নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় দুই সপ্তাহ আগে প্রকাশ্যে অস্ত্রবাজি, গুলি, অপহরণের চেষ্টা, অস্ত্রসহ আটকের তিনটি ঘটনা ঘটে। ৮ ও ৯ জুন পরপর দুই দিন ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত মূল অভিযুক্ত ও সহযোগীরা গ্রেপ্তার হননি। ভিডিও চিত্রে প্রকাশ্যে ছবি আসার পরও অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আইনের আওতায় না আসায় উপজেলার মানুষের মনে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে। বাড়ছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। এ অবস্থায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়া অভিযুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এলাকায় প্রভাব বিস্তার, দখলসহ নানা বিরোধের জেরে এসব ঘটনা ঘটছে।
অস্ত্রবাজির প্রথম ঘটনাটি ঘটে ৯ জুন সকাল আটটার দিকে। সেদিন উপজেলার হাজীপুর ও শরীফপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী কালামিয়ার দোকান নামের স্থানে দাঁড়ানো ছিলেন মো. ফারুক হোসেন নামের এক ব্যক্তি। পেশায় তিনি একজন রাজমিস্ত্রি। এমন সময় হঠাৎ একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চড়ে সেখানে আসেন ছয় থেকে সাতজন যুবক। তাঁদের একজনের হাতে পিস্তল ছিল। তিনি অটোরিকশা থেকে অস্ত্র হাতে নেমে সহযোগীসহ পাশের দোকানের সামনে দাঁড়ানো মো. ফারুক হোসেনকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। অনেক চেষ্টার পরও ফারুককে অটোরিকশায় তুলতে না পেরে শেষে তাঁর পায়ে ও কোমরে গুলি করে পালিয়ে যান সন্ত্রাসীরা।
এ ঘটনার একটি ভিডিও চিত্র পরবর্তী সময়ে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। অস্ত্রধারী ওই ব্যক্তি স্থানীয়ভাবে যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় হওয়া মামলায় পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠালেও ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন ওই অস্ত্রধারী ও তাঁর বাকি সহযোগীরা।
এরপর একই দিন দুপুরে ঘটে দ্বিতীয় ঘটনাটি। বেলা আড়াইটার দিকে উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বেতুয়াবাগ বাজারের বাবুলের দোকানের সামনে ঘোরাফেরা করছিলেন মো. তুহিন (২৫) নামের এক যুবক। স্থানীয় লোকজনের সন্দেহ হলে তাঁরা তাঁকে আটক করার চেষ্টা করেন। এ সময় ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে ওই যুবক একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও চারটি গুলি ফেলে দৌড়ে পালিয়ে যান। পরে জানা যায়, পূর্ববিরোধের জেরে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তুহিন বিদেশি পিস্তল নিয়ে স্থানীয় জাহাঙ্গীর ও হান্নান নামের দুই ব্যক্তিকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও আঘাতের চেষ্টা করেন।
এই দুই ঘটনার এক দিন আগে ৮ জুন বিকেলে বেগমগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নে আবদুর রহমান ওরফে রাহিম (২১) নামের এক তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাঁর কোমরে গুঁজে রাখা তিনটি বিদেশি পিস্তল, আটটি গুলি ও তিনটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার রাহিম উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বসন্তবাগ গ্রামের ভূঁইয়াবাড়ির জসিম উদ্দিনের ছেলে। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছে উপজেলা বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃবৃন্দ। রহিম উদ্ধার হওয়া অস্ত্র নিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সেখানে জড়িত আরও কয়েকজনের নাম বলেন, তবে পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
বেগমগঞ্জে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। হাজীপুর-শরীফপুর সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেগমগঞ্জ উপজেলার হাজীপুর, শরীফপুর, একলাশপুর, গোপালপুর, আলাইয়াপুর ও আমানউল্যাহপুর এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রুপ তৈরি হয়েছিল। ওই গ্রুপগুলোর নেতৃত্বে যাঁরা ছিলেন এবং বর্তমানে যাঁরা আছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এ কারণে অস্ত্রবাজি করে কখনো পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও তাঁদের খুব বেশি সময় জেলে থাকতে হয় না। ধরা পড়ার পর অল্পকিছু দিন গেলে জামিনে বেরিয়ে আসেন এবং পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।
বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শামসুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, হাজীপুর-শরীফপুর সীমানায় রাজমিস্ত্রিকে গুলি করার ঘটনায় থানায় সাতজনকে আসামি করে একটি মামলা হয়েছে। মামলায় এরই মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে যিনি গুলি করেছেন, তাঁকে শনাক্ত করা গেলেও এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া অস্ত্র রেখে পালিয়ে যাওয়া অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া তিনটি পিস্তলসহ গ্রেপ্তার তরুণের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তির আলোকে ওই অস্ত্রগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে।
অস্ত্রধারীদের তৎপরতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে পুলিশি পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও গুলি করে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি জেলার বেগমগঞ্জসহ অন্য উপজেলাগুলোতে অবৈধ অস্ত্রধারীদের তালিকা তৈরি করে তাঁদেরও আইনের আওতায় আনার কাজ চলমান।






