সারা দেশের স্কুল ও কলেজের পাঠক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের আয়োজনে শেষ হলো বছরব্যাপী বই পড়ার কার্যক্রম। আজ সোমবার রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যশালা মিলনায়তনে এ উৎসবের সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সমাপনী অনুষ্ঠানে বই পড়ায় অংশ নেওয়া দেশের বিভিন্ন বেসরকারি লাইব্রেরির মোট ১৪৫ জনকে পুরস্কৃত করা হয়। এর মধ্যে ২০ জন পাঠক-শিক্ষার্থীকে বিজয়ী হিসেবে পুরস্কৃত করা হয়।

পুরস্কার হিসেবে সেরা ২০ জনের প্রত্যেককে ৩ হাজার টাকার বই, ৩ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড এবং সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। এ ছাড়া চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেওয়া বাকি ১২৫ জন শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে ১ হাজার টাকার বই, ১ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড ও সার্টিফিকেট দিয়ে উৎসাহিত করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৮ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনে দেশের শিক্ষা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে সঠিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে দেশপ্রেমিক নাগরিক ও তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে।

বক্তব্যে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, তরুণ প্রজন্ম ফেসবুকের মাধ্যমে সুগভীর যোগাযোগ তৈরি করে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। প্রথমে তারা পরিবর্তন চাইলেও পরে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি ও বণ্টনব্যবস্থার রূপান্তরের দাবিতে বুক পেতে গুলি নিয়েছে। হেলিকপ্টার থেকে মানুষ হত্যার পরও ঢাকার সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসায় এই ফ্যাসিবাদের পতন ঘটে। তিনি জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে অভ্যুত্থান নিয়ে গবেষকদের আরও গবেষণা করার আহ্বান জানান।

দেশ গঠনে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের মূল অগ্রাধিকার হলো দেশ থেকে দুর্নীতি ও মাদক সম্পূর্ণ নির্মূল করা।’

আয়োজকেরা জানান, এবারের আয়োজনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ৭২টি বেসরকারি লাইব্রেরির মোট ৬৪৭ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। শিক্ষার্থীদের বয়স অনুযায়ী দুটি গ্রুপে ভাগ করে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল।

স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য হুমায়ূন আহমেদের সায়েন্স ফিকশন বই ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’ এবং কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য জহির রায়হানের বিখ্যাত উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ পড়ার জন্য দেওয়া হয়েছিল। বই পড়ার পর তাঁদের কাছ থেকে রিভিউ বা লিখিত মতামত নেওয়া হয়।

লিখিত খাতার ওপর ভিত্তি করে সেরা ১৪৫ জনকে বাছাই করা হয়। এরপর চলতি মাসের ৮, ৯ ও ১০ জুন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে তাঁদের একটি মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। সেখান থেকেই বিচারকদের নম্বরের ভিত্তিতে দুই গ্রুপ থেকে সেরা ১০ জন করে মোট ২০ জনকে চূড়ান্ত বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

সকালে উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানটি শুরু হয় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে। জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন ঢাকাস্থ সীমান্ত গ্রন্থাগারের পাঠক-শিক্ষার্থীরা। পরে দলীয় আবৃত্তি করেন ঢাকাস্থ কামাল স্মৃতি পাঠাগারের পাঠক-শিক্ষার্থীরা।

বই পড়া কার্যক্রমের বিচারকদের মধ্যে ছিলেন লেখক ও অধ্যাপক কাজী মোস্তাক গাউসুল হক, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক শাহনাজ মুন্নী, লেখক ও সংগঠক সাবিদিন ইব্রাহিম।

অনুষ্ঠানে লেখক ও অধ্যাপক কাজী মোস্তাক গাউসুল হক হুমায়ূন আহমেদের ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’ বইটির মূল ভাব তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এটি কেবল বিজ্ঞান কল্পকাহিনি নয়, বরং পৃথিবীর প্রতি বিজ্ঞানী ফিহার আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রেমের গল্প। বইটির সুকৌশল বৈজ্ঞানিক ধারণা কিশোর পাঠকদের বিজ্ঞানমনস্ক ও বিশ্বপ্রেমিক হতে উদ্বুদ্ধ করবে।

বক্তব্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে মোস্তাক গাউসুল হক বলেন, যন্ত্র মানুষের কল্যাণের জন্য, মানুষ যন্ত্রের জন্য নয়। তিনি একমাত্র সবুজ গ্রহ পৃথিবীর যত্ন নিতে এবং বারবার বইয়ের পাতায় ফিরে আসার জন্য শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানান।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উপপরিচালক মো. ফরিদ উদ্দিন সরকারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগম। তিনি বলেন, তরুণদের পাঠকসত্তাকে জাগিয়ে তোলাই এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।

সরকারের জাতীয় গ্রন্থনীতি বাস্তবায়িত হলে দেশব্যাপী পাঠচক্র, প্রশিক্ষণ ও বইমেলার পরিধি আরও বাড়বে উল্লেখ করে আফসানা বেগম বলেন, এর মাধ্যমে আগামী দিনে বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলোকে সঙ্গে নিয়ে দেশজুড়ে একটি সমৃদ্ধ পাঠক সমাজ গড়ে তোলা হবে।

অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। জেন–জিদের বইমুখী করতে যুগোপযোগী বই নির্বাচনের কথা বলেন তিনি। বলেন, বর্তমান ‘জেন–জি’ প্রজন্মের রুচি ও চিন্তাভাবনা আলাদা। তাই তাদের বইমুখী করতে জোর করে পুরোনো বই না চাপিয়ে, তাদের উপযোগী বই উপস্থাপন করতে হবে।