কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অপতথ্য এবং ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদের যুগে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখা ও গণতান্ত্রিক সহনশীলতা জোরদার করার আহ্বান জানিয়ে শেষ হলো ‘ডিডব্লিউ-গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম’ সম্মেলেন। সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যোগ দেওয়া অংশগ্রহণকারীরা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, জন আস্থা অর্জন ও উদ্ভাবনী কৌশলের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রতিকূলতার মধ্যেও সাংবাদিকতা কীভাবে টিকে থাকতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা করেন তাঁরা।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে (ডিডব্লিউ) জার্মানির বন শহরে দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক এ সম্মেলনের আয়োজন করে। এই আয়োজনে বিশ্বের শতাধিক দেশে থেকে সাংবাদিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং সুশীল সমাজের নেতারা অংশ নেন।

এবারের সম্মেলনে দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে সাংবাদিকতা কীভাবে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে—তা নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। পর্যালোচনায় ছিল এআই, অপতথ্য ও ডিজিটাল সেন্সরশিপ থেকে শুরু করে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, গণমাধ্যমের টেকসই অবস্থান এবং ‘বিগ টেক’ বা বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মতো বিষয়গুলো। এ ছাড়া অংশগ্রহণকারীরা আলোচনা করেছেন কীভাবে সংবাদ সংস্থাগুলো জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারে, খণ্ডিত বা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত দর্শকদের কাছে পৌঁছাতে পারে এবং ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপ ও কর্তৃত্ববাদী দমন-পীড়নের মোকাবিলা করতে পারে।

.

স্বাধীনতা, আস্থা ও সংলাপ

পুরো ফোরামজুড়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বৈশ্বিক পরিস্থিতি ছিল আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার আইরিন খান সম্মেলনে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হন। তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া, গণমাধ্যমের আর্থিক সংকট, সংবাদ সংস্থার বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণের দাবি এবং বিশেষ করে সাংবাদিকদের ওপর হামলার মতো চ্যালেঞ্জগুলোর ওপর আলোকপাত করেন। আইরিন খান বলেন, ‘আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন এবং একই সঙ্গে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। গণতন্ত্র ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতাকে একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।’ তিনি বলেন, সাংবাদিকেরা কখনোই খবরের শিরোনাম হতে চান না, তারা খবর দিতে চান। কিন্তু এটি এমন একটি বিষয় যা খবরের শিরোনাম হওয়া প্রয়োজন।’

আন্তঃধর্মীয় সম্পর্কবিষয়ক এক আলোচনায় সংলাপ ও সামাজিক সংহতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার ভূমিকা নিয়েও আলোচনা করা হয়। জেরুজালেমের লুথেরান যাজক স্যালি আজার, বসনিয়ার গবেষক জেভাদা গারিচ এবং ‘কনফারেন্স অব ইউরোপিয়ান র‍্যাবাইস’-এর প্রেসিডেন্ট পিনচাস গোল্ডস্মিডটসহ অনেকে এই আলোচনায় অংশ নেন। গোল্ডস্মিডট বলেন, ‘আমার মতে, আন্তঃধর্মীয় সংলাপের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতা একটি অভিন্ন বয়ান বা আখ্যান ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি, এটি বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে একই টেবিলে বসে বর্তমান পরিস্থিতি ও করণীয় নিয়ে আলোচনার সুযোগ করে দিতে পারে। এতে আমরা সবাই মিলে কীভাবে একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারি, সে বিষয়ে আলোচনার পথ সুগম হবে।’

.

সহযোগিতা জোরদার

বিভিন্ন অধিবেশনে বহুত্ববাদ, প্রতিনিধিত্ব এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। ডিজিটাল সম্মেলন ‘রি:পাবলিকা’-র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও সহপ্রতিষ্ঠাতা আন্দ্রেয়াস গেবহার্ড এক আলোচনায় অংশ নেন। সেখানে আলোচনা করা হয় যে ক্রমবর্ধমান মেরুকরণের পরিবেশে গণমাধ্যম সংস্থাগুলো কীভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে জোরালো করতে পারে এবং গণতান্ত্রিক সংলাপকে উৎসাহিত করতে পারে।

গেবহার্ড বলেন, ‘আমাদের সবারই এমন গণমাধ্যম ও মৌলিক যোগাযোগ অবকাঠামো প্রয়োজন, যার মালিকানা কেবল গুটিকয় মানুষের হাতে থাকবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘গত চার-পাঁচ বছরে আমরা দেখেছি, একটি মুক্ত সমাজের জন্য যোগাযোগপ্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ কেবল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে না থাকাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।’

সম্মেলনের দ্বিতীয় ও শেষ দিনে ডিডব্লিউ এবং ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় ডিজিটাল সম্মেলন ‘রি:পাবলিকা’ তাদের পারস্পরিক সহযোগিতা আরও গভীর করার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। উভয় পক্ষের লক্ষ্য হলো উদ্ভাবন এবং ভবিষ্যৎমুখী সমাধান।

সাংবাদিকতার ওপর প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব ছিল আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ‘ফাউন্ডেশন গেসুন্ডে এরদে—গেসুন্ডে মেনশেন’ এর একার্ট ফন হিরশহাউসেন আলোচনা করেন, কীভাবে সংবাদ সংস্থাগুলো সম্পাদকীয় স্বাধীনতা বজায় রেখে এবং প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে কাজে লাগাতে পারে।

.

চাপের মুখে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা

ফোরামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল ‘ফ্রিডম অব স্পিচ অ্যাওয়ার্ড’ বা বাক্‌স্বাধীনতাবিষয়ক পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান। হংকংয়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পক্ষে অটল অবস্থানের জন্য কারাবন্দী হংকংয়ের উদ্যোক্তা জিমি লাইকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তাঁর পক্ষে তাঁর মেয়ে ক্লেয়ার লাই পুরস্কারটি গ্রহণ করেন।

পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের টিকে থাকার লড়াই বা সহনশীলতার বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। বিভিন্ন অধিবেশনে ইরান, সিরিয়া, ইউক্রেন, সুদান এবং পশ্চিম আফ্রিকা ও কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের মতো চাপের মুখে থাকা এলাকাগুলোর গণমাধ্যম ব্যবস্থা ও সংবাদ সংগ্রহের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। ইরান ও তুরস্কে স্বাধীন সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতার আলোকে সাংবাদিক হান্না কাভিয়ানি ও এলিফ আকগুল আলোচনা করেন, কীভাবে সাংবাদিকেরা ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপ, সেন্সরশিপ এবং কর্তৃত্ববাদী প্রভাবের মুখে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখেন।

এবার ছিল ‘ডিডব্লিউ-গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামের’ ১৯তম আসর। এতে শতাধিক দেশের ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দেন। গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামের ২০তম আসর ২০২৭ সালের ২২ ও ২৩ জুন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা।