ব্রাজিল যখন সেরা ফর্মে থাকে, তখন সেটিকে ফুটবলের ‘প্লেটোনিক ফর্ম’ বা পরম রূপ বলে মন্তব্য করেছিলেন ফুটবল সাহিত্যিক অ্যালেক্স বেলোজ।

অর্থাৎ ব্রাজিলের সেরা ফুটবলই হলো আদি ও আসল ফুটবল। সেই সুন্দর ফুটবল ব্রাজিল পেছনে ফেলে এসেছে অনেক আগে। তবে সবকিছু হারানোর পরও প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম চর্চাগত একটি প্রভাব থেকে যায়। যা আসলে মিশে থাকে রক্তে, আর সেই রক্তে নাচন উঠলে চুপ করে থাকা যায় না!

.

বেলোজের সেই ‘সেরা ফুটবলের’ সামান্য ছায়াও যদি দূর থেকে দেখা যায়, সেটাও সমর্থকদের আহ্লাদিত করে, মন ভরিয়ে তোলে আনন্দে। আজ ভোরে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তেমন মন ভরানো ফুটবলই উপহার দিয়েছে ব্রাজিল। এই পারফরম্যান্স হয়তো ‘জোগো বনিতো’ নয়, কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় জোগো বনিতোর চেয়েও কম নয়।

বিশেষ করে ২০২২ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায়ের পর থেকে সেভাবে আর খুঁজেই পাওয়া যায়নি ব্রাজিলকে। এমনকি বিশ্বকাপে প্রথম দুই ম্যাচের পারফরম্যান্সও মন ভরাতে পারেনি। তবে আজ ভোরে স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারানো পারফরম্যান্সে ব্রাজিলের বার্তাটা স্পষ্ট, ‘আমরা ফিরে এসেছি।’

.

গত দুই ম্যাচের অস্থিরতা, স্নায়ুচাপ ও কৌশলগত ভুলত্রুটি সামলে আজ শুরু থেকেই ব্রাজিল ছিল ঐক্যবদ্ধ, পরিণত, শান্ত ও মনোযোগী। প্রতিপক্ষ ডিফেন্সের ভুলে প্রথম গোলটি এলেও সেটি ছিল ব্রাজিলের গতিময়তা ও প্রেসিংয়ের ফল। উপহার হিসেবে পাওয়া এই গোলের পর ব্রাজিল ছিল আরও আত্মবিশ্বাসী ও নিখুঁত। বিশেষ করে ম্যাচের সঙ্গে ব্রুনো গিমারাইস ও লুকাস পাকেতা সক্রিয় হলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ব্রাজিলের দখলে চলে আসে। অফসাইডে ‘বিতর্কিতভাবে’ গোল বাতিল না হলে প্রথমার্ধেই হ্যাটট্রিক পেতে পারতেন ভিনি, সেটি হতো সোনায় সোহাগা।

.

তবে হ্যাটট্রিকের আনন্দে ভাসা না হলেও ভিনিসিয়ুস বুঝিয়ে দিয়েছেন, কেন তিনি এ সময়ের সেরাদের একজন। বল পায়ে ভিনি ছিলেন এক উচ্ছ্বল আনন্দঝরনা। গোলের বাইরে তাঁর নড়াচড়া ও পজিশনিংয়ের দক্ষতা ছিল এককথায় অনন্য। পুরোটা সময় ভিনির কোনো জবাবই ছিল না স্কটল্যান্ডের কাছে। বাতিল গোলটি আগে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার যেভাবে ভিনিকে জড়িয়ে ধরেছিলেন, সেটিই যেন ম্যাচের প্রতিচ্ছবি।
ব্রাজিলের গোছানো ফুটবলের জবাবে স্কটল্যান্ড ৯০ মিনিট ধরে নিজেদের খেলাটা হাতড়ে ফিরেছে, যদিও আঁকড়ে ধরার মতো কিছু পায়নি। ব্রাজিলকে ম্যাচে তেমন কোনো কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারেনি। আগের দুই ম্যাচের চেয়ে ব্রাজিলের এদিনের পারফরম্যান্স সব দিক থেকেই ছিল দুর্দান্ত।

.

প্রথমার্ধজুড়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছিল ব্রাজিল। স্কটল্যান্ডকে বারবার ভুল করতে বাধ্য করেছে তারা, ফিনিশিংয়ে আরেকটু নিখুঁত হলে ব্যবধান আরও বড় হতে পারত। এ সময় শুধু হাওয়ায় ভাসা বলে কিছুটা দুর্বলতা দেখা গেছে ‘সেলেসাও’দের।

রক্ষণ বিবেচনায়ও ব্রাজিলের ডিফেন্ডাররা সারাক্ষণই স্কটল্যান্ডকে চাপের মধ্যে রেখেছে। শট নেওয়ার জন্য খুব একটা জায়গাও ছাড়েননি। শেষ দিকে স্কটল্যান্ড কয়েকবার কাছাকাছি গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু রক্ষণদেয়াল ও আলিসনের বাধা পেরোনোর মতো সামর্থ্য তাদের ছিলই না।

.স্কটল্যান্ডকে উড়িয়ে মন ভরিয়ে দেওয়া ব্রাজিল নকআউটে, সঙ্গী মরক্কো.

সব মিলিয়ে অন্যান্য পজিশনেও অবশ্য প্রতিপক্ষ স্কটল্যান্ড ব্রাজিলকে খুব একটা কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারেনি। বরং নিজেদের শক্তির জায়গাগুলো আরও ভালোভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। বিশেষ করে প্রতিপক্ষের বিল্ডআপে চাপ সৃষ্টি করা এবং লং বলে সৃষ্ট পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষেত্রেও বেশ উন্নতি চোখে পড়েছে।

ভিনি-কুনিয়ারা আগে থেকেই ভালো খেলেছিলেন, তবে রাফিনিয়ার জায়গায় সুযোগ পাওয়া রায়ানের ভালো খেলা ব্রাজিলের জন্য সুখবর। অভিষেক ম্যাচের তুলনায় তিনি অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও কার্যকর ছিলেন। দুর্দান্ত খেলা রায়ান স্কটিশদের জন্য বাঁ পাশ একরকম বন্ধই করে রেখেছিলেন।

.

ম্যাচের তৃতীয় গোল করা কুনিয়ার অবদানও আলদা করে বলার মতো। আক্রমণভাগে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে দলের খেলায় গতি ও কার্যকারিতা যোগ করেছেন। ব্রুনো গিমারাইসকে নিয়েও বলতে হয় একই কথা। মিডফিল্ডার হিসেবে নিজের দায়িত্ব শতভাগ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। এই ম্যাচেও আনচেলত্তির ডায়মন্ড ফরমেশন দারুণভাবে কাজ করেছে। এর বড় কারণ ছিল ভিনিসিয়ুস, কুনিয়া ও পাকেতার মধ্যে গড়ে ওঠা স্বাভাবিক বোঝাপড়া।

সব মিলিয়ে এই ম্যাচ ব্রাজিলকে নিয়ে নতুন করে আশার জন্ম দিয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে, বিশ্বকাপ যত এগোচ্ছে, তারা ততই নিজেদের সেরা ছন্দ ফিরে পাচ্ছে। আর ব্রাজিলের মতো দলের সেরা ছন্দে ফেরার বার্তা প্রতিপক্ষ বাকি দলগুলোর রাতের ঘুম হারাম করার জন্য যথেষ্ট।

.নাচো ভিনি, নাচো