মেসি...মেসি...মেসি। সারা বিশ্বেই তাঁর বন্দনা চলছে। লিওনেল মেসি নিজেকে এখন এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যাকে এককথায় বলতে হয় ‘আনপ্যারালাল’ বা অতুলনীয়। ফুটবলার হিসেবে আমাদের অনেকেরই অনেকের প্রতি আবেগ বা পছন্দ থাকতে পারে, সেটা ভিন্ন জিনিস। কিন্তু মেসি নিজেকে যে স্তরে উন্নীত করেছেন, সেখানে বর্তমানে আর কাউকে দেখা যায় না। মেসি নির্দ্বিধায় বিশ্ব ফুটবলের সেরা নাম।
মেসির শ্রেষ্ঠত্ব শুধু তাঁর পায়ের জাদুতে নয়, চরিত্রেও। এত বছর ধরে বিশ্ব মাতাচ্ছেন, অথচ মাঠে তাঁকে কখনো কোনো উগ্রতা দেখাতে দেখিনি। মাঠের বাইরেও আচরণ দারুণ শিক্ষণীয়। সতীর্থরা তাঁকে যে পরিমাণ শ্রদ্ধা করেন ও ভালোবাসেন, ম্যাচের সময়ই যেভাবে মেসিকেই খোঁজেন, তা থেকেই বোঝা যায়, একজন নেতা হিসেবে মেসি কতটা সফল।
.২০১১ সালে মেসি যখন আর্জেন্টিনা দলের সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন, তখন তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমাদেরই সাবেক এক ফুটবলারের। সেই সাবেক ফুটবলার আর্জেন্টিনার লিয়াজোঁ ছিলেন। তাঁর মুখে শুনেছি, ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ বা ডিনার টেবিলে মেসি সবার আগে। কোনো অহংকার নেই তাঁর মধ্যে।
মেসি কত বড় মাপের বিনয়ী একটা ছেলে, তা কল্পনাও করা যায় না। যার মধ্যে এমন মানবিক গুণ আর মাঠকাঁপানোর অসাধারণ ধারাবাহিক ক্ষমতা থাকে, তাঁর পক্ষে চূড়ায় ওঠা সম্ভব।
.মেসি সর্বকালের সেরা কি না, তা নিয়ে আর তর্কের কোনো অবকাশ নেই। মেসিই সর্বকালের সেরা ফুটবলার। মুখের কথা নয়, রেকর্ডই বলছে তা। একজন খেলোয়াড়কে বিচার করা হয় তাঁর পারফরম্যান্স দিয়ে। ৩৯ বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও বিশ্বকাপের মঞ্চে দুই ম্যাচে পাঁচ গোল এবং দুটি ম্যাচেই সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পাওয়ার এক অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা দেখিয়েছে মেসি। আমার তো মনে হয়, এভাবে চললে মেসিই এই বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হবেন।
অস্ট্রিয়া ম্যাচে বক্সের বাইরে থেকে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে গোল করার ধরন ছিল দেখার মতো। বলটা মারার পরেই বোঝা গিয়েছিল, এটা জালে জড়াবে। যেখানে বলটা রাখার কথা, সেখানেই রেখেছেন, সঙ্গে প্রচণ্ড গতি। এসব দৃশ্য এমনি এমনি তৈরি হয় না, প্রতিভা লাগে।
.মেসিকে নিয়ে কথা বলতে বলতে ক্লান্ত স্কালোনি.পেলে-ম্যারাডোনার সঙ্গে মেসিকে তুলনা করতে গেলে বলব, যুগভেদে তাঁদের আলাদা করা কঠিন। পেলে-ম্যারাডোনাদের সময়ে খেলার ধরন ছিল ভিন্ন, ম্যাচের গতি আলাদা ছিল। এখন আরেক রকম। ফলে তিন প্রজন্মকে দাঁড়িপাল্লায় তুলে মাপা সহজ নয়। পেলের খেলা আমি রেকর্ডেড দেখেছি। পেলে ফুটবলকে একটা শৈল্পিক রূপ দিয়েছিলেন। ম্যারাডোনা কম উচ্চতা নিয়েও গতি আর বল নিয়ন্ত্রণে দেখিয়েছেন নিজস্ব জাদুকরি শৈলী। একা হাতে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন। কিন্তু মেসি হলেন ফুটবলের সবকিছুর একটা নিখুঁত সমন্বয়। তাঁর ভেতরে সব গুণ আছে। এই বয়সেও তরুণ প্রতিপক্ষরা বল নিয়ে মেসির সঙ্গে পেরে উঠছে না, এখানেই তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব।
পেলে-ম্যারাডোনাকে নিয়ে বিতর্ক চিরকাল থাকবে। তবে আমার মতে মেসিকে সবার উপরে আলাদা রেখে তারপর বাকিদের নিয়ে বিতর্ক করা উচিত। এমনকি এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচে মেসি হ্যাটট্রিক করার পর ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও বলেছেন, মেসিই সর্বকালের সেরা। বিশ্ব ফুটবলের বড় বড় বোদ্ধাদের মুখেও এখন একই কথা, যার সঙ্গে আমি পুরোপুরি একমত।
.মেসির খেলা দেখার অনুভূতিই অন্য রকম। এই বয়সের মেসি বল পায়ে দৌড়াচ্ছে, প্রতিপক্ষের যেন কিছু করার নেই। শৈল্পিক ব্যাপারটা তো আছেই। অস্ট্রিয়ার ম্যাচে আমি অপেক্ষা করছিলাম, মেসি গোল করবেন কখন। পেনাল্টি মিস করার পর চাইছিলাম, কত তাড়াতাড়ি গোলটা করবেন, যাতে তাঁর অসম্মান না হয়। মানুষের ভালোবাসা নিয়েই যেন মাঠ থেকে বেরোতে পারেন। বুঝতেই পারছেন, কেমন অনুভূতি ছিল তাঁর খেলা দেখার। শেষ বাঁশির পর মাঠ থেকে যাওয়ার সময় সমর্থকেরা দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে মেসিকে। এর চেয়ে বেশি কিছু মেসি হয়তো চাইতে পারতেন না।
আর্জেন্টিনা দল নিয়ে বলতে গেলে তারা এখন নিজেদের আরও মেলে ধরেছে। দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত একটা দল। শুধু গায়ের জোরে বা ধাক্কাধাক্কি করে খেলা নয়; বরং টেকনিক্যাল ফুটবল খেলে জিততে চায় এই দলটি। স্কালোনির দলের ইতিবাচক মানসিকতা এবং খেলার মান দুর্দান্ত। আমি তো এবারের বিশ্বকাপের সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ইউরোপের কথা বলে আসছিলাম, এখন মনে হচ্ছে আর্জেন্টিনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
যে দলে মেসির মতো একজন প্রাণভোমরা আছেন, তাঁর ওপর পুরো দল চোখ বন্ধ করে ভরসা করতে পারেন। সব মিলিয়ে এই দলের পারফরম্যান্স বিশ্বমঞ্চে তাদের সম্ভাবনাকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। মেসি মানুষের ভালোবাসা নিয়ে বীরের মতো ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ করবেন, এটাই একজন ফুটবলপ্রেমী হিসেবে আমার চাওয়া। এই ফুটবল জাদুকর ফুটবলকে যা দিয়েছেন, তার কোনো তুলনা হয় না। তাই আবারও বলছি, মেসিই সর্বকালের সেরা ফুটবলার।
লেখক: সাবেক ফুটবলার ও কোচ
.‘মেসির ২ ম্যাচে ৫ গোল, আমার ২ বিশ্বকাপে শূন্য’





