ইতিহাসের গতিধারায় বিশ্বাস আছে? যদি থাকে, তাহলে একটি ভবিষ্যবাণী করা যায় এখনই— এবার বিশ্বকাপে ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন!

গতিধারার ব্যাখ্যা দিলে সম্ভবত ভ্রকূটি মিলিয়ে যেতে পারে। বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কোনো খেলোয়াড় গ্রুপ পর্বে সব ম্যাচেই গোল করলে ট্রফি ছাড়া কখনো বাড়ি ফেরেনি ‘সেলেসাও’রা।

শুধু ১৯৫৮ বিশ্বকাপ এ তালিকায় আলাদা। ব্রাজিলের জেতা অন্য চারটি বিশ্বকাপে তাকিয়ে দেখুন— ১৯৭০ বিশ্বকাপে জেয়ারজিনহো, ১৯৯৪ বিশ্বকাপে রোমারিও, ২০০২ বিশ্বকাপে রোনালদো ও রিভালদো গ্রুপ পর্বে সবগুলো ম্যাচে গোল করেন। ফল? এ চারবারই শিরোপা জিতেছে ব্রাজিল। এবার বিশ্বকাপে ‘সি’ গ্রুপে ব্রাজিলের তিন ম্যাচেই গোল করেছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। তাহলে!

অন্য অর্থে, ব্রাজিলের প্রতিটি বিশ্বকাপ জয়ে আক্রমণভাগে একজন করে ‘পালের গোদা’ দেখা গেছে। ভিনিসিয়ুস এবার সে ভূমিকায়। গোলে যেমন ছন্দ ফুটছে তেমনি নাচেও। গ্যালারি থেকেও ভেসে আসছে হলুদ জার্সির সমর্থকদের স্লোগান ‘বাইলা ভিনি’— আক্ষরিক না হলেও কথাটার আসল অর্থ তো এটাই, নাচো ভিনি, নাচো!

শুধু ভিনি কেন, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে সাম্বার ছন্দে নেচেছে গোটা ব্রাজিল দলই। জয়টা ৩–০ গোলের হলেও ম্যাচটি দেখে মনে হয়েছে আরও তিন–চারটি গোল হতে পারত। এই যে মনে হওয়া—সেটার দায়–দায়িত্ব আসলে ভিনির। সেই ভিনি, ব্রাজিলের জার্সিতে যাঁকে এক সময় প্রত্যাশার চাপে হলদে মরা ‘ঘাসে’র মতো লেগেছে। কিন্তু আনচেলত্তি কোচ হয়ে আসার পর সেই একই জার্সিতে ভিনির পায়ে ধীরে ধীরে ফুটছে হলদে সর্ষে ক্ষেতের সৌন্দর্য। স্রেফ চোখ ধাঁধানো!

ম্যাচের আগে মজার এক ভবিষ্যতবাণী করেন ভো বাইয়ানিনহা নামে ব্রাজিলের এক জ্যোতিষী। ভিনগ্রহের প্রাণীরা নাকি এ ম্যাচে আক্রমণ করতে পারেন! মাঠের খেলোয়াড় থেকে অপহরণ করে নিয়ে যেতে পারেন দর্শকদেরও!

রুপক অর্থে মায়ামি স্টেডিয়ামে কিন্তু তেমন কিছুই দেখা গেল।

ভিনি এ ম্যাচের সেই ‘এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল’ (ভিনগ্রহের)—ম্যাচ শেষে তাঁর বন্দনায় যেটা বলেছে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম। স্কটিশ ডিফেন্ডারদের লড়াইয়ের স্বপ্ন অপহৃত হয়েছে তাঁর দুই খাপ খোলা তরবারিতে (পড়ুন দুটি পা)।

২০০২ বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে ব্রাজিল কোচ লুই ফেলিপে স্কলারি তাঁর স্ট্রাইকার রোনালদো নাজারিওকে একটি বুদ্ধি দিয়েছিলেন—বল হারালে তৎক্ষণাৎ বল পুনরুদ্ধারে ছুটতে হবে। কিংবা প্রতিপক্ষের পায়ে বল থাকলে চাপে ফেলে বল পুনরুদ্ধার করতে হবে। ব্রাজিল কিন্তু সেই ম্যাচে প্রথম গোলটি এভাবেই পেয়েছিল।

মায়ামিতেও তো সেই একই ধাঁচের খেলা দেখা গেল ভিনির পায়ে। তাঁর প্রথম গোলে স্কটিশ রক্ষণের যতটা ভুল, ভিনির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ভূমিকাও ঠিক ততটাই। বিতর্কিত ভিএআরের সিদ্ধান্তে বাতিল হওয়া গোলটিও কিন্তু প্রতিপক্ষের পা থেকে ছোঁ মেরে বল কেড়ে নেওয়ার ফল। ততক্ষণে স্কটিশ রক্ষণ ও মাঝমাঠ থেকে ভিনির নেতৃত্বে বেশ কয়েকবার বল কেড়েছে ব্রাজিল। আর তাঁর দ্বিতীয় গোলটি?

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের পাঁড়ভক্ত হলে নিশ্চয়ই জানা আছে, সেদেশে ফরোয়ার্ডদের হেডে গোল করা ঠিক ভালো চোখে দেখা হয় না। কিন্তু পেলে থেকে রোনালদোদের সেই দিন তো বদলেছে। ব্রুনো গিমারায়েসের ক্রসে লাফিয়ে ভিনির হেডে করা গোলটি তাই যেন ইউরোপিয়ান কোচের অধীনে বদলে যাওয়া আধুনিক ব্রাজিলেরই প্রতিচ্ছবি।

সেই ছবিতে আছে একটি প্রতিশ্রুতি কিংবা বাজি ধরার গল্পও।

ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে হেডে ভিনির সর্বশেষ গোলটি ছিল ২০২৪ সালের ২ মার্চ মেস্তায়ায় ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে। সেই মেস্তায়া—যেখানে ভিনি রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে বর্ণবাদের শিকার হয়েছেন। গোলের পর তাঁর কেন এত নাচন–কুঁদন—সেসব নিয়েও কম কথা হয়নি। সে যা হোক, জাতীয় দলের ক্যাম্পে ব্রাজিলের কোচ আনচেলত্তিকে ভিনি কথা দিয়েছিলেন, এবার বিশ্বকাপে হেডে গোল করবেন। শিষ্যের এই কথা শুনে আনচেলত্তি হেসেই উড়িয়ে দেন। ভিনির উচ্চতা মাত্র ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি। এবার বিশ্বকাপে ব্রাজিলের গ্রুপ ম্যাচে সবগুলো প্রতিপক্ষ দলেই তাঁর চেয়ে লম্বা ডিফেন্ডার।চাইলেই কী আর গোল করা যায় নাকি! আনচেলত্তির বিশ্বাস হয়নি।

কিন্তু দীর্ঘদেহী স্কটিশ ডিফেন্ডারদের ফাঁক গলে হেডে দুই বছরের বেশি সময় পর গোলটা ঠিকই পেয়েছেন ভিনি। তারপর ম্যাচ শেষে বাকিটা শুনুন তাঁর মুখেই, ‘গোল করতে পেরে আমি খুশি। আজ তো হেড থেকেও গোল করলাম! কোচকে এমন একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, কাজটা নাকি একপ্রকার অসম্ভব (হাসি)। কোচ এটাও বলেছেন, (হেডে গোল পেলে) আমাকে একটা উপহার দেবেন।’

ভিনি এরপর যেটা বলেছেন, সেটা নিশ্চয়ই শুনেছেন ব্রাজিল কোচ? ‘আমি অপেক্ষায় আছি।’

বিস্তারিত আসছে...।