গল্পটা অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২-০ গোলে জয়ের নয়। গল্পটা আসলে শুধু মেসির। লিওনেল মেসির।

যে গল্পের শুরু তাঁর পেনাল্টি মিস দিয়ে। মাঠে একটা নিস্তব্ধতা নেমে এল। ডালাস স্টেডিয়ামে হাজার হাজার মানুষ যেন এক মুহূর্তের জন্য শ্বাস নিতে ভুলে গেল। বলটা বাঁয়ে পাঠিয়েছিলেন মেসি, পোস্টের বাইরে। ফলে ইতিহাস থেমে রইল আরও কিছুক্ষণ। মাঠের ধারে ক্যামেরাগুলো সেই পেনাল্টি স্পটের দিকে তাকিয়ে রইল, যেখানে মাত্র সেকেন্ড আগে দাঁড়িয়ে ছিলেন ফুটবলের সবচেয়ে অলৌকিক মানুষটি।

ইতিহাস মাঝে মাঝে এভাবেই খেলা করে। দরজার দোরগোড়ায় দাঁড় করিয়ে রেখেও ‘নক’ করতে দেয় না।

বিশ্বকাপ ইতিহাসে তাঁর তৃতীয় পেনাল্টি মিস—এমন একটা রেকর্ড, যা কোনো ফুটবলারই চাইবেন না। ঠিক ৪০ বছর আগে, ১৯৮৬ সালে, এই দিনেই ডিয়েগো ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি অমর গোল করেছিলেন। এমন দিনে মেসি কিনা অনাকঙ্ক্ষিত এক রেকর্ডের মালিক হয়ে গেলেন! অথচ হওয়ার কথা তো ছিল অন্য কিছু। কে জানে, নিয়তি হয়তো একটু খেলতেই চাইল।

কিন্তু মেসি তো মেসিই। ১৮ মিনিটে আরেকটা সুযোগ এল। ডেভিড আলাবা শেষ মুহূর্তে বল কেড়ে নিলেন, অস্ট্রিয়ার গোলকিপার আলেকজান্ডার শ্লাজার দুর্দান্ত সেভ করলেন। মেসি তখনো ইতিহাসের দরজায় দাঁড়িয়ে।

৩৮ মিনিটে সেই দরজাটা খুলে গেল। বাঁ দিক থেকে একটা ক্রস এল। থিয়াগো আলমাদা বলটা ছেড়ে দিলেন, ডামি মুভ। বল এগিয়ে গেল মেসির পায়ের কাছে। কোনো থামা নেই, কোনো ভাবনা নেই। প্রথম স্পর্শেই পাঠিয়ে দিলেন নিচু কোণে, বাঁ দিকে। অস্ট্রিয়ার গোলকিপার নড়ার আগেই বল জালে।

বিশ্বকাপে ১৭তম গোল, টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মিরোস্লাভ ক্লোসা পেছনে পড়ে গেলেন। যে ইতিহাস তাঁরই হওয়ার কথা ছিল, সেটা হলো। ডালাস ফুটে উঠল। স্টেডিয়ামের আলো যেন আরও উজ্জ্বল হলো। মেসি দৌড়ে গেলেন, সতীর্থরা ছুটে এলেন। মাঠের কোণে জড়ো হওয়া সেই মানুষগুলো এবং স্টেডিয়ামে আরও যাঁরা কাঁদলেন, তাঁরা সবাই কিন্তু আর্জেন্টাইন ছিলেন না। এই ছবি ফুটবলের আর্কাইভে অনন্তকাল থাকবে। ৩৯ বছর বয়সের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে লোকটা, মাত্র দুদিন পর জন্মদিন, এই মানুষটা ইতিহাসের পাথরে নাম খোদাই করলেন।

কিন্তু গল্প তখনো শেষ হয়নি।

অস্ট্রিয়া লড়ে যাচ্ছিল। মার্কো আরনাউতোভিচ, মার্সেল সাবিটসার—এঁদের নিয়ে একটা প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরি হয়েছিল। তীব্রতা ছিল তাঁদের খেলায়। কিন্তু দিক ছিল না, ছিল না কাজটা শেষ করার কেউ। এরপর এল ম্যাচের শেষ দৃশ্য।

৯০+৫ মিনিট। যোগ হওয়া সময়ের শেষ পর্যায়ে হুলিয়ান আলভারেজের একটা শট ঠেকে গেল। সেই রিবাউন্ড থেকে মেসি শট নিলেন, সেটাও ব্লক। তারপর বল ফিরে এল, আবার মেসি—এবার আর ভুল নেই। বল জালে, আর্জেন্টিনা ২-০। বিশ্বকাপে মেসির ১৮তম গোল, আরও পেছনে পড়ে গেলেন ক্লোসা।

এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত দুই ম্যাচে আর্জেন্টিনার পাঁচটা গোল, পাঁচটিই মেসির। শেষ মুহূর্তে একটা ফ্রি-কিক থেকে হ্যাটট্রিকের সুযোগ এসেছিল, বল পোস্টের পাশ দিয়ে চলে গেল। কিন্তু তাতে কী!

পেনাল্টি মিসের লজ্জা, আর সেই লজ্জাকে গৌরবে বদলে দেওয়া, এই দুটো মিলিয়েই একটা গল্প তৈরি হয়েছে, যা ভুলবে না ডালাস।

অস্ট্রিয়া লড়াই করেছে। ডেভিড আলাবা, আলেকজান্ডার প্রাস, কেভিন ডানস—এঁরা পুরো ম্যাচ চেষ্টা করেছেন; কিন্তু সামনে মেসি থাকলে সব হিসাব ওলটপালট হয়ে যায়।আর্জেন্টিনা ২ ম্যাচে ৬ পয়েন্ট নিয়ে নকআউটে। অস্ট্রিয়ার শেষ গ্রুপ ম্যাচটা আলজেরিয়ার বিপক্ষে—বাঁচার লড়াই। কিন্তু ডালাসের এই রাত অস্ট্রিয়ার নয়, এমনকি আর্জেন্টিনারও নয়। এই রাত মেসির।

পেনাল্টি মিস দিয়ে শুরু, আর ইতিহাসভাঙা গোল দিয়ে শেষ—এইটুকু সময়ের ভেতরে মেসি এমন একটা চাপ নিলেন, এমন একটা গল্প বললেন, যা কোনো চিত্রনাট্যকার লিখতে পারতেন না। ৩৯ বছর বয়সে, বিশ্বকাপের মাঠে পাঁচটা গোল, দুটো ম্যাচে।

এই মানুষটার বয়স বাড়ে না। এই মানুষটার ফুটবল শেষ হয় না।