বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্য ইতিহাসে সিটি গ্রুপ একটি সুপরিচিত নাম। ভোজ্যতেল, আটা, চিনি, ভোগ্যপণ্য, পণ্য আমদানি ও উৎপাদন খাতে কয়েক দশকের সফল ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক ব্যবসা ও ২৫ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে সিটি গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় উদ্যোক্তা সাফল্যের একটি প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

কিন্তু সম্প্রতি ২৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পুনর্গঠনের আলোচনায় প্রতিষ্ঠানটির নাম উঠে আসায় নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—সিটি গ্রুপের মতো একটি প্রতিষ্ঠিত ও সফল ব্যবসায়িক গোষ্ঠী কীভাবে এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছাল?

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সব করপোরেট সংকটের পেছনে দুর্নীতি, অর্থ পাচার বা জালিয়াতি থাকে না। অনেক সময় একটি ব্যবসা তার স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তন, অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা ও বিনিয়োগ কৌশলের কারণে আর্থিক চাপে পড়ে। সিটি গ্রুপের বর্তমান পরিস্থিতিকে সেই দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা অধিকতর যৌক্তিক বলে মনে হয়।

.

বাংলাদেশের বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, তারা একটি খাতে সফল হওয়ার পর দ্রুত অন্য খাতে সম্প্রসারণের চেষ্টা করে। প্রবৃদ্ধির জন্য সম্প্রসারণ প্রয়োজন, কিন্তু সব সম্প্রসারণ সমানভাবে ফলপ্রসূ হয় না। বিশেষ করে যখন একটি প্রতিষ্ঠান তার মূল দক্ষতার এলাকার বাইরে গিয়ে মূলধন-নিবিড় খাতে বিনিয়োগ শুরু করে, তখন ঝুঁকির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

সিটি গ্রুপও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন কিছু খাতে বিনিয়োগ করেছে, যেখানে বড় অঙ্কের অর্থ দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে থাকে এবং তাৎক্ষণিক নগদ প্রবাহ তৈরি হয় না। এ ধরনের বিনিয়োগ ভবিষ্যতে লাভজনক হতে পারে, কিন্তু বিনিয়োগ ও আয় আসার সময়ের মধ্যে দীর্ঘ ব্যবধান তৈরি হলে আর্থিক চাপ বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক।

.
সিটি গ্রুপের ঘটনাটি তাই কেবল একটি শিল্পগোষ্ঠীর সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের করপোরেট অর্থায়ন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। প্রবৃদ্ধি অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি হতে হবে নগদ প্রবাহ, সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও টেকসই মূলধন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেব? 
.

সমস্যা আরও গভীর হয়, যখন এসব বিনিয়োগের বড় অংশ ব্যাংকঋণের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়। আধুনিক অর্থনীতিতে ঋণ একটি প্রয়োজনীয় আর্থিক উপকরণ। কিন্তু ঋণ তখনই কার্যকর, যখন বিনিয়োগ থেকে সৃষ্ট নগদ প্রবাহ ঋণের দায় পরিশোধ করতে সক্ষম হয়। যদি স্বল্পমেয়াদি ঋণ দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়, তাহলে নগদ প্রবাহ ও ঋণ পরিশোধের সময়সীমার মধ্যে একটি কাঠামোগত অসামঞ্জস্য তৈরি হয়। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বহু বছর ধরে এ ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যকর মূলধনের জন্য নেওয়া ঋণকে ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে ব্যবহার করে। এর ফলে ব্যবসা নতুন ঋণের ওপর ক্রমে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। একসময় নতুন ঋণ ছাড়া পুরোনো দায় পরিশোধ বা স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে যায়।

.

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টাকার অবমূল্যায়ন এই চাপকে আরও তীব্র করেছে। আমদানিনির্ভর শিল্পগোষ্ঠীগুলোর জন্য এটি ছিল বড় ধরনের ধাক্কা। একই পরিমাণ ডলার দায় পরিশোধ করতে আগের তুলনায় অনেক বেশি টাকা প্রয়োজন হয়েছে। কাঁচামাল আমদানির ব্যয় বেড়েছে, ব্যাংকঋণের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কার্যকর মূলধনের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের আর্থিক পরিকল্পনা এমন একটি বিনিময় হার ধরে তৈরি করেছিল, যা পরবর্তী সময়ে আর বাস্তবসম্মত ছিল না। ফলে যে ঋণ একসময় ব্যবস্থাপনাযোগ্য মনে হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে অনেক বড় আর্থিক বোঝায় পরিণত হয়েছে। সিটি গ্রুপের ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে ধারণা করা যায়।

আরেকটি বিষয় হলো নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা। পারিবারিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠাতার ভূমিকা প্রায়ই আনুষ্ঠানিক কাঠামোর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি শুধু ব্যবসার কৌশল নির্ধারণ করেন না; বরং ব্যাংকার, সরবরাহকারী, বিনিয়োগকারী ও কর্মীদের আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত হন।

.

প্রতিষ্ঠাতার অনুপস্থিতিতে উত্তরসূরিদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয় একই মাত্রার আস্থা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বজায় রাখা। বিশ্বের বহু সফল পারিবারিক ব্যবসা নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময় সংকটে পড়েছে।

সিটি গ্রুপের ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রভাব পুরোপুরি অস্বীকার করা কঠিন। তবে আশার বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো এখনো সিটি গ্রুপকে একটি কার্যকর ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা করছে। এ পর্যন্ত আলোচনায় কোথাও জালিয়াতি, সম্পদ পাচার বা ইচ্ছাকৃত অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসেনি। বরং এটি একটি তারল্যসংকট এবং আর্থিক পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তার উদাহরণ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

এই কারণেই স্বাধীন নিরীক্ষা, ঋণ পুনর্গঠন, সম্পদ মূল্যায়ন ও পরিচালনাগত সংস্কারের উদ্যোগগুলো গুরুত্বপূর্ণ। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এগুলো শুধু একটি প্রতিষ্ঠানকে পুনরুদ্ধার করতেই সাহায্য করবে না, বরং ব্যাংকিং খাতের জন্যও একটি কার্যকর পুনর্গঠন মডেল তৈরি করতে পারে।

.

সিটি গ্রুপের ঘটনাটি তাই কেবল একটি শিল্পগোষ্ঠীর সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের করপোরেট অর্থায়ন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। প্রবৃদ্ধি অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি হতে হবে নগদ প্রবাহ, সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও টেকসই মূলধন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেব? 

  • মামুন রশীদ ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক