং সমতলের আদিবাসীদের দাবিগুলো বিবেচনায় নিয়ে রেইনবো বা রংধনু রাষ্ট্র নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এটি তাৎপর্যপূর্ণ এবং বিজ্ঞচিত পদক্ষেপের অঙ্গীকার।

বিবৃতিতে বলা হয়, পার্বত্য মন্ত্রণালয়কে ঘিরে এখন যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা জনমনে বিশেষভাবে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর চেতনায় একধরনের হতাশা এবং ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে। এটা মোটেই কাম্য নয়। যে সরকার যাত্রার শুরুতেই রেইনবো নেশন গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করেছে, তাদের ভাবমূর্তির জন্যও এই বিষয়টি সুখকর নয়।

বিবৃতিদাতারা বলেন, ‘আমাদের এ ক্ষেত্রে একটিই দাবি তা হচ্ছে, অবিলম্বে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে তাদের কোনো আস্থাভাজন ব্যক্তিকে পার্বত্য চুক্তির বিধানের সঙ্গে সংগতি রেখে একজন পূর্ণ মন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হোক। তাঁকে পুরো মন্ত্রণালয়ের পরিচালনার ভারও দিতে হবে।’

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, পার্বত্য চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ১৯ ধারায় বলা হয়েছে, ‘উপজাতীয়দের মধ্য থেকে একজন মন্ত্রী নিয়োগ দেয়া হবে’। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত বিএনপি সরকারও অতীতে তাই কোনো পূর্ণ মন্ত্রী না দিলেও উপমন্ত্রী হিসেবে যাঁকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তিনি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীরই সদস্য এবং পুরো মন্ত্রণালয়ের ভারও তাঁর ওপর অর্পিত ছিল। রেওয়াজ হিসেবে চিন্তা করলে, বিএনপি এই রেওয়াজ আগে থেকেই অনুসরণ করে আসছে।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীরা হচ্ছেন সুলতানা কামাল, খুশী কবির, জেড আই খান পান্না, ইফতেখারুজ্জামান, সারা হোসেন, গীতি আরা নাসরিন, রেহেনুমা আহমেদ, সালমা আলী, আবু সাঈদ খান, শহিদুল আলম, শামসুল হুদা, সুব্রত চৌধুরী, জোবাইদা নাসরীন, খায়রুল চৌধুরী, মির্জা তাসলিমা সুলতানা, কাজল দেবনাথ, সাঈদ আহমেদ, ঈশিতা দস্তিদার, নাসরিন খন্দকার, রোজিনা বেগম, মনিন্দ্র কুমার নাথ, সালেহ আহমেদ, পারভেজ হাসেম, জাকির হোসেন, সাইদুর রহমান, পাভেল পার্থ, রেজাউল করিম চৌধুরী, শাহেদ কায়েস, দীপায়ন খীসা, মুক্তাশ্রী চাকমা, মেইনথিন প্রমীলা ও হানা শামস আহমেদ।